সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত ও বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ গত পাঁচ বছরে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয়গুলোতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই পরিসংখ্যানটি দেশের সার্বিক ডিজিটাল বিভাজন এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্য পূরণে নারী উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য, যা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠাতেও সহায়ক হবে।
এই ডিজিটাল বিভাজন কেবল উচ্চশিক্ষার স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এর গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য মতে, দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে নারী শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ব্যবহার এবং ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের হার শহরাঞ্চলের তুলনায় অনেক কম। এই পার্থক্যটি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, কারণ আধুনিক ব্যবসার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার অপরিহার্য। ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে দক্ষতা না থাকলে নারী উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেও, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং উন্নত প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এর ফলে, অনেক সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাগুলোকে বাস্তবে রূপান্তর করতে পারছেন না, অথবা তাদের ব্যবসার পরিধি সীমিত থাকছে।
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, এই ক্ষেত্রে বেশ কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অধীনে পরিচালিত প্রকল্পগুলো নারী উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর অধীনে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বিভিন্ন ট্রেডে নারীদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। এই প্রশিক্ষণগুলো নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, যেখানে তারা ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ শিখছেন। তবে, এই প্রশিক্ষণগুলোকে আরও আধুনিক ও বাজারমুখী করা প্রয়োজন, যাতে তারা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা মেটাতে পারে। ব্লকচেইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো উদীয়মান প্রযুক্তিগুলোতে নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের কেবল উদ্যোক্তা হিসেবেই নয়, বরং প্রযুক্তি খাতের পেশাদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। এর ফলে, তারা ডিজিটাল অর্থনীতির মূলধারায় আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
| প্রতিষ্ঠানের নাম | নারী প্রশিক্ষণার্থী/শিক্ষার্থী (২০২২-২৩) | মোট প্রশিক্ষণার্থী/শিক্ষার্থী (২০২২-২৩) | নারীর অনুপাত (%) |
|---|---|---|---|
| ইউজিসি (উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, STEM) | ৬৭,৪৫০ | ২,৬৯,৮০০ | ২৫.০০% |
| ব্যানবেইস (কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা) | ১,১২,৭০০ | ৫,৬০,০০০ | ২০.১২% |
| এনএসডিএ (বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কোর্স) | ৯২,৪০০ | ৪,২০,০০০ | ২২.০০% |
| কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (SEIP প্রকল্প) | ৮৮,২০০ | ৪,২০,০০০ | ২১.০০% |
উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩), ব্যানবেইস শিক্ষা পরিসংখ্যান (২০২৩), এনএসডিএ বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩), SEIP প্রকল্প অগ্রগতি প্রতিবেদন (২০২৩)
সুপারিশ
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এর তত্ত্বাবধানে একটি সুনির্দিষ্ট 'নারী উদ্যোক্তা ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি নীতিমালা' প্রণয়ন করা হোক, যা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা এবং সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করবে। এই নীতিমালায় স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা হবে।
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউজিসি যৌথভাবে সকল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোটা এবং বৃত্তি চালু করবে। এর পাশাপাশি, Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর আওতায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য উন্নত প্রযুক্তি (যেমন AI, IoT, Blockchain) ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ কমপক্ষে দ্বিগুণ করা হোক।
- ব্যানবেইস-এর সহযোগিতায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে 'নারী ডিজিটাল উদ্যোক্তা হাব' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যেখানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা, ডিজিটাল ডিভাইস এবং প্রযুক্তিগত পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করা হবে। এই হাবগুলো নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ইনকিউবেশন সেন্টার হিসেবে কাজ করবে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শনে সহায়তা করবে।