টানা ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চরম সংশয় আর অবিশ্বাসের মাঝেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা। শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিনিধিরা সরাসরি এক টেবিলে বসেন। দুই ঘণ্টা স্থায়ী এই হাইভোল্টেজ বৈঠকে মূলত সাতটি অমীমাংসিত বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
শনিবার সকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। এই দলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধিদল শুক্রবারই ইসলামাবাদে পৌঁছায়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের উপস্থিতিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা প্রথমবার সরাসরি আলোচনায় অংশ নেন।
বৈঠকে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হলো: ১. লেবানন পরিস্থিতি: লেবাননে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। ২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। ৩. হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ধমনী হরমোজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ৪. হরমোজ উন্মুক্তকরণ: যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমোজ প্রণালীকে শর্তহীনভাবে সব দেশের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি। ৫. পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচি: ইরানের পারমাণবিক গবেষণা এবং দূরপাল্লার মিসাইল কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করার মার্কিন শর্ত। ৬. আটকে থাকা সম্পদ: যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের জব্দকৃত প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের তহবিল ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা। ৭. আঞ্চলিক নিরাপত্তা: মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ইজরায়েলি অভিযানের পরিধি সীমিত করা।
বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধিরা সদ্য নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং মার্কিন হামলায় নিহত স্কুল শিক্ষার্থীদের স্মরণে কালো পোশাক পরিধান করে উপস্থিত হন। মার্কিন হামলার ভয়াবহতা ও মানবিক বিপর্যয় তুলে ধরতে তারা নিহত শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত জুতা ও ব্যাগ প্রতীকী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে আসেন।
পাকিস্তানি সূত্র অনুযায়ী, প্রথম দফার আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, ইজরায়েলের সামরিক অভিযান লেবাননের দক্ষিণে সীমাবদ্ধ রাখা এবং বৈরুতে আর কোনো হামলা না করার বিষয়ে একটি সমঝোতা হতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে থাকা বিশাল সম্পদ ছাড় করতে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
উপসংহার: ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের এই সরাসরি শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনা বিশ্বকে যুদ্ধের খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনও গভীর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তবে ইসলামাবাদের এই উদ্যোগকে বিশ্ব শান্তিতে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।