ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বাহ্রা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম মাইলাইলে শিক্ষার আলো ছড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য গড়া এ বিদ্যালয়টি ছিল আশার আলো। কিন্তু সেই আলোর প্রদীপ যেন নিভিয়ে দেওয়া হয় শুধুমাত্র নামের কারণে। বিদ্যালয়ের নাম ছিল 'শহীদ জিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়'—এটাই হয়ে দাঁড়ায় কাল।
১৯৯৯ সালে স্থানীয় সমাজসেবক মো. মিল্টন ও গ্রামের প্রবীণরা মিলে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। চালু হয় পাঠদান, শিশুরা আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। শুরু থেকেই বিদ্যালয়ে ছিল ভালো পাঠদানের পরিবেশ, নিয়মিত শিক্ষার্থী উপস্থিতি, এবং একটি সুসংগঠিত শিক্ষা কাঠামো। ৮ বছর সফলভাবে চলার পর, ২০০৭ সালে হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া হয় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম।
অভিযোগ উঠেছে, কেবলমাত্র নামের মধ্যে ‘শহীদ জিয়া’ থাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্কুল ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বন্ধ রয়েছে পাঠদান, সরবরাহ নেই কোনো শিক্ষা উপকরণের।
স্থানীয়রা জানান, স্কুলটির জন্য জমি ও একটি খেলার মাঠ নামজারি করা হয়েছিল। কিন্তু নামজারিতে ‘শহীদ জিয়া’ নাম থাকা নিয়েই সরকারের আপত্তি তৈরি হয় বলে দাবি। এরপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যালয়টির সকল কার্যক্রম।
মাইলাইল গ্রামের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, তাদের কাছের অন্য কোনো স্কুল নেই। সবচেয়ে কাছের বিদ্যালয়টি আগলার স্কুল, যা প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে। বর্ষাকালে খারাপ রাস্তায় কোমলমতি শিশুদের হেঁটে যাতায়াতে চরম কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে স্কুলে যাওয়া-আসার দুর্ভোগের কারণে অনেকেই পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়।
এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর জন্য। তারা বলছে, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা নাম নয়, মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত শিক্ষার প্রসার। একটি নামের কারণে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া কিছু নয় বলেই তাদের বিশ্বাস।
এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী রাশেদ বলেন, “শুধু কেউ চাইলে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সরকারিভাবে কিছু নীতিমালা আছে, তা মেনে চলতে হয়। তবে যদি নিয়ম মেনে কেউ সহযোগিতা চায়, আমরা সহায়তা করতে প্রস্তুত।”
এদিকে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলরুবা ইসলাম জানান, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে কেউ যদি যোগাযোগ করে, আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করব।”
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, ২১ শতকে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া দেশের শিক্ষানীতির সাথে সাংঘর্ষিক। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, শিক্ষার গুরুত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
এখন এলাকাবাসীর একটাই আশা—সরকার এই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করবে এবং মাইলাইল গ্রামের শিশুরা আবারও বই হাতে স্কুলে যাবে, সুশৃঙ্খল পরিবেশে পড়ালেখা করবে।
বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসারে যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, সেখানে একটি কার্যকর বিদ্যালয় কেবল নামের কারণে বন্ধ থাকা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। প্রশাসনের উচিত স্থানীয় জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা এবং শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরা।



















