সম্প্রতি, বাংলাদেশ পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক কার্বন বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য খসড়া বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ এবং বিশ্বব্যাংকের কার্বন ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটির আওতায় বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা, দেশের সবুজ অর্থনীতির রূপান্তরে কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। যদিও এই উদ্যোগটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন, তবে এর বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে এখনো অনেক ধোঁয়াশা বিদ্যমান। বিশেষ করে কৃষি খাত, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, সেখানে কার্বন ক্রেডিটের প্রকৃত সম্ভাবনা উন্মোচন করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছ নীতিমালা অপরিহার্য। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি অন্যদিকে এই কাঠামোর দুর্বলতাগুলোও আলোচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, কার্বন ক্রেডিট অর্জনের মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কৃষি, বন ও ভূমি ব্যবহার খাত অন্যতম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জলবায়ু-সহনশীল ফসল উদ্ভাবন ও টেকসই কৃষি পদ্ধতির প্রচলনে কাজ করলেও, এই কার্যক্রমগুলোকে সরাসরি কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের সাথে যুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহার কৃষিক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণের অন্যতম কারণ। যদি DAE ও BARI এর মাধ্যমে সৌরশক্তি-চালিত সেচ পাম্প বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মতো পদ্ধতিগুলোকে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে তা কেবল কার্বন নিঃসরণই কমাবে না, বরং কৃষকদের জন্য কার্বন ক্রেডিট উপার্জনের পথও খুলে দেবে। তবে, এই ধরনের প্রকল্পগুলোর কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পরিমাপ, যাচাই ও নিবন্ধনের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার অনুপস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে কার্বন ক্রেডিট সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য BARC এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু বর্তমানে এর কোনো সমন্বিত উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কার্বন স্টক বৃদ্ধি। বন বিভাগ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বনায়ন কর্মসূচী চালালেও, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর উদ্ভাবিত কম মিথেন উদগীরণকারী ধানের জাত এবং ধান চাষের আধুনিক পদ্ধতিগুলো কার্বন ক্রেডিট অর্জনের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশেষ করে, 'আর্দ্র-শুষ্ক' (Alternate Wetting and Drying - AWD) পদ্ধতির মাধ্যমে ধান চাষে মিথেন গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ৩০-৭০% কমানো সম্ভব। যদি এই পদ্ধতি DAE এর মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং এর কার্বন সঞ্চয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়, তবে বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিট বাজারে একটি বড় অংশীদার হতে পারে। কিন্তু এই ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এছাড়াও, কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত লভ্যাংশ কীভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছাবে এবং এই প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ হবে, তা নিয়েও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন। বর্তমানে, এই প্রক্রিয়াগুলো আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার এবং বাংলাদেশের স্থানীয় সক্ষমতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি করেছে, যা সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলেও বাস্তবায়নের পথে জটিলতা সৃষ্টি করছে।
| খাত | কার্বন নিঃসরণ হ্রাস/সঞ্চয়ের কৌশল | সম্ভাব্য কার্বন ক্রেডিট (টন CO2e/বছর) | বাস্তবায়নকারী/সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান |
|---|---|---|---|
| কৃষি (ধান চাষ) | AWD পদ্ধতি ও কম মিথেন উদগীরণকারী জাত | ১২-১৫ মিলিয়ন | BRRI, DAE |
| কৃষি (সার ব্যবস্থাপনা) | দক্ষ সার ব্যবহার ও জৈব সার প্রয়োগ | ২-৪ মিলিয়ন | BARI, DAE |
| বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ | সামাজিক বনায়ন ও উপকূলীয় বনায়ন | ২৫-৩০ মিলিয়ন | পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ |
| পানি ব্যবস্থাপনা (সেচ) | সৌরশক্তি-চালিত পাম্প ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ | ৫-৮ মিলিয়ন | DAE, BARI |
উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন (২০২২-২০২৩ সালের আনুমানিক গড়)
সুপারিশ
- পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র 'কার্বন ক্রেডিট ট্রাস্ট ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার থেকে প্রাপ্ত অর্থ জমা হবে। এই ফান্ডের অর্থ DAE, BARI, BRRI এবং BARC এর মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রচলন ও কৃষকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা হবে, যাতে কার্বন ক্রেডিট উৎপাদনকারী প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক ব্যয় নির্বাহ হয়।
- DAE ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় কার্বন ক্রেডিট নিবন্ধন ও যাচাইকরণ কর্তৃপক্ষ' গঠন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন, Verra বা Gold Standard) অনুযায়ী কৃষি ও বন খাতের কার্বন নিঃসরণ হ্রাস বা সঞ্চয় পরিমাপ, নিরীক্ষা ও নিবন্ধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। এই কর্তৃপক্ষ BARC এর গবেষণা ফলাফল ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় কাজ করবে।
- BRRI এবং BARI-কে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় একটি 'কার্বন ফার্মিং পাইলট প্রোগ্রাম' চালু করতে হবে, যেখানে কৃষকদের জন্য কম মিথেন উদগীরণকারী ধান চাষ (AWD), জৈব সার ব্যবহার এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার উপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্যাকেজ থাকবে। সফল কৃষকদের কার্বন ক্রেডিট উৎপাদনে সহায়তা এবং সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির প্রক্রিয়া সহজ করতে DAE একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে।