নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক প্রস্তুতি: উপেক্ষিত প্রশিক্ষণ নাকি অনভিজ্ঞতার দায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক প্রস্তুতি: উপেক্ষিত প্রশিক্ষণ নাকি অনভিজ্ঞতার দায়?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক প্রস্তুতি: উপেক্ষিত প্রশিক্ষণ নাকি অনভিজ্ঞতার দায়?
নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক প্রস্তুতি: উপেক্ষিত প্রশিক্ষণ নাকি অনভিজ্ঞতার দায়?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় উঠে এসে...

সম্প্রতি ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় উঠে এসেছে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষকদের প্রস্তুতিহীনতার বিষয়টি। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের নতুন পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন কৌশল এবং শিখন-শেখানো কার্যক্রমে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত এই শিক্ষাক্রমের মূল দর্শন হলো মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনকে প্রাধান্য দেওয়া, যেখানে শিক্ষক শুধু তথ্য সরবরাহকারী নন, বরং একজন ফ্যাসিলিটেটর বা পথপ্রদর্শক। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন; অনেক শিক্ষকই নিজেদের অপ্রস্তুত মনে করছেন এবং প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন পদ্ধতিতে ক্লাস পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নতুন শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি পূর্বশর্ত হলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় স্তরেই প্রশিক্ষণের মান ও পরিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে কাজ করলেও, সাধারণ শিক্ষা ধারার শিক্ষকদের জন্য যে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, তা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের শুরুর দিকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য পরিচালিত পাঁচ দিনের যে প্রশিক্ষণ কর্মশালা ছিল, তা নতুন শিক্ষাক্রমের মূল দর্শন, বিষয়বস্তু ও মূল্যায়ন পদ্ধতির গভীরতা অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট ছিল না বলে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরি, ক্লাসে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের দলগত কাজ তদারকির মতো বিষয়গুলোতে শিক্ষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের অভাব স্পষ্ট। অনেক শিক্ষকের ক্ষেত্রেই এই প্রশিক্ষণ ছিল একমুখী বক্তৃতাভিত্তিক, যেখানে শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল সীমিত। এর ফলস্বরূপ, শ্রেণীকক্ষে নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠদান পদ্ধতি প্রয়োগে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বিধা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণের এই সীমাবদ্ধতা শুধু নতুন শিক্ষাক্রমের ধারণাগত জটিলতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রায়োগিক দিকও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের অনেক স্কুলেই প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের অভাব রয়েছে, যা নতুন শিক্ষাক্রমে গুরুত্বপ্রাপ্ত ডিজিটাল শিক্ষণ পদ্ধতির বাস্তবায়নে বড় বাধা। এছাড়াও, দূরবর্তী বা গ্রামীণ এলাকার শিক্ষকদের জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হলেও, ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকায় অনেকেই এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা তাদের অর্জিত জ্ঞান সহকর্মীদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পান না বা এর জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই, যার ফলে প্রশিক্ষণের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে। শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং নিয়মিত ফলো-আপ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।

শিক্ষাবর্ষ নতুন শিক্ষাক্রমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক (আনুমানিক) প্রয়োজনীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান (পর্যবেক্ষণ) ডিজিটাল শিক্ষণ উপকরণ ব্যবহারকারী শিক্ষক (%)
২০২৩ ৩,০০,০০০ অপর্যাপ্ত ৪০
২০২৪ ৪,৫০,০০০ গড়পড়তা ৫০
২০২৫ (লক্ষ্যমাত্রা) ৭,০০,০০০ উন্নত ৭০

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ব্যানবেইস ও এনসিটিবি-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সমীক্ষা (২০২৩-২০২৪)

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি এবং জাতীয় শিক্ষক শিক্ষা একাডেমি (নায়েম) সমন্বিতভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদী, মডিউলভিত্তিক ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে শিক্ষকদের জন্য কমপক্ষে ১৫ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত ফলো-আপ ও রিফ্রেশার কোর্সের ব্যবস্থা থাকবে, যা 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০'-এর শিক্ষক প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত ধারাগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন মডেলকে অনুসরণ করে সাধারণ শিক্ষা শিক্ষকদের জন্য 'শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন সনদ' প্রোগ্রাম চালু করা হবে, যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতা, উদ্ভাবনী পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব বোঝার মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা যাচাই ও স্বীকৃতি প্রদান করা হবে।
  • ব্যানবেইস-এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো (মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ইন্টারনেট সংযোগ) নিশ্চিত করতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে এবং ইউজিসি-এর সহযোগিতায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষাক্রমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কারিকুলাম অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যৎ শিক্ষকদের প্রস্তুত করা হবে, যা 'শিক্ষা আইন ২০২২ (প্রস্তাবিত)'-এর আলোকে শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator