জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ উপস্থাপিত ওই কথোপকথনে শেখ হাসিনা নিজেই লিথাল অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ট্রাইব্যুনালে বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এই অডিও শোনানো হলে আদালত কক্ষে উপস্থিত সবাইকে বিস্মিত করে তোলে।
শেখ ফজলে নূর তাপস, যিনি সে সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন, আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে হাসিনা বলেন, “আমার নির্দেশনা দেওয়া আছে। ওপেন নির্দেশনা দিয়েছি। এখন লিথাল ওয়েপন ব্যবহার করবে। যেখানে পাবে সেখানে গুলি করবে।” এই উক্তি আদালতে শোনানোর পর মামলার অগ্রগতি নতুন মাত্রা পায়।
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ফোনালাপ থেকে স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা শুধু লিথাল অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশই দেননি, বরং অগ্নিসংযোগেরও প্রত্যক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “হাসিনা বলেছেন, আমি বললাম একটা জিনিস পোড়াতে, যা যা পোড়াতে। কিন্তু তার নির্দেশ অনুযায়ী সেতু ভবনের পরিবর্তে অন্য স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। এতে বোঝা যায়, পরিকল্পিতভাবেই এসব হামলা সংঘটিত হয়েছে।”
এদিন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান, তদন্তে শেখ হাসিনার ৬৯টি অডিও ক্লিপ এবং তার তিনটি মোবাইল নম্বরের কল রেকর্ড জব্দ করা হয়েছে। আদালতে উপস্থাপিত এসব রেকর্ড আন্দোলনকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করছে।
জবানবন্দিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট সেবায় বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা ফোনালাপে বলেন, “বিটিআরসি-বিটিভি পুড়িয়ে দিয়েছে। এখন ইন্টারনেট বন্ধ। মেশিনপত্র সব পুড়ে গেছে।” এ কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই সহিংস কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
এ মামলায় শুধু তানভীর জোহাই নন, আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আদালতে তাদের জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার রেকর্ড ও লাইব্রেরি ইনচার্জ মো. কামরুল হোসাইন ও আনিসুর রহমানও সাক্ষ্য দিয়েছেন।
গত ১০ জুলাই আদালতে এক নাটকীয় মোড় আসে। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে আমাদের বিরুদ্ধে হত্যা-গণহত্যা সংঘটনের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য। আমি রাজসাক্ষী হয়ে সব তথ্য আদালতে দিতে চাই।” তার এই স্বীকারোক্তি মামলার গুরুত্ব ও প্রমাণের শক্তি আরও বাড়িয়ে তোলে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ একইদিন আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়, যার মধ্যে হত্যা, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগ অন্যতম। মামলার অভিযোগপত্রটি প্রায় আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার বিশাল একটি নথি, যাতে প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং শহীদ তালিকা সবই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, পরিকল্পিতভাবেই রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করা হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। আদালতের শুনানিতে এসব প্রমাণ উপস্থাপিত হওয়ায় মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে।
এখন আদালতের রায়ের দিকে সবার নজর। জনগণের প্রত্যাশা, দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যারা এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করেছে, তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে।