জন্মের এক ঘণ্টা: নবজাতকের সোনালি মুহূর্ত ও আমাদের অবহেলা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জন্মের এক ঘণ্টা: নবজাতকের সোনালি মুহূর্ত ও আমাদের অবহেলা

ডা. ফারজানা খাতুন  avatar   
ডা. ফারজানা খাতুন
জন্মের এক ঘণ্টা: নবজাতকের সোনালি মুহূর্ত ও আমাদের অবহেলা
জন্মের এক ঘণ্টা: নবজাতকের সোনালি মুহূর্ত ও আমাদের অবহেলা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ৫০% নবজাতক জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ পান করার সুযোগ ...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ৫০% নবজাতক জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ পান করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি নবজাতকের জীবন রক্ষা এবং সুস্থ ভবিষ্যতের পথে এক বিশাল অন্তরায়, যা আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি গুরুতর অবহেলাকে চিহ্নিত করে। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে এই হার আরও বেশি, যেখানে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষায় সচেতনতা এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি প্রকট। যদিও সরকার মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক শক্তিশালীকরণ এবং ধাত্রী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কিন্তু নবজাতকের 'সোনালি এক ঘণ্টা' নিশ্চিতকরণে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

মাতৃদুগ্ধ পানের এই 'সোনালি এক ঘণ্টা' বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, এটি নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং প্রথম মাসের শিশুমৃত্যু হার কমাতে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। মায়ের প্রথম দুধ, যা কলোস্ট্রাম নামে পরিচিত, সেটি অ্যান্টিবডি এবং পুষ্টি উপাদানে ভরপুর থাকে, যা শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এই সময়ে মায়ের সংস্পর্শে থাকা শিশুর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং মা ও শিশুর মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক হাসপাতালে, এমনকি কিছু উন্নতমানের ক্লিনিকেও, নবজাতককে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা, অপ্রয়োজনীয় গোসল করানো, বা ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত নবজাতক যত্ন নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন আশানুরূপ নয়। নবজাতক পরিচর্যার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব এবং প্রচলিত কুসংস্কারও এই অবহেলার অন্যতম কারণ। উদাহরণস্বরূপ, অনেক জায়গায় এখনও জন্মের পরপরই শিশুকে মধু বা চিনির জল খাওয়ানোর রেওয়াজ দেখা যায়, যা শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক হতে পারে। IEDCR (Institute of Epidemiology, Disease Control and Research) এর তথ্য অনুযায়ী, অপরিণত নবজাতকদের ক্ষেত্রে সংক্রমণজনিত অসুস্থতা একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়, যেখানে কলোস্ট্রামের ভূমিকা অপরিহার্য।

এই অবহেলার পেছনে শুধু প্রশিক্ষণের অভাব নয়, বরং নীতিগত দুর্বলতা এবং মনিটরিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও দায়ী। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, জন্মের পরপরই মায়ের সংস্পর্শে না থাকা শিশুর মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মায়ের সাথে ত্বকের সংস্পর্শ (skin-to-skin contact) শিশুর মানসিক স্থিতি এবং মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সিজারিয়ান ডেলিভারির পর, মাকে জ্ঞান ফিরে না আসা পর্যন্ত শিশুকে দূরে রাখা হয়, যা এই মূল্যবান সময়কে নষ্ট করে দেয়। DGDA (Directorate General of Drug Administration) যদিও ফর্মুলা দুধের বিজ্ঞাপনের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তবুও অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে বা অসাধু চক্রের মাধ্যমে এর প্রচলন এখনও বিদ্যমান, যা অনেক নতুন মাকে ভুল পথে পরিচালিত করে। এই সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য, যেখানে চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী, পরিবার এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

বছর জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মাতৃদুগ্ধ পান করানো শিশুর শতাংশ প্রথম ছয় মাস শুধু মাতৃদুগ্ধ পান করানো শিশুর শতাংশ নবজাতকের মৃত্যুহার (প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে)
২০১৪ ৪৫% ৫৫% ২৩
২০১৯ ৪৯% ৬৫% ১৮
২০২৩ (প্রাক্কলিত) ৫০% ৬৯% ১৭

উৎস: বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (BDHS), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক নবজাতকের 'সোনালি এক ঘণ্টা' নিশ্চিতকরণে জাতীয় নির্দেশিকা (National Guideline for Newborn Care) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে, সকল সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্মের পরপরই মায়ের ত্বকের সাথে শিশুর সংস্পর্শ (skin-to-skin contact) এবং প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এর জন্য নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং IEDCR এর সহায়তায় মা ও শিশুর মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য 'সোনালি এক ঘণ্টা' এর গুরুত্ব সম্পর্কে চিকিৎসক, নার্স এবং ধাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যেখানে ব্যবহারিক দক্ষতা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর জোর দেওয়া হবে। এছাড়াও, DGDA কে ফর্মুলা দুধের অননুমোদিত বিপণন ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মা ও পরিবারকে 'সোনালি এক ঘণ্টা' এবং মাতৃদুগ্ধ পানের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। এক্ষেত্রে, জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (National Nutrition Council) এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে (Directorate General of Family Planning) সম্পৃক্ত করে নিয়মিত কর্মশালা ও প্রচারণার আয়োজন করতে হবে, যা প্রসবপূর্ব যত্ন (ANC) সেবার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফারজানা খাতুন

ডা. ফারজানা খাতুন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator