অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?..

রায়হান রশীদ  avatar   
রায়হান রশীদ
অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?..
অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?..
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিকের বাছাইপর্বে বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণ এবং যথারীতি ওয়াইল্ড কার্ডের উপর নির্ভরতা আবারও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক চিরচেনা প্র.....

সম্প্রতি প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিকের বাছাইপর্বে বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণ এবং যথারীতি ওয়াইল্ড কার্ডের উপর নির্ভরতা আবারও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক চিরচেনা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: আন্তর্জাতিক মঞ্চে কি সত্যিই প্রস্তুত বাংলাদেশ? বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দশকব্যাপী প্রচেষ্টার পরও, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই ক্রীড়া আসরে সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করতে না পারাটা কেবল একটি সাময়িক ব্যর্থতা নয়, বরং দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার গভীর সংকটকেই নির্দেশ করে। এই পুনরাবৃত্ত পরিস্থিতি শুধু হতাশাই বাড়ায় না, বরং আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

বাংলাদেশের ১৭০ মিলিয়ন মানুষের এই বিশাল দেশ অলিম্পিকের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একটিও পদক জিততে পারেনি, যা পৃথিবীর খুব কম জনবহুল দেশের ক্ষেত্রেই সত্য। এর মূল কারণগুলির মধ্যে রয়েছে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামোর অভাব, বিশেষ করে ঢাকা ও কয়েকটি বিভাগীয় শহর ছাড়া দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা কার্যত অনুপস্থিত। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া বিকাশের জন্য নানা উদ্যোগ নিলেও, তা প্রায়শই সমন্বয়হীনতা এবং সীমিত সম্পদের কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির কার্যক্রমও মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক এবং প্রতিভা অন্বেষণ ও পরিচর্যার একটি সুসংবদ্ধ, বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি। শৈশব থেকেই ক্রীড়াবিদদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে তোলার যে প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়ে প্রচলিত, বাংলাদেশে তার প্রকট অভাব লক্ষণীয়।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের ক্রীড়া উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা। জাতীয় বাজেটে ক্রীড়া খাতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ বা দেশের মোট বাজেটের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এই অপর্যাপ্ত তহবিল প্রশিক্ষণের মান, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং ক্রীড়া বিজ্ঞানের সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ করলেও, সুনির্দিষ্ট ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত, যা ক্রীড়া খাতকে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার নিম্নস্তরে থাকার ইঙ্গিত দেয়। ক্রীড়া খাতে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতাও বাংলাদেশে এখনো তেমনভাবে বিকশিত হয়নি, যা বিশ্বের অনেক দেশে ক্রীড়া অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় ক্রীড়া কৌশলের অভাব স্পষ্ট। বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, ক্রীড়া চিকিৎসা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এক্সপোজারের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এখনো অনুপস্থিত। বর্তমান নীতিগুলি প্রায়শই তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে প্রণীত হয়, যা টেকসই প্রতিভা বিকাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে ব্যর্থ। যোগ্য কোচ এবং ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের বিদেশমুখী প্রবণতা এবং স্থানীয় প্রশিক্ষকদের জন্য উন্নত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগও এই খাতের অগ্রগতির পথে অন্তরায়। বিভিন্ন ক্রীড়া শাখার জন্য বিশেষায়িত একাডেমি স্থাপন এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার পাশাপাশি অলিম্পিক ইভেন্টগুলিতে মনোনিবেশ করার জন্য একটি জাতীয় ক্রীড়া পাঠ্যক্রম তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। এই পদক্ষেপগুলি না নেওয়া হলে, আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়বে।

সালঅলিম্পিক আসরবাংলাদেশী অ্যাথলেট সংখ্যাপ্রাপ্ত পদকযুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট (কোটি টাকা)
২০০৮বেইজিং১১০
২০১২লন্ডন১৩০
২০১৬রিও১৫৫
২০২০ (২০২১)টোকিও১৭০
২০২৪ (প্রাক্কলিত)প্যারিস৬ (ওয়াইল্ড কার্ড নির্ভর)২০০

উৎস: বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিবেদন, বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা সংশোধন ও বাস্তবায়ন: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদ (National Sports Council) এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (BOA) মাধ্যমে তৃণমূল থেকে অভিজাত স্তর পর্যন্ত প্রতিভা অন্বেষণ, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের একটি সুসংবদ্ধ রোডম্যাপ তৈরি করবে।
  • ক্রীড়া খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত অর্থ মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে ক্রীড়া খাতে জাতীয় বাজেটের সুনির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ করতে হবে, যা জিডিপির ন্যূনতম ০.৫% হওয়া উচিত। একইসাথে, World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে পরামর্শ করে টেকসই ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিশেষায়িত ক্রীড়া একাডেমি স্থাপন ও ক্রীড়া বিজ্ঞান প্রয়োগ: বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এবং সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর সমন্বয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অন্তত একটি করে বিশেষায়িত ক্রীড়া একাডেমি স্থাপন করতে হবে, যেখানে ক্রীড়া বিজ্ঞান (Sports Science), ক্রীড়া পুষ্টি (Sports Nutrition) এবং ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান (Sports Psychology) ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে। এই একাডেমিগুলো বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (BKSP) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে পারে, এবং বিদেশী অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের সাথে স্থানীয় প্রশিক্ষকদের জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রায়হান রশীদ

রায়হান রশীদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator