ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ডিজিটাল বাজারমুখী যাত্রা: সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ডিজিটাল বাজারমুখী যাত্রা: সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান

সাদিয়া রহমান  avatar   
সাদিয়া রহমান
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ডিজিটাল বাজারমুখী যাত্রা: সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ডিজিটাল বাজারমুখী যাত্রা: সম্ভাবনা ও বাস্তবতার ব্যবধান
ছবি: সংগৃহীত

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত 'জাতীয় এসএমই নীতি ২০২২' ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণকে একটি মূল ...

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত 'জাতীয় এসএমই নীতি ২০২২' ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণকে একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) উৎপাদিত পণ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাজারে সহজে প্রবেশাধিকার দেওয়া, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের সাথে বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, যদিও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সম্ভাবনা বিশাল এবং এর মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ বিদ্যমান, তবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের একটি বড় অংশ এখনও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারছে না। বিশেষ করে প্রান্তিক ও গ্রামীণ অঞ্চলের উদ্যোক্তারা ডিজিটাল বাজারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যার ফলস্বরূপ সামগ্রিক অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার যে প্রত্যয়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পিছিয়ে পড়ছে।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য ডিজিটাল বাজারমুখী যাত্রা নিঃসন্দেহে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কোভিড-১৯ মহামারীকালে যখন প্রচলিত বাজার ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল এবং ভোক্তারা ঘরে বসে কেনাকাটায় অভ্যস্ত হচ্ছিলেন, তখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোই অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছিল। এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিত্তিক উদ্যোগগুলো, বিশেষ করে ফেসবুক ভিত্তিক ছোট ছোট ব্যবসা, অভাবনীয় প্রসার লাভ করে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে সঠিক সুযোগ ও অবকাঠামো পেলে এই খাত দেশের রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম। হস্তশিল্প, কারুশিল্প, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, চামড়াজাত পণ্য এবং স্থানীয় কৃষিপণ্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারছে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে উদ্যোক্তাদের মুনাফার অংশ বাড়াতে সাহায্য করছে। বিভিন্ন দেশীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম যেমন দারাজ, আজকেরডিল, অথবা ছোট ছোট স্থানীয় অনলাইন শপগুলো স্থানীয় পণ্যের জন্য একটি বিশাল বাজার তৈরি করেছে। এটি শুধু বিপণন প্রক্রিয়ায় বিপ্লব আনেনি, বরং উদ্যোক্তাদের উৎপাদন কৌশল, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করেছে। এমনকি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজারে এসএমইদের তালিকাভুক্তির জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার একটি পরোক্ষ সুবিধা হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আর্থিক তথ্য ডিজিটালাইজেশন এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সাথে তাদের পরিচিতি ও অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের ডিজিটাল বাজারমুখী যাত্রাকে আরও বেগবান করতে পারে। এই ডিজিটাল রূপান্তর কেবল পণ্যের বিপণন নয়, বরং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ, সরবরাহ চেইনকে আরও স্বচ্ছ এবং গ্রাহকদের চাহিদা সম্পর্কে আরও সূক্ষ্ম ধারণা লাভে সহায়তা করছে, যা ক্ষুদ্র শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের আয় বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে।

তবে, সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার চিত্রটি বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং এর বহুবিধ কারণ রয়েছে। ডিজিটাল বাজারমুখী যাত্রার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধাগুলির মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত দুর্বলতা। সিপিডি-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫% ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে পণ্য তালিকাভুক্তিকরণ, গ্রাহক সেবা প্রদান এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক মৌলিক বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। তাদের অনেকেই একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারলেও, অনলাইন ব্যবসার জটিলতাগুলো বুঝতে বা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম। উপরন্তু, উচ্চগতির ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের অভাব, বিশেষ করে গ্রামীণ ও দূরবর্তী অঞ্চলে, এবং নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট গেটওয়ে সুবিধার সীমাবদ্ধতা ডিজিটাল লেনদেনকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলে। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, ফলে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবহার করতে হলেও সেগুলোর লেনদেন সীমা এবং চার্জ তাদের জন্য একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর জটিল ভ্যাট ও ট্যাক্স নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষুদ্র অনলাইন বিক্রেতাকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশে নিরুৎসাহিত করে। অনলাইনে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভ্যাট এবং এর হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব অনেককে কর ফাঁকি দিতে বাধ্য করে অথবা তারা আনুষ্ঠানিক ব্যবসা থেকে দূরে থাকেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের প্রবৃদ্ধি এবং সরকারি সহায়তা প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রায়শই বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর উচ্চ কমিশন হার, মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অপ্রতুলতার কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। একটি ছোট অনলাইন ব্যবসার জন্য পণ্য পরিবহন, ডেলিভারি এবং রিটার্ন ব্যবস্থাপনার খরচ অনেক বেশি হয়ে থাকে, যা তাদের মুনাফাকে প্রভাবিত করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করলেও, মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রি শুরু করার জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগের অভাবও একটি বড় বাধা, কারণ পণ্য ফটোগ্রাফি, আকর্ষণীয় বর্ণনা তৈরি, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট বা প্ল্যাটফর্ম সাবস্ক্রিপশনের জন্য তাদের পর্যাপ্ত পুঁজি থাকে না। এই প্রতিবন্ধকতাগুলো ডিজিটাল বাজারের সুবিধার সুষম বন্টনে বাধা দিচ্ছে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশকে প্রথাগত, সীমিত বাজারের উপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য করছে, যার ফলে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের অবদান প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না।

সূচক তথ্য উৎস
জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান (২০২২-২৩) ২৫% বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
অনলাইন উপস্থিতি আছে এমন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার হার (২০২৩) ১৮% সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
ই-কমার্স খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (২০২২) ২৫% বাংলাদেশ ব্যাংক
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) কর্তৃক ডিজিটাল মাধ্যমে এসএমই পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা (২০২৫) ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ইপিবি কৌশলগত পরিকল্পনা
ডিজিটাল সাক্ষরতা ও দক্ষতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার হার (২০২৩) ৬৫% সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

উৎস: উপরিউক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রকাশিত প্রতিবেদন ও গবেষণা।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) যৌথ উদ্যোগে 'জাতীয় ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি'র আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিনামূল্যে ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবস্থাপনা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করবে। এটি 'জাতীয় এসএমই নীতি ২০২২' এর ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল বাজারের জন্য প্রস্তুত করবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অনলাইন লেনদেনের জন্য একটি সরলীকৃত ভ্যাট ও ট্যাক্স কাঠামো প্রণয়ন করবে, যেখানে বার্ষিক টার্নওভারের ভিত্তিতে ন্যূনতম কর নির্ধারণ এবং ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে সেবার ফি কমানোর সুনির্দিষ্ট নীতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি 'জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতি ২০১৮' এর সাথে সঙ্গতি রেখে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তিতে উৎসাহিত করবে এবং তাদের আর্থিক বোঝা কমাবে।
  • রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্য প্রদর্শনের জন্য বিশেষ 'ডিজিটাল হাট' বা 'ভার্চুয়াল মেলা' আয়োজন করবে এবং আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে (যেমন Alibaba, Etsy, Amazon) তাদের পণ্য তালিকাভুক্তির জন্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। এই উদ্যোগ 'জাতীয় রপ্তানি নীতি ২০২২-২৫' এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাদিয়া রহমান

সাদিয়া রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এসএমই (SME) ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator