সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত স্বাস্থ্যসেবা এবং বায়োটেকনোলজির সম্ভাবনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যা দেশের চিকিৎসা গবেষণা খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইঙ্গিত দেয়। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এশীয় দেশগুলোতে এআই-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সমাধানের বাজার প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এই খাতের দ্রুত বিকাশ এক যুগান্তকারী সুযোগ এনে দিতে পারে। বিশেষ করে, ঔষধ আবিষ্কার, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং রোগ নির্ণয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে এআই-এর প্রয়োগ বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি, যাতে এই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করা যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলো বর্তমানে নতুন ঔষধের আণবিক কাঠামো ডিজাইন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ডেটা বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার প্রোটোকল তৈরিতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যান্সার গবেষণায় এআই-এর ব্যবহার টিউমার কোষের জিনোমিক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণে সাহায্য করছে, যা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল ও দ্রুত। বাংলাদেশে, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত পরিসরে হলেও ডেটা-চালিত গবেষণার দিকে ঝুঁকছে, তবে এআই-এর পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য অবকাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের অভাব এখনো প্রকট। বিশ্বব্যাপী, বায়োটেকনোলজি খাতে এআই-এর প্রয়োগ কেবল রোগ নির্ণয় বা ঔষধ আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বায়োম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়া অপ্টিমাইজ করা, বায়োসেন্সর ডেভেলপমেন্ট এবং এমনকি কৃষি বায়োটেকনোলজিতেও নতুন পথ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপাপটে, স্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এআই-ভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ শুরু করলে, তা শুধু দেশের অভ্যন্তরে মানসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী ঔষধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের সাম্প্রতিক এক নীতিপত্রে উল্লেখ করেছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই-ভিত্তিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি গ্রহণ একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদী সুফল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়নে অপরিহার্য। বিশেষত, টেলিমেডিসিন, রিমোট পেশেন্ট মনিটরিং এবং এআই-চালিত ডায়াগনস্টিক টুলসগুলো বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবধান পূরণে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে, দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বায়োটেকনোলজি এবং বায়োইনফরমেটিক্স সংশ্লিষ্ট কোর্স চালু হলেও, এআই-এর আধুনিক প্রয়োগিক দিকগুলো সিলেবাসে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে, কেবল তত্ত্বীয় জ্ঞান নয়, বরং ব্যবহারিক এআই দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও উন্নয়ন সম্ভব হয়। স্বাস্থ্যসেবার ডেটা সুরক্ষা এবং এআই-এর নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামোও অত্যাবশ্যক, যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন' এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং রোগীর গোপনীয়তা রক্ষায় সহায়ক হবে।
| বছর | বৈশ্বিক এআই স্বাস্থ্যসেবা বাজারের আকার (বিলিয়ন USD) | বায়োটেকনোলজিতে এআই বিনিয়োগের শতাংশ (বৈশ্বিক) | বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে এআই-এর জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি (শতাংশ) |
|---|---|---|---|
| ২০২০ | ৬.৯ | ১২% | ২% |
| ২০২২ | ১১.৩ | ১৫% | ৫% |
| ২০২৪ (প্রাক্কলিত) | ১৮.৫ | ১৮% | ৮% |
| ২০৩০ (প্রাক্কলিত) | ৬২.৭ | ২৫% | ১৫% |
উৎস: World Health Organization (WHO), Grand View Research, Ministry of Health and Family Welfare (MoHFW) - বাংলাদেশ
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'জাতীয় এআই স্বাস্থ্য কৌশল ২০৩০' প্রণয়ন করা, যেখানে ঔষধ আবিষ্কার, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং রোগের পূর্বাভাস মডেল তৈরিতে এআই-এর ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং এর বাস্তবায়নের জন্য 'বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC)' কে সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হবে।
- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'বায়োটেকনোলজি গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল' গঠন করা, যার মাধ্যমে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এআই-ভিত্তিক বায়োটেকনোলজি প্রকল্পে কমপক্ষে ৫ বছরের জন্য বার্ষিক অনুদান প্রদান করা হবে এবং এই তহবিলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হবে।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (BCC) এর তত্ত্বাবধানে একটি 'জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটা প্ল্যাটফর্ম' তৈরি করা, যেখানে এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য সুরক্ষিত ও মানসম্মত স্বাস্থ্য ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের নীতিমালা 'ডেটা সুরক্ষা আইন, ২০২৪' এর অধীনে প্রণীত হবে।