সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের গ্রাহক সংখ্যা গত তিন বছরে প্রায় ২৮০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে স্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলো বিদেশি প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজস্ব দর্শকশ্রেণী তৈরি করছে। বিশেষ করে, বঙ্গবিডি, চরকি, হইচই-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রিমিয়াম কনটেন্টের মাধ্যমে বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নামার পর থেকে এই প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। এই দ্রুতগতির বিস্তৃতি কেবল বিনোদন উপভোগের ধরনই পাল্টে দিচ্ছে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, যা প্রথাগত মিডিয়ার সঙ্গে এক নতুন ধরনের সমন্বয় ও প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এই অভূতপূর্ব উত্থান কেবল ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট ব্যবহার এবং স্মার্টফোন সহজলভ্যতার ফল নয়, বরং এটি দর্শকের রুচি ও পছন্দের এক মৌলিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে। একসময় টেলিভিশন এবং প্রেক্ষাগৃহ ছিল বিনোদনের মূল উৎস, কিন্তু এখন দর্শক তাদের সুবিধামতো সময়ে, নিজেদের পছন্দের ডিভাইস থেকে যেকোনো ধরনের কনটেন্ট উপভোগ করতে পারছে। স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতারা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের জন্য বৈচিত্র্যময় সিরিজ, চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারি তৈরি করছেন, যা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় থ্রিলার সিরিজ এবং ড্রামাগুলো দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা কেবল দেশেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও সাড়া ফেলেছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন শিল্পী, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারদের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে প্রথাগত মিডিয়ার তুলনায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ অনেক বেশি। ফলস্বরূপ, সৃজনশীলতার এক নতুন জোয়ার এসেছে, যা বাংলাদেশের বিনোদন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে, এই দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে কনটেন্টের মান, কপিরাইট সুরক্ষা এবং পাইরেসির মতো চ্যালেঞ্জগুলোও নতুন করে সামনে আসছে, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই খাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে – অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, কারিগরি কর্মী থেকে শুরু করে মার্কেটিং ও সাপোর্টে জড়িত ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও এই খাতের সম্ভাবনা অনুধাবন করে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা প্রদানের কথা ভাবছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিস্তৃতির জন্য অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংকের "Digital Government and Economy Project" এর মতো প্রকল্পগুলো দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কভারেজ এবং ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, যা ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। অন্যদিকে, বিজ্ঞাপনের আয় এবং সাবস্ক্রিপশন মডেলের মাধ্যমে এই খাত দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তবে, বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা, ডেটা সুরক্ষা এবং ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার মতো বিষয়গুলো এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একটি সুসংহত এবং দূরদর্শী নীতি কাঠামো প্রণয়ন জরুরি, যা স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে উৎসাহিত করবে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্ট সরবরাহ নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয় এবং শিল্পটি তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|
| মোট ওটিটি গ্রাহক (মিলিয়ন) | ৫.২ | ৯.৫ | ১৪.৮ | ২০.৫ |
| স্থানীয় প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ৮.৫ | ১৪.২ | ২২.৩ | ৩০.০ |
| স্থানীয় কনটেন্ট উৎপাদন বৃদ্ধি (%) | ৩০% | ৪৫% | ৫৫% | ৬৫% |
| ওটিটি খাত থেকে রাজস্ব আয় (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ১০.৩ | ১৮.৭ | ৩১.৫ | ৫০.০ |
উৎস: বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) ও বাজার গবেষণা প্রতিবেদন, ২০২৩-২৪ (প্রাক্কলিত)।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম রেগুলেশন পলিসি ২০২৩' এর একটি চূড়ান্ত ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় কনটেন্টকে অগ্রাধিকার, ডেটা সুরক্ষা এবং কপিরাইট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- স্থানীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং প্রণোদনা প্রদানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে, যা নতুন কনটেন্ট তৈরি, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করবে, যাতে শিল্পটি বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি-এর ডিজিটাল রূপান্তর উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
- সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে ওটিটি কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নৈতিকতা এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির উপর জোর দেওয়া হবে, যাতে স্থানীয় প্রতিভা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।