ইস্পাত শিল্প: বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট ও বাংলাদেশের টিকে থাকার লড়াই | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইস্পাত শিল্প: বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট ও বাংলাদেশের টিকে থাকার লড়াই

আলতাফ হোসেন  avatar   
আলতাফ হোসেন
ইস্পাত শিল্প: বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট ও বাংলাদেশের টিকে থাকার লড়াই
ইস্পাত শিল্প: বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট ও বাংলাদেশের টিকে থাকার লড়াই
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বৈশ্বিক ইস্পাত উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম তুরস্কের প্রধান ইস্পাত উৎপাদনকারী ইস্কেন্দেরুন আয়রন অ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কস (ISDEMIR) তাদের উৎপাদন সক...

সম্প্রতি, বৈশ্বিক ইস্পাত উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম তুরস্কের প্রধান ইস্পাত উৎপাদনকারী ইস্কেন্দেরুন আয়রন অ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কস (ISDEMIR) তাদের উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করার ঘোষণা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাতের কাঁচামাল, বিশেষত স্ক্র্যাপ ধাতুর সরবরাহ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা শিপিং খরচ আকাশচুম্বী করে তুলেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পের উপর। বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প মূলত আমদানিকৃত স্ক্র্যাপ ধাতু এবং স্পঞ্জ আয়রনের উপর নির্ভরশীল, যার প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে। এই নির্ভরতা বৈশ্বিক কাঁচামাল বাজারের ওঠানামার প্রতি শিল্পটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে এবং দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য এই খাতটি বর্তমানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

বাংলাদেশের ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন বিএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাত এবং আরএসআরএম, তাদের কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য মূলত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের উপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ ধাতুর দাম প্রতি টনে গড়ে ৫৫০-৬০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৫-২০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে, শিপিং খরচ প্রতি কন্টেইনারে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০০০-৪০০০ ডলারে পৌঁছেছে। এই উচ্চমূল্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের কারণে বাংলাদেশের ইস্পাত উৎপাদনকারীদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ইস্পাতের দাম বেড়েছে এবং নির্মাণ খাতের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিতে ইস্পাতের উচ্চমূল্য একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে, যা ২০২৪ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে কিছুটা সংশোধনের ইঙ্গিত দেয়।

এই সংকটের মোকাবিলায় বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পকে কৌশলগতভাবে টিকে থাকতে হলে কাঁচামাল আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং অভ্যন্তরীণ পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার উপর জোর দেওয়া অপরিহার্য। বর্তমানে, দেশের মধ্যে স্ক্র্যাপ ধাতু সংগ্রহের হার অত্যন্ত নগণ্য, যা মোট চাহিদার মাত্র ১০-১২ শতাংশ পূরণ করে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পর্যায়ে পুরোনো জাহাজ ভাঙা শিল্পের (Ship breaking industry) আধুনিকীকরণ এবং স্ক্র্যাপ সংগ্রহ নীতিমালার সংস্কার করা হলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কাঁচামাল সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সাথে, স্পঞ্জ আয়রন আমদানির জন্য বিকল্প দেশ, যেমন ভারত বা ইন্দোনেশিয়ার সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যেই দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় আরও সুদূরপ্রসারী এবং সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি সাশ্রয়ী উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের দিকে মনোনিবেশ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হবে।

কাঁচামাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের গড় মূল্য (প্রতি টন) ২০২১-২২ অর্থবছরের গড় মূল্য (প্রতি টন) পরিবর্তনের হার (%) বাংলাদেশের আমদানিতে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব (%)
স্ক্র্যাপ ধাতু (Heavy Melting Scrap) $575 $490 +17.35% 70% (ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা)
স্পঞ্জ আয়রন (Direct Reduced Iron - DRI) $420 $360 +16.67% 25% (ভারত ও মধ্যপ্রাচ্য)
ফেরো-অ্যালয় (Ferro Alloys) $1,800 $1,650 +9.09% 5% (চীন ও ভারত)

উৎস: World Bank Commodity Price Data (Pink Sheet), Bangladesh Bank Import Data, ADB Economic Outlook.

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে 'জাতীয় ইস্পাত শিল্প নীতি ২০২১' (National Steel Industry Policy 2021) পুনর্মূল্যায়ন করে কাঁচামাল আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং অভ্যন্তরীণ স্ক্র্যাপ সংগ্রহ বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করবে, যার মধ্যে জাহাজ ভাঙা শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব স্ক্র্যাপ প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের জন্য 'বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)' এর মাধ্যমে বিশেষ কর অবকাশ ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষত 'শিল্প মন্ত্রণালয়' এবং 'বাণিজ্য মন্ত্রণালয়' যৌথভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের ভবিষ্যৎ মূল্য প্রবণতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করার জন্য একটি স্থায়ী 'বাজার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা সেল' স্থাপন করবে, যা স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য আগাম সতর্কবার্তা এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
  • 'বাংলাদেশ ব্যাংক' এবং 'অর্থ মন্ত্রণালয়' যৌথভাবে ইস্পাত শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প সুদের বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ সুবিধা (Foreign Currency Loan Facility) চালু করবে, যা কাঁচামাল আমদানির খরচ স্থিতিশীল রাখতে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব কমাতে সাহায্য করবে; এই সুবিধা 'ইস্পাত শিল্প উন্নয়ন তহবিল' (Steel Industry Development Fund) এর অধীনে পরিচালিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আলতাফ হোসেন

আলতাফ হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভারী শিল্প, ইস্পাত ও সিমেন্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator