সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থ বছরে (২০২২-২৩) প্রান্তিক পর্যায়ে টেলিমেডিসিন সেবার আওতায় আনা হয়েছে প্রায় ১.২ কোটি মানুষকে, যা পূর্ববর্তী অর্থ বছরের তুলনায় প্রায় ৪০% বেশি। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি স্বকীয় ও উদ্ভাবনী মডেলের নীরব সাফল্যের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম ও দুর্গম অঞ্চলে যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব প্রকট, সেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে, সীমিত সম্পদ এবং ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কীভাবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবাকে তার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করছে।
বাংলাদেশের টেলিমেডিসিন মডেলের মূল ভিত্তি হলো কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মতো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর সাথে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশিকা এবং বাংলাদেশ সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' রূপকল্পের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, এই মডেলটি কেবল ভার্চুয়াল পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি ই-প্রেসক্রিপশন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) উভয়ই বাংলাদেশের টেলিমেডিসিন প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে, যা এই উদ্যোগের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। এই বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ফলে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা এখন স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে সরাসরি যুক্ত হতে পারছেন, যা রোগীদের সময়, অর্থ এবং শারীরিক কষ্ট লাঘবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এই সমন্বিত পদ্ধতির কারণে, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরাও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় দক্ষ হয়ে উঠেছেন, যা সেবার মান ও সহজলভ্যতা উভয়ই বৃদ্ধি করেছে।
বাংলাদেশের এই উদ্ভাবনী মডেলের একটি বড় দিক হলো এর ব্যয়-কার্যকারিতা এবং অভিযোজন ক্ষমতা। বহু উন্নত দেশে টেলিমেডিসিন মূলত বেসরকারি খাতের উদ্যোগে এবং তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হলেও, বাংলাদেশ সরকার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে একটি সাশ্রয়ী মডেল তৈরি করেছে। এই মডেলের অধীনে, রোগীরা নিকটস্থ ক্লিনিকে এসে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন, যা আর্থিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত সহায়ক। উপরন্তু, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত 'স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩' হেল্পলাইনটি দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে টেলিফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান করে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। এই মডেলের সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ADB-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, টেলিমেডিসিন সেবার কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে রোগীর আগমন প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এই সেবা মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই বৃদ্ধি শুধু শহরের চাপ কমায়নি, বরং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মানকেও উন্নত করেছে, যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের টেলিমেডিসিন মডেলের উদ্ভাবনী দিকগুলো বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। যেখানে অনেক দেশ এখনো টেলিমেডিসিনকে একটি সহযোগী সেবা হিসেবে দেখছে, সেখানে বাংলাদেশ এটিকে তার জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়, যখন সশরীরে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন বাংলাদেশের টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলো লাখ লাখ মানুষকে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সক্ষম হয়েছিল। এই সময়ে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দ্রুততার সাথে টেলিমেডিসিন প্রোটোকল হালনাগাদ করে এবং চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে, যাতে তারা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে রোগীদের কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারেন। বিশ্ব ব্যাংক তাদের 'বাংলাদেশ হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট'-এর আওতায় টেলিমেডিসিন অবকাঠামো উন্নয়নে অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করেছে, যা এই খাতের স্থিতিশীলতাকে আরও জোরদার করেছে। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে টেলিমেডিসিনের ভূমিকা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, বরং একটি স্থিতিস্থাপক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির সমন্বয় থাকলে দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং একটি বাস্তব ও কার্যকর সমাধান।
| সূচক | ২০২০-২১ | ২০২১-২২ | ২০২২-২৩ |
|---|---|---|---|
| টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে উপকৃত রোগীর সংখ্যা (কোটি) | ০.৭০ | ০.৮৫ | ১.২ |
| কমিউনিটি ক্লিনিকে টেলিমেডিসিন সুবিধা চালু (শতাংশ) | ৪০% | ৬০% | ৮০% |
| স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩-এ কলের সংখ্যা (মিলিয়ন) | ১.৫ | ২.২ | ৩.৫ |
| স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণের হার (টেলিমেডিসিন) | ৩০% | ৫০% | ৭০% |
উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ
সুপারিশ
- জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১ (সংশোধিত) অনুযায়ী, টেলিমেডিসিন সেবার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও বিস্তারিত আইন প্রণয়ন করা হোক, যা সেবার মান, ডেটা সুরক্ষা, চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক এবং দায়বদ্ধতার সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশল ২০৩০ বাস্তবায়নে, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি পূর্ণাঙ্গ 'টেলিমেডিসিন হাব' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যেখানে উন্নত ব্যান্ডউইথ, রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি (যেমন: ডিজিটাল স্টেথোস্কোপ, ওটোস্কোপ) এবং প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ নিশ্চিত করা হবে। এই প্রকল্পে ADB এবং World Bank-এর চলমান সহায়তা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
- প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টেলিমেডিসিন সেবার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এবং ডিজিটাল বিভাজন কমাতে, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ-এর সমন্বয়ে গ্রামীণ এলাকায় সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হোক।