বিষমুক্ত সবজি চাষ: কৃষক থেকে ভোক্তার টেবিলে নিরাপত্তার চাবিকাঠি

লুৎফর রহমান  avatar   
লুৎফর রহমান
বিষমুক্ত সবজি চাষ: কৃষক থেকে ভোক্তার টেবিলে নিরাপত্তার চাবিকাঠি
বিষমুক্ত সবজি চাষ: কৃষক থেকে ভোক্তার টেবিলে নিরাপত্তার চাবিকাঠি
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও সুপারশপে পরিচালিত এক নিয়মিত অভিযানে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় সবজিতে স্বাস্থ্যে...

সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও সুপারশপে পরিচালিত এক নিয়মিত অভিযানে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় সবজিতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাত্রার কীটনাশক অবশেষ (pesticide residue) খুঁজে পাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ নতুন করে দানা বেঁধেছে। এই অভিযান শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় বিষমুক্ত সবজি চাষের চ্যালেঞ্জ এবং ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের সার্বিক চিত্রকে সামনে এনেছে। যদিও কৃষি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে নিরাপদ সবজি চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকি এখনো বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে, রাসায়নিক কীটনাশকের সহজলভ্যতা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কৃষকদের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব, পাশাপাশি বিকল্প জৈব পদ্ধতি ব্যবহারে প্রশিক্ষণের ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) যৌথভাবে এমন অনেক ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে যা রোগ ও পোকা প্রতিরোধী, যা রাসায়নিকের ব্যবহার কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে, কৃষকদের মধ্যে এই জাতগুলোর প্রচলন এবং সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান বিতরণে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সমন্বিত বালাই দমন (Integrated Pest Management - IPM) পদ্ধতি একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর ব্যাপক প্রয়োগ এখনো লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবে তারা দ্রুত ফলনের আশায় সনাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে কীটনাশক ব্যবহার করে যাচ্ছেন। অনেক সময় বাজারে প্রচলিত সস্তা ও নিম্নমানের কীটনাশকের অবাধ প্রবাহ এবং সঠিক মাত্রায় ব্যবহারের জ্ঞান না থাকায় কৃষকরা নিজের অজান্তেই ফসলে অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করেন, যা ফসল কাটার সময়ও অবশেষ আকারে রয়ে যায়।

বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত একটি সুরক্ষিত সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা জরুরি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের জৈব সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহারে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন প্রদর্শনী প্লট ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করলেও, এর পরিধি এখনো যথেষ্ট নয়। নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শস্য পর্যায়ক্রম (crop rotation), এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিগুলো কৃষকদের কাছে আরও সহজলভ্য ও লাভজনক করে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য গবেষণা ও নীতি সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, এই গবেষণার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানো এবং কৃষকদের দৈনন্দিন অনুশীলনে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কৃষকদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি পদ্ধতি, যেমন - ফেরোমন ফাঁদ, আলোক ফাঁদ, বালাইনাশকের সঠিক ব্যবহারবিধি ও সময়কাল সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা এবং প্রয়োগ-পরবর্তী সতর্কতা অবলম্বন বিষয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হলে কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। একইসাথে, স্থানীয় পর্যায়ের বাজারগুলোতে নিরাপদ সবজির জন্য একটি আলাদা চ্যানেল তৈরি করা এবং ভোক্তাদের মধ্যে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হলে কৃষকগণও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন।

বছর কৃষি উৎপাদনে কীটনাশক ব্যবহার (মেট্রিক টন) মোট সবজি উৎপাদন (লক্ষ মেট্রিক টন) নিরাপদ সবজি চাষের আওতা (হেক্টর)
২০১৮-১৯ ৪২,৫০০ ১৪৮.৮৫ ১০,৫০০
২০১৯-২০ ৪৫,২০০ ১৫৫.৪০ ১২,২০০
২০২০-২১ ৪৮,১০০ ১৬২.৫০ ১৫,১০০
২০২১-২২ ৫০,৭০০ ১৬৯.২০ ১৮,৩০০
২০২২-২৩ ৫৩,৩০০ ১৭৬.০০ ২১,৫০০

উৎস: কৃষি মন্ত্রণালয়, ডিএই এবং বিএআরসি-এর বার্ষিক প্রতিবেদন (প্রাক্কলিত)।

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় জৈব কৃষি নীতি ২০২৩' এর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে কৃষকদের জন্য জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক উৎপাদনে ভর্তুকি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) কর্তৃক উদ্ভাবিত রোগ ও পোকা প্রতিরোধী ফসলের জাতগুলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য একটি কার্যকর বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং কৃষকদের এই জাতগুলো ব্যবহারে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে।
  • জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে স্থানীয় বাজার এবং সুপারশপে নিয়মিত কীটনাশক অবশেষ পরীক্ষার পরিধি বাড়াতে হবে এবং 'নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩' অনুযায়ী ক্ষতিকর মাত্রার কীটনাশকযুক্ত সবজি বাজারজাতকরণের জন্য কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: লুৎফর রহমান

লুৎফর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: খাদ্য নিরাপত্তা ও পেস্টিসাইড ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator