ফরিদপুরের নগরকান্দায় এক কিশোরীকে নিয়ে বিয়ে ও ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরস্পরবিরোধী দাবি উঠেছে। তরুণের পরিবারের দাবি, দুই পরিবারের সম্মতিতে সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিতে তাদের বিয়ে হয়েছিল। তবে কিশোরী ও তার পরিবারের দাবি, কোনো বিয়ে হয়নি; তাকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় করা মামলায় রুমন খন্দকার (২০) নামের এক তরুণ দেড় মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন।
নগরকান্দা থানার পুলিশ জানায়, গত ২ জুলাই কিশোরীর দাদি জহুরন খাতুন (৫২) রুমনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, গত ১৯ জুন বিকেলে বাড়ির পাশ থেকে কিশোরীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে রুমনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয়। পরদিন সেখান থেকে পালিয়ে কিশোরী পরিবারের কাছে ফিরে আসে। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মামলার পর ২ জুলাই রাতে রুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি নগরকান্দার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলে এবং পেশায় কাঠমিস্ত্রি।
তবে রুমনের পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, গত ২২ মে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের ওই কিশোরীর সঙ্গে রুমনের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে কনের বাড়িতে গায়ে হলুদের আয়োজন করা হয়। পরে প্রায় ৪০ জন বরযাত্রী কনের বাড়িতে যান। খাওয়া-দাওয়ার পর দুই পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পরে কনেকে সাজিয়ে রুমনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ আয়োজনের ছবি ও ভিডিওও রুমনের পরিবার সাংবাদিকদের দিয়েছে।
রুমনের পরিবারের ভাষ্য, কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় বিয়েটি নিবন্ধন করা হয়নি। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত ছিল দুই পরিবারের। রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, বিয়ের পর থেকেই দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। একপর্যায়ে কিশোরীকে বাবার বাড়িতে নিয়ে গেলে সে আর শ্বশুরবাড়িতে ফিরতে চাইছিল না। স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যস্থতায় একবার তাকে রুমনের বাড়িতে নেওয়া হলেও কয়েক দিন পর আবার বাবার বাড়িতে চলে যায়। পরে তারা জানতে পারেন, কিশোরীর অন্য একজনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। এরপর কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে কিশোরী ও তার দাদি বিয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, বিয়ে নয়, কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। মামলার এজাহারেও বিয়ের কোনো উল্লেখ নেই। বিয়ের অনুষ্ঠান, ছবি ও ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে কিশোরী ও তার দাদি বিস্তারিত কিছু বলেননি। তারা মামলায় আনা অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
নগরকান্দা থানার ওসি রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, ২ জুলাই কিশোরীকে নিয়ে তার দাদি থানায় এসে লিখিত অভিযোগ করেন। তার সঙ্গে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রও ছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নেওয়া হয়েছে। এজাহারে বিয়ের কোনো বিষয় উল্লেখ ছিল না এবং পুলিশকেও বিয়ের বিষয়ে জানানো হয়নি। চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রসহ ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শহিদুল ইসলাম। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানান ওসি।
এদিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় বিয়েটি বাল্যবিয়ের আওতায় পড়ে। বিয়ে নিবন্ধন না করায় আইনগত জটিলতাও তৈরি হয়েছে। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়ের সামাজিক ও আইনগত সুরক্ষার জন্য নিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হলে বাল্যবিয়ের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। কোনো বিয়ে নিবন্ধক বা কাজি এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রুমনের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের পর কিশোরী কিছুদিন রুমনের বাড়িতে সংসার করেছে। পরে পারিবারিক বিরোধের জেরে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। বাল্যবিয়ে আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়—এটি ঠিক। তবে বিয়ের সামাজিক বাস্তবতা, দুই পরিবারের সম্মতি এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আশা করেন তিনি।