নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কলকারখানার অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে স্থানীয় এলাকাবাসী মারাত্মক পানির সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গভীর নলকূপ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাবমার্সিবল পাম্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। এতে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের নলকূপে পানি ওঠা কমে গেছে, কোথাও কোথাও একেবারেই পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শিল্পকারখানাগুলো প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে, কিন্তু সেই পানি পুনর্ভরণের (Recharge) জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে একই এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোঃ হোসাইন বলেন, “ভূগর্ভস্থ পানি একটি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ। যত দ্রুত পানি তোলা হচ্ছে, তত দ্রুত প্রাকৃতিকভাবে তা পূরণ হচ্ছে না। এর ফলে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পানিও পাচ্ছে না। এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় ধরনের হুমকি।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করছে। বেশিরভাগ কারখানায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ব্যবস্থা কিংবা পানি পুনর্ব্যবহার (Reuse and Recycle) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না। ফলে একই এলাকার বাসিন্দাদের পানির অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়রা কেন পানি পাচ্ছে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়দের পানি সংকটের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে—
অতিরিক্ত গভীর নলকূপের ব্যবহার: শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প দিয়ে সার্বক্ষণিক পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যাওয়া: পুকুর, খাল, বিল ও জলাভূমি ভরাট হওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ করতে পারছে না।
অতিরিক্ত নগরায়ণ ও কংক্রিটকরণ: ভবন, রাস্তা ও শিল্প অবকাঠামোর কারণে পানি শোষণের প্রাকৃতিক ক্ষেত্র কমে গেছে।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অভাব: অধিকাংশ কারখানায় রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ব্যবস্থা নেই।
পানি পুনর্ব্যবহার না করা: উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত পানি পুনরায় ব্যবহার না করে নতুন করে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।
সরকারি নজরদারির দুর্বলতা: কতটুকু পানি উত্তোলন করা হচ্ছে তার কার্যকর মনিটরিং অনেক ক্ষেত্রে নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ৫০–৬০ ফুট গভীর নলকূপে পানি পাওয়া যেত, এখন ১৫০–৩০০ ফুট পর্যন্ত গভীর নলকূপ বসিয়েও অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
পানি নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোঃ হোসাইন সরকারের প্রতি জাতীয় পানি নীতিমালা ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “শিল্পকারখানার জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করতে হবে, লাইসেন্স ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।”
তিনি আরও দাবি করেন—
শিল্পকারখানায় রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বাধ্যতামূলক করা,
পানি পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা,
অবৈধ গভীর নলকূপ বন্ধ করা,
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়মিত পরিমাপ ও প্রকাশ করা,
জলাভূমি, খাল ও পুকুর সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া,
স্থানীয় জনগণের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করা।
পরিবেশবিদদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট আরও তীব্র হবে। তারা বলছেন, শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
স্থানীয় এলাকাবাসীও সরকারের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “কারখানার উন্নয়ন চাই, কিন্তু মানুষের পানির অধিকার নষ্ট করে নয়।”
কলকারখানার অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে স্থানীয় এলাকাবাসী পানির সংকটে..
ছবি: সংগৃহীত
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোঃ হোসাইনের পানি নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি..
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি