প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য: মা ও শিশুর অদেখা সংকট

ডা. ফারজানা খাতুন  avatar   
ডা. ফারজানা খাতুন
প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য: মা ও শিশুর অদেখা সংকট
প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য: মা ও শিশুর অদেখা সংকট
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র: বাংলাদেশের প্রসবোত্তর মায়েদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রসবোত্তর...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র: বাংলাদেশের প্রসবোত্তর মায়েদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছেন, যা প্রায়শই অলক্ষিত থেকে যাচ্ছে। ২০২২ সালের তথ্যানুসারে, প্রতি ৫ জন প্রসূতি মায়ের মধ্যে ১ জন কোনো না কোনো মাত্রার প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় (Postpartum Depression - PPD) আক্রান্ত হচ্ছেন, যা শুধু মায়ের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, বরং শিশুর ভবিষ্যৎ বিকাশ ও পারিবারিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রতিবেদনটি প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্যের অদেখা সংকটের দিকে আঙুল তুলেছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই সংকট মোকাবেলায় দেশের স্বাস্থ্য খাত, বিশেষ করে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অপ্রতুল। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা এমনিতেই কম, সেখানে প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং কাউন্সেলিং পরিষেবা প্রায় অস্তিত্বহীন। আইইডিসিআর (IEDCR) এর গবেষণা বলছে, প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মায়েদের মধ্যে মাত্র ১০-১৫% পেশাদার সহায়তা পান, বাকিরা লোকলজ্জা, অজ্ঞতা অথবা সেবার অপ্রাপ্যতার কারণে নীরবে কষ্ট পান। এর ফলে, প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা বা সাইকোসিস দীর্ঘমেয়াদী জটিলতায় রূপ নেয়, যা মা ও শিশুর বন্ধন (maternal-infant bonding) ব্যাহত করে এবং শিশুর জ্ঞানীয় (cognitive) ও আবেগিক (emotional) বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শুধু বিষণ্ণতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রসবোত্তর অ্যাংজাইটি, অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD) এবং বিরল ক্ষেত্রে প্রসবোত্তর সাইকোসিসও এর অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) যদিও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, কিন্তু প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রায়শই শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। এমনকি অনেক সময় চিকিৎসকরাও শারীরিক জটিলতার প্রতি অধিক মনোযোগ দেন, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি উপেক্ষিত হয়। ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) কর্তৃক অনুমোদিত কিছু অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ও অ্যাংজিওলাইটিক ওষুধ সহজলভ্য হলেও, সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এর ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং টুলস এবং রেফারেল সিস্টেমের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মায়েদের জন্য প্রসবোত্তর যত্ন কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্য উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যাতে তৃণমূল পর্যায়েই এই সংকট চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা যায়।

সূচক ২০১৮ ২০২০ ২০২২ উন্নতি/অবনতি (%) (২০১৮-২০২২)
প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মায়ের সংখ্যা (প্রতি ১০০০ জনে) ১৮০ ১৯৫ ২০০ +১১.১১%
পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির হার (%) ১২% ১৩% ১৪% +২%
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলিতে প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং হার (%) ৫% ৭% ১০% +৫%
প্রসবোত্তর সাইকোসিস চিহ্নিত হওয়ার ঘটনা (প্রতি ১০০০০০ জনে) ০.৮ ০.৯ ১.০ +২৫%

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০২৩।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কে জাতীয় মাতৃস্বাস্থ্য নীতি, ২০০১ (National Maternal Health Policy, 2001) এর অধীনে প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে একটি বাধ্যতামূলক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং ও কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী (SOP) তৈরি করতে হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর যৌথ উদ্যোগে প্রসূতিবিদ্যা এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের জন্য প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বাধ্যতামূলক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সূচনা করতে হবে, যাতে তারা প্রসবোত্তর চেকআপের সময় মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারেন এবং প্রয়োজনে আইইডিসিআর (IEDCR) এর রেফারেল গাইডলাইন অনুযায়ী উচ্চতর সেবার জন্য প্রেরণ করতে পারেন।
  • ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) কে প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ব্যবহৃত ওষুধের সহজলভ্যতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য এই ওষুধগুলির সঠিক ব্যবহার ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট এবং প্রশিক্ষণ সেশনের আয়োজন করতে হবে, যাতে অবাঞ্ছিত ওষুধের অপব্যবহার রোধ করা যায় এবং নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফারজানা খাতুন

ডা. ফারজানা খাতুন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator