ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বনাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব: বাংলাদেশের সিনেমার বাজার দখলের নতুন রণনীতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বনাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব: বাংলাদেশের সিনেমার বাজার দখলের নতুন রণনীতি

ফারদিন খান  avatar   
ফারদিন খান
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বনাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব: বাংলাদেশের সিনেমার বাজার দখলের নতুন রণনীতি
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বনাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব: বাংলাদেশের সিনেমার বাজার দখলের নতুন রণনীতি
ছবি: সংগৃহীত

চলতি ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র 'Rehana Maryam Noor' কিংবা 'Shapludu'-এর মতো আলোচিত প্রজেক্টগুলোর অনুপস্থিতি, যা বিগত বছরগুলোতে বৈশ্...

চলতি ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র 'Rehana Maryam Noor' কিংবা 'Shapludu'-এর মতো আলোচিত প্রজেক্টগুলোর অনুপস্থিতি, যা বিগত বছরগুলোতে বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের সিনেমার পরিচিতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিল, নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই অনুপস্থিতি কি বৈশ্বিক চলচ্চিত্র বাজারের মূল স্রোত থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা আন্তর্জাতিক উৎসবের ঐতিহ্যবাহী গুরুত্বকে ম্লান করে দিচ্ছে — এই প্রশ্ন এখন দেশের চলচ্চিত্র মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। চলচ্চিত্র শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্থান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর সনাতনী ভূমিকায় এক মৌলিক পরিবর্তন এনেছে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একই সাথে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগের দ্বার উন্মোচন করেছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোকে তাদের কাজের বৈশ্বিক স্বীকৃতি এবং আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। বুসান, ভেনিস, রটারডাম, এবং কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো মঞ্চগুলো বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর 'ডুব' (No Bed of Roses) বা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের 'রেহানা মরিয়ম নূর' (Rehana Maryam Noor) আন্তর্জাতিক উৎসবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে, যা পরবর্তীতে তাদের বৈশ্বিক পরিবেশনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, চরকি, হইচই, এবং বায়োস্কোপের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো সিনেমার বাজারকে এক নতুন ধারায় প্রবাহিত করেছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো শুধুমাত্র দর্শকদের কাছে চলচ্চিত্র পৌঁছে দেওয়ার একটি নতুন মাধ্যম নয়, বরং এটি প্রযোজকদের জন্য সরাসরি রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে, যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, স্থানীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো দেশের মেধাবী নির্মাতাদের জন্য তাদের কাজ সরাসরি দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এবং এমনকি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও পরিচিতি লাভের একটি সুযোগ তৈরি করেছে, যা পূর্বে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক উৎসবের মাধ্যমে সম্ভব ছিল। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল কনটেন্ট স্ট্রিমিং-এর প্রবৃদ্ধি গত তিন বছরে প্রায় ২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি বিশাল বাজার তৈরি করেছে।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এই উত্থান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর কার্যকারিতায় এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। একসময় উৎসবগুলোই ছিল নতুন চলচ্চিত্রের প্রথম প্রদর্শনীস্থল এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের দৃষ্টি আকর্ষণের একমাত্র পথ। কিন্তু এখন অনেক চলচ্চিত্র সরাসরি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাচ্ছে, যা উৎসবের প্রিমিয়ারের ঐতিহ্যবাহী গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখন উৎসবে অংশগ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং অনিশ্চিত সাফল্যের পরিবর্তে দ্রুত ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি দিয়ে তাৎক্ষণিক দর্শক প্রতিক্রিয়া ও আর্থিক সুবিধা পেতে আগ্রহী হচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের অনেক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারি এখন সরাসরি ইউটিউব বা স্থানীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাচ্ছে, যা তাদের জন্য বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর একটি কার্যকর উপায়। এই প্রবণতা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। একদিকে, এটি নতুন প্রতিভা এবং পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রকে একটি প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে, যা মূলধারার পরিবেশনায় সুযোগ পেত না। অন্যদিকে, এটি আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপস্থিতি হ্রাস করতে পারে, যা বৈশ্বিক চলচ্চিত্র সমাজে দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করতে পারে। এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর এক বিশ্লেষণ অনুসারে, ডিজিটাল ইকোনমি এবং ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে তারা নিজেদের কাজকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারছেন। বাংলাদেশ সরকারও ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হিসেবে এই খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা প্রদান করছে, যা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্থানীয় চলচ্চিত্রের প্রচার ও প্রসারে সহায়ক হচ্ছে।

বছর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের অংশগ্রহণ (সংখ্যা) দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রিমিয়ার হওয়া বাংলাদেশী চলচ্চিত্র (সংখ্যা) বৈশ্বিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রিমিয়ার হওয়া বাংলাদেশী চলচ্চিত্র (সংখ্যা) চলচ্চিত্র শিল্পে ডিজিটাল বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি (শতাংশ)
২০২০ ১২ ১০%
২০২১ ১০ ১৫%
২০২২ ১২ ২০%
২০২৩ ১৫ ২৫%

উৎস: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC), স্থানীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিশ্বব্যাংক (World Bank) এর ডেটা বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে (যেমন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়) চলচ্চিত্র নীতিমালা ২০২৯ (প্রস্তাবিত) এর আওতায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট তহবিল এবং 'ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম প্রমোশন ডেস্ক' গঠন করতে হবে, যা উৎসবগুলোতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করবে এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি সুষম নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (যেমন 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮' এবং 'সম্প্রচার আইন ২০২৩' এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ) তৈরি করতে হবে, যা স্থানীয় কন্টেন্টের মান ও আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী পরিবেশনা নিশ্চিত করবে এবং প্রযোজকদের জন্য ন্যায্য রাজস্ব ভাগাভাগি নীতি প্রণয়ন করবে।
  • ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর সহায়তায় 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দেবে এবং একই সাথে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তাদের কাজের আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণে কৌশলগত সমর্থন প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারদিন খান

ফারদিন খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator