মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রূপান্তর: তেলের সিংহাসন বনাম হাইড্রোজেনের স্বপ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রূপান্তর: তেলের সিংহাসন বনাম হাইড্রোজেনের স্বপ্ন

জুবায়ের আহমেদ  avatar   
জুবায়ের আহমেদ
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রূপান্তর: তেলের সিংহাসন বনাম হাইড্রোজেনের স্বপ্ন
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রূপান্তর: তেলের সিংহাসন বনাম হাইড্রোজেনের স্বপ্ন
ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) সমর্থিত নিওম গ্রিন হাইড্রোজেন কোম্পানি (NGHC) এবং এসিওয়া পাওয়ারের যৌথ উদ্যোগে বিশ্বর বৃহত্তম গ্রিন হাইড্রোজেন প্...

সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) সমর্থিত নিওম গ্রিন হাইড্রোজেন কোম্পানি (NGHC) এবং এসিওয়া পাওয়ারের যৌথ উদ্যোগে বিশ্বর বৃহত্তম গ্রিন হাইড্রোজেন প্ল্যান্টের জন্য ৮.৪ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করার সাম্প্রতিক ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ভূ-রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশাল বিনিয়োগ কেবলমাত্র একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি তেলের উপর শতবর্ষী নির্ভরতা থেকে সরে এসে একটি নতুন, টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের দিকে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অভিযাত্রার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এই রূপান্তর কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে, যা তেলের সিংহাসনকে হাইড্রোজেনের স্বপ্নে রূপান্তরিত করার এক ঐতিহাসিক প্রচেষ্টার সূচনা করছে।

ঐতিহাসিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েতের মতো দেশগুলো তাদের বিশাল তেল ও গ্যাস রিজার্ভের মাধ্যমে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে শক্তি যুগিয়েছে। ওপেক (OPEC)-এর মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে একচ্ছত্র ক্ষমতা ধরে রেখেছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দর কষাকষিতে এক অনন্য সুবিধা দিয়েছে। এই তেল-নির্ভর অর্থনৈতিক মডেল বিভিন্ন আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব, যেমন ইয়েমেন যুদ্ধ বা পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা সংকট, এবং আন্তর্জাতিক জোটের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। তবে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অনীহা মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী মডেলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এবং জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলন (COP) থেকে আসা ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে, এই দেশগুলো তাদের অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনে বিশাল বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। এটি কেবল পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাদের নেতৃত্ব ধরে রাখার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যেখানে তেলের প্রভাব কমে আসবে এবং নতুন জ্বালানি উৎসগুলো প্রাধান্য পাবে।

হাইড্রোজেন রূপান্তরের এই পথে মধ্যপ্রাচ্যের সামনে যেমন বিশাল সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। এই অঞ্চলের দেশগুলো বিশ্বের অন্যতম সেরা সৌর বিকিরণ (solar irradiance) এবং বায়ু শক্তি সম্ভাবনার অধিকারী, যা সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনে অপরিহার্য। পাশাপাশি, তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য বিদ্যমান অবকাঠামো, যেমন পাইপলাইন এবং সমুদ্রবন্দর, ভবিষ্যতে হাইড্রোজেন রপ্তানির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তার 'হাইড্রোজেন লিডারশিপ রোডম্যাপ' ঘোষণা করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদক হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একইভাবে, সৌদি আরব 'ভিশন ২০৩০' এর অংশ হিসেবে নিওমকে একটি বৈশ্বিক সবুজ হাইড্রোজেন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে, সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং পরিবহনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো এখনও বিদ্যমান। এই প্রযুক্তিগুলো এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় ব্যয়বহুল এবং বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য আরও গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজন। এছাড়া, একটি স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক হাইড্রোজেন সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণ এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অত্যাবশ্যক। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায়, বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে নতুন করে প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, যা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে। ইরানের মতো দেশগুলো, যারা পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন, তারাও তাদের প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে নীল হাইড্রোজেন উৎপাদনে আগ্রহী হতে পারে, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ভিন্ন মাত্রা দেবে।

এই জ্বালানি রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর গভীর প্রভাব ফেলবে। ঐতিহ্যগতভাবে তেল-নির্ভর অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যমে, এই দেশগুলো তাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেবে, যা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করবে। একই সাথে, নতুন হাইড্রোজেন উৎপাদন কেন্দ্র এবং রপ্তানি রুটগুলো নতুন ভূ-রাজনৈতিক স্পর্শকাতর স্থান তৈরি করতে পারে, যা আঞ্চলিক সংঘাতের কারণ হতে পারে। লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলোতে জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) এর ভূমিকা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং নতুন জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলো, যেমন BIMSTEC এবং সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলি, যাদের জ্বালানি নিরাপত্তা দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল, তাদের এখন নতুন করে জ্বালানি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে এবং ভবিষ্যতের হাইড্রোজেন অর্থনীতিতে তাদের অবস্থান সুরক্ষিত করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত হতে হবে।

দেশ প্রমাণিত তেল রিজার্ভ (বিলিয়ন ব্যারেল, ২০২২) দৈনিক তেল উৎপাদন (মিলিয়ন ব্যারেল, ২০২২) লক্ষ্যযুক্ত সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন ক্ষমতা (গিগাওয়াট, ২০৩০) লক্ষ্যযুক্ত সবুজ হাইড্রোজেন বিনিয়োগ (বিলিয়ন ডলার, ২০৩০ পর্যন্ত)
সৌদি আরব ২৬৭.১ ১০.৯ ৪.০ (নিওম) ৮.৪ (শুধু নিওম প্রকল্প)
সংযুক্ত আরব আমিরাত ১১১.০ ৪.২ ১.৪ ৫.০ (প্রাথমিক লক্ষ্য)
কাতার ২৫.২ ১.৭ ০.৮ (প্রাথমিক লক্ষ্য) অপ্রকাশিত

উৎস: OPEC বার্ষিক পরিসংখ্যান বুলেটিন, IEA, IRENA, NEOM Green Hydrogen Company, Masdar (UAE)

সুপারিশ

  • মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উচিত গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) এর অধীনে একটি 'মধ্যপ্রাচ্য হাইড্রোজেন ফোরাম' প্রতিষ্ঠা করা। এই ফোরামের মাধ্যমে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানির জন্য অভিন্ন নীতি, প্রযুক্তিগত মান এবং বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াবে এবং বৈশ্বিক হাইড্রোজেন বাজারে তাদের সম্মিলিত অবস্থান সুদৃঢ় করবে।
  • জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলির উচিত মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান হাইড্রোজেন উৎপাদনকারী দেশগুলির সাথে দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক 'হাইড্রোজেন সরবরাহ চুক্তি' নিয়ে আলোচনা শুরু করা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন বৈশ্বিক জ্বালানি শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে, বিশেষ করে BIMSTEC এবং সার্ক অঞ্চলের দেশগুলির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।
  • জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উচিত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলিতে UN Peacekeeping মিশনের ম্যান্ডেটকে প্রসারিত করা, যাতে তারা শুধু মানবিক সহায়তা বা শান্তি রক্ষা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো (যেমন – তেল পাইপলাইন, গ্যাস টার্মিনাল এবং ভবিষ্যতের সবুজ হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট ও রপ্তানি বন্দর) সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জুবায়ের আহমেদ

জুবায়ের আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator