কপ২৮-এ (COP28) নবগঠিত 'ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল' (Loss and Damage Fund) কার্যকর করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এক নতুন আশার সঞ্চার করলেও, এর বাস্তব সুগম্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সম্প্রতি, এই তহবিলের প্রাথমিক অর্থায়ন কাঠামো এবং পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (UNFCCC) এর আলোচনায় বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: DAE, BARI, BRRI, BARC) সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও, অতীতে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (GEF) বা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) থেকে অর্থায়নের অভিজ্ঞতা বলছে, তহবিল প্রাপ্তি এবং তার কার্যকর ব্যবহার এক দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তার তুলনায় প্রাপ্ত তহবিলের পরিমাণ এবং এর বিতরণ প্রক্রিয়া যথেষ্ট শ্লথ ও অপ্রতুল।
বাংলাদেশের কৃষি খাত, যা দেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার উৎস, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অসময়ে বৃষ্টিপাত দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। উদাহরণস্বরূপ, বোরো ও আমন ধানের উৎপাদন চক্রে অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়শই কৃষককে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এই ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অর্থায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি, কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান (যেমন: BRRI, BARC) জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলনে নিরলস কাজ করলেও, বৃহৎ পরিসরে এসব প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব রয়েছে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (GCF) মতো সংস্থাগুলো থেকে প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতা এবং কঠোর শর্তাবলী প্রায়শই ছোট ও মাঝারি আকারের প্রকল্পের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, যা স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান প্রদানে বিলম্ব ঘটায়।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতার অভাব বাংলাদেশের জন্য অর্থ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) এই তহবিলগুলো থেকে অর্থ পেতে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করলেও, প্রকল্প প্রস্তাবনা দাখিল থেকে শুরু করে অর্থ ছাড় এবং তার নিরীক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দীর্ঘ সময় লাগে। অনেক সময় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ, সক্ষমতা যাচাই এবং পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (ESIA) সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় ও সময় লাগে, যা তহবিলের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে। এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক তহবিলের শর্তাবলী সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়াও একটি গুরুতর সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ, লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে BRRI-এর সাফল্য থাকলেও, এই জাতগুলো কৃষকদের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের লবণাক্ত জমির জন্য প্রয়োজনীয় সেচ ব্যবস্থা বা বিকল্প আয়ের উৎস তৈরিতে তহবিল প্রাপ্তি তুলনামূলকভাবে কঠিন। একইসঙ্গে, BARC-এর মাধ্যমে উদ্ভাবিত জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তিগুলো মাঠপর্যায়ে প্রসারে DAE-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
| তহবিল/সংস্থা | মোট অঙ্গীকারকৃত অর্থ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | মোট অনুমোদিত প্রকল্প (সংখ্যা) | মোট ছাড়কৃত অর্থ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | মূল খাত | শেষ হালনাগাদ সাল |
|---|---|---|---|---|---|
| গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) | ৬০০ | ১০ | ২৫০ | অভিযোজন, প্রশমন, খাদ্য নিরাপত্তা | ২০২৩ |
| গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (GEF) | ২৫০ | ৩০ | ১৫০ | জৈববৈচিত্র্য, ভূমি অবক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তন | ২০২২ |
| ক্লাইমেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডস (CIFs) | ৮০ | ২ | ৫০ | নবায়নযোগ্য শক্তি, জলবায়ু সহনশীলতা | ২০২১ |
| অভিযোজন তহবিল (Adaptation Fund) | ৬০ | ৪ | ৪০ | জলবায়ু অভিযোজন | ২০২২ |
উৎস: GCF, GEF, CIFs, Adaptation Fund এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও UNFCCC এর তথ্য (২০২১-২০২৩)
সুপারিশ
- ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল থেকে অর্থ প্রাপ্তির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর নেতৃত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করা, যেখানে DAE, BARI, BRRI, BARC সহ কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, এবং একটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়ন কাঠামো (Project Proposal Development Framework) তৈরি করা।
- আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলগুলোর শর্তাবলী ও প্রক্রিয়া সরলীকরণের জন্য UNFCCC ফোরামে সক্রিয় ও গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য 'ডিরেক্ট একসেস' (Direct Access) প্রক্রিয়া আরও সুগম করতে GCF-এর মতো তহবিলগুলোর পরিচালনা পর্ষদে জোরালো ও সম্মিলিত দাবি উত্থাপন করা।
- জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপণ এবং তার ভিত্তিতে প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির জন্য BARC-এর তত্ত্বাবধানে একটি জাতীয় ডেটাবেজ ও মডেলিং সেন্টার স্থাপন করা, যা BRRI ও BARI-এর গবেষণা ফলাফল এবং DAE-এর মাঠপর্যায়ের তথ্য ব্যবহার করে কার্যকর ক্ষতিপূরণ তহবিল আবেদন প্রস্তুত করবে।