ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসা কোনোভাবেই ইরানের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। বরং এই আলোচনা দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মঙ্গলবার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার নামে যেসব প্রচেষ্টা নেওয়া হয়, তা আসলে ইরানের স্বার্থবিরোধী এবং দীর্ঘমেয়াদে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে।
খামেনি তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, ইরান ইতোমধ্যেই উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। বর্তমানে বিশ্বে মাত্র দশটি দেশ এই প্রযুক্তি অর্জন করতে পেরেছে, আর ইরান তাদের অন্যতম। তবে তিনি একইসঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, ইরানের লক্ষ্য কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা নয়। বরং এই প্রযুক্তি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাই তাদের অঙ্গীকার।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি ও মন্তব্যকে “অবজ্ঞাসূচক” বলে আখ্যা দেন। বিশেষ করে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার দাবিকে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে আলোচনা করার নামে আসলে চাপ প্রয়োগ ও আদেশ চাপিয়ে দিতে চায়। তাই এর মাধ্যমে কোনো ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়।
খামেনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য কেবল একটি—ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া। আলোচনার আড়ালে যে কৌশল তারা চালায়, তা আসলে ইরানকে দুর্বল করে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কোনো সম্মানিত জাতি এমন হুমকি কিংবা চাপের মুখে আলোচনা টেবিলে বসে না।”
একইসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকার কারণে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে পুনঃপ্রবর্তিত নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক এজেন্সির সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করবে। নিরাপত্তা পরিষদের এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয়, পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের বিরুদ্ধে ইরান কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ইউরোপের তিনটি দেশ—ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি সম্প্রতি ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরানের বিরুদ্ধে ‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থা চালু করেছে। এই ব্যবস্থার অধীনে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো সমাধান না হলে নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় কার্যকর হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গত সপ্তাহে স্থায়ীভাবে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে গেছে, ইরান ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হাতে সময় খুবই সীমিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান আরও কঠোর ও অটল অবস্থান নেবে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, খামেনির এই বক্তব্য এবং ইরানের কঠোর পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে দেশটি আর পশ্চিমা চাপে নত হতে প্রস্তুত নয়। বরং তারা নিজেদের প্রযুক্তিগত সাফল্য ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেই অগ্রসর হবে।
এদিকে, ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের চাপের কৌশল কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বাড়তি নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আবার অনেকে মনে করছেন, ইরান অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা দিয়ে এই চাপ সামলে নিতে সক্ষম। সবমিলিয়ে, নতুন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে।