সম্প্রতি, বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) বিনিয়োগে মন্দার ঢেউ বাংলাদেশের উদীয়মান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকেও প্রভাবিত করেছে। যদিও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুলস, ২০১৫-এর অধীনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের জন্য নতুন কিছু দিকনির্দেশনা এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে, তবুও স্থানীয় বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ফান্ডিং প্রবাহের অস্থিরতা দেশের স্টার্টআপগুলোর জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষত, গত দুই বছরে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিশীল স্টার্টআপ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হিমশিম খেয়েছে, যা কেবল তাদের প্রবৃদ্ধির গতিকেই ব্যাহত করছে না, বরং সমগ্র ইকোসিস্টেমের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয়ভাবে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের উৎস বৃদ্ধি এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যথায় বাংলাদেশের 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশনের অন্যতম চালিকাশক্তি এই স্টার্টআপ খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতের বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে বিনিয়োগের অপ্রতুলতা এবং নীতিগত কাঠামোর কিছু সীমাবদ্ধতা। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডিং মূলত প্রারম্ভিক পর্যায়ের স্টার্টআপগুলির জন্য জীবনরেখা হলেও, স্থানীয়ভাবে এই ধরনের বিনিয়োগের উৎস এখনো সীমিত। এর একটি বড় কারণ হলো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুলস, ২০১৫-এর অধীনে বিদ্যমান কিছু কঠোর শর্তাবলী, যা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ করে রাখে অথবা তাদের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ফান্ডগুলির জন্য নির্ধারিত বিনিয়োগের ধরন এবং এক্সিট স্ট্র্যাটেজির বাস্তবায়ন প্রায়শই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়, যা বিনিয়োগকারীদের নতুন ফান্ড গঠনে নিরুৎসাহিত করে। অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক স্টার্টআপ এবং অ্যাঞ্জেল বিনিয়োগকারীদের জন্য কর-সংক্রান্ত নীতিমালায় স্পষ্টতার অভাব রয়েছে। স্টার্টআপগুলির জন্য স্টার্টআপ ভ্যালুয়েশন, স্টক অপশন এবং মূলধনী লাভের ওপর কর আরোপের বিষয়টি প্রায়শই বিতর্কিত হয়, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। অনেক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম তাদের বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জনের পর উচ্চ করহারের কারণে নিরুৎসাহিত বোধ করে, যা নতুন বিনিয়োগের পথকে সংকুচিত করে। এছাড়াও, স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, যেমন ব্যাংক বা বীমা কোম্পানি, স্টার্টআপে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধি-নিষেধ এই খাতের জন্য একটি বড় বাধা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাবে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল উদ্যোগ তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশে ব্যর্থ হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ সুদের হারও স্থানীয় ব্যাংক ঋণ বা অন্যান্য প্রচলিত অর্থায়নের উৎসকে স্টার্টআপের জন্য আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে, যা তাদের কার্যপরিচালনা এবং সম্প্রসারণের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে, এই সংকটময় পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের বিশাল তরুণ জনসংখ্যা, দ্রুত বর্ধনশীল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা স্টার্টআপগুলির জন্য একটি বিশাল বাজার তৈরি করেছে। ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক, হেলথটেক এবং ই-কমার্স-এর মতো খাতগুলিতে উদ্ভাবনী সমাধানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরকার কর্তৃক 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া স্টার্টআপগুলির জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশীয় স্টার্টআপগুলিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে, বিশেষত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ পণ্য ও সেবা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। এটি স্টার্টআপগুলিকে নতুন গ্রাহক এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম এবং অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মগুলির দ্রুত প্রসার কোভিড-১৯ মহামারীর সময় প্রমাণিত হয়েছে, যা দেখায় যে এই খাতগুলিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। এছাড়া, দেশের অভ্যন্তরে এখনও অনেক অনুন্নত খাত রয়েছে যেখানে প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান প্রয়োগের মাধ্যমে বড় ধরনের মূল্য সংযোজন সম্ভব। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং টিকে থাকার মানসিকতাও এই খাতের একটি বড় শক্তি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারের খরচ কম এবং অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হওয়ায় এটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে, যদি বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অনুকূল করা যায়। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ক্রমবর্ধমানভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে 'নেক্সট বিগ থিং' খুঁজছে এবং বাংলাদেশ সেই তালিকায় সহজেই স্থান করে নিতে পারে, যদি সঠিক নীতি এবং প্রণোদনা নিশ্চিত করা যায়।
এই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে এবং সংকট মোকাবিলায়, একটি সমন্বিত ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও নিবিড় সহযোগিতা প্রয়োজন। বর্তমান বিধি-নিষেধগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোকে যুগোপযোগী করা অত্যাবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আরও সহজলভ্য করে তুলতে হবে এবং তাদের জন্য বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। স্থানীয়ভাবে 'ফান্ড অফ ফান্ডস' মডেল চালু করা যেতে পারে, যেখানে সরকার বা বড় কর্পোরেশনগুলো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোতে বিনিয়োগ করবে, যা পরবর্তীতে ছোট ছোট স্টার্টআপে বিনিয়োগ করবে। এছাড়াও, স্টার্টআপগুলিকে আন্তর্জাতিক মানের মেন্টরশিপ এবং ইনকিউবেশন সাপোর্ট প্রদান করা জরুরি, যাতে তারা তাদের ব্যবসায়িক মডেলকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর উচিত স্টার্টআপ পণ্য ও সেবার জন্য আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা, বিশেষ করে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিগুলির সুবিধা গ্রহণ করে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির উচিত নিয়মিতভাবে স্টার্টআপ খাতের উপর গভীর বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করা, যা নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।
| সাল | মোট ভিসি বিনিয়োগ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | মোট ডিলের সংখ্যা | স্থানীয় ভিসি বিনিয়োগের হার (%) | বিদেশি ভিসি বিনিয়োগের হার (%) |
|---|---|---|---|---|
| ২০২০ | ১১২ | ৬১ | ৩২ | ৬৮ |
| ২০২১ | ১৪৫ | ৭৯ | ২৮ | ৭২ |
| ২০২২ | ৯৬ | ৫০ | ৩৫ | ৬৫ |
| ২০২৩ (প্রাক্কলিত) | ৭৮ | ৪৫ | ৪০ | ৬০ |
উৎস: লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের যৌথ প্রতিবেদন এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিশ্লেষণ, বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে প্রাক্কলিত।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুলস, ২০১৫-এর অধীনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের জন্য বিদ্যমান বিনিয়োগের সীমা ও পোর্টফোলিও বিধিমালা পুনর্বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করা, যাতে স্থানীয় ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং ফান্ডগুলোর জন্য এক্সিট স্ট্র্যাটেজি সহজ হয়।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে স্টার্টআপসমূহের জন্য আয়কর অব্যাহতি, ভ্যাট নিবন্ধন সহজীকরণ এবং অ্যাঞ্জেল বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা চালু করবে, বিশেষ করে স্টার্টআপগুলির স্টক অপশন এবং মূলধনী লাভের ওপর কর নীতি সুস্পষ্ট ও বিনিয়োগবান্ধব করা হবে, যা পুঁজি প্রবাহকে উৎসাহিত করবে।
- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে স্টার্টআপগুলির জন্য একটি জাতীয় ইনোভেশন নীতি প্রণয়ন করবে, যেখানে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক বাজার প্রবেশাধিকার (রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো - EPB-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ ও বাজার গবেষণা), এবং গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকবে।