চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জুলাই সনদ স্বাক্ষর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি। বৈঠকে সরকারের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক রদবদল ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’ সোমবার রাতে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ভার্চুয়ালি, যেখানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন। এতে দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনপূর্ব প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং বহুল আলোচিত জুলাই সনদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে বিএনপির অভিযোগ ছিল, প্রশাসন ও ভোট-সংক্রান্ত কাজে একটি বিশেষ দলের লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল তৈরিতেও পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হচ্ছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। এতে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নেতৃত্ব মনে করছে — সরকারের উচিত দ্রুত প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনী কাজে সব দলের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করা। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশে ফিরলে বিএনপির সিনিয়র নেতারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব উদ্বেগের কথা জানাবেন। একইসঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব বিষয় তুলে ধরবে।
বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে। তবে স্বাক্ষরের আগে দলটি ঐকমত্য কমিশনের পাঠানো চূড়ান্ত খসড়া ভালোভাবে পর্যালোচনা করছে। বিএনপির প্রস্তাবিত বিষয়গুলো সনদে অন্তর্ভুক্ত থাকলে তবেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। সূত্র জানায়, ১৭ অক্টোবর সনদ স্বাক্ষরের দিন বিএনপির শতাধিক নেতার সমন্বয়ে একটি বড় প্রতিনিধি দল উপস্থিত থাকবে। দলের পক্ষ থেকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সনদে স্বাক্ষর করবেন।
বৈঠকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, “কিছু উপদেষ্টা সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থান ক্ষুণ্ন করছেন। বিশেষ করে প্রশাসনে জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা নিয়োগ ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।”
বিএনপি নেতারা আরও জানান, ৫ আগস্টের পর প্রশাসনে যেসব রদবদল করা হয়েছে, সেখানে একটি বিশেষ দলের লোকজনকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, গত ১৬ বছরের শাসনামলে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রশাসনিক কাঠামোর প্রভাব এখনও বিদ্যমান, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, বিএনপির মাঠপর্যায়ে প্রচার ও গণসংযোগে ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে মিডিয়া সেল ও কমিউনিকেশন সেলকে আরও সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচার ও বিকৃত ন্যারেটিভ মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতা মনে করেন, নির্বাচন আসন্ন এবং সরকারের লক্ষ্য আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভোট আয়োজন করা। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো এমনভাবে সাজানো যাতে তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ন্যায় নিরপেক্ষ হয়। তবেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টিকবে বলে তারা মনে করেন।
বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত হয় — বিএনপি মাঠপর্যায়ে গণসংযোগ বাড়াবে, প্রচারণায় নতুন মাত্রা আনবে, এবং জুলাই সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।