সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাত, মানি মার্কেট এবং সুদের হারে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ঢেউ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার মূল চালিকাশক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের (BB) মুদ্রানীতির সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান। বিশেষত, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত রেপো হার পর্যায়ক্রমে ৬.০০% থেকে ৮.০০%-এ উন্নীতকরণ এবং একই সময়ে রিভার্স রেপো হার ৪.২৫% থেকে ৬.০০%-এ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত, বাজারভিত্তিক সুদহার প্রবর্তনের মাধ্যমে ৯% ঋণের সীমা তুলে দেওয়া, এবং নীতি সুদহারকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ফলে আর্থিক খাতে অস্থিরতা ও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই ধারাবাহিক নীতি পরিবর্তন দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব ফেলছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তাদের জীবনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের চাপ। একদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য এবং কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি নির্ভর অর্থনীতিতে। ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন আমদানি খরচকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতিকে উচ্চ পর্যায়ে রেখেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। নীতি সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল বাজারে অর্থের প্রবাহ কমানো এবং তারল্য নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রাস্ফীতিকে লাগাম টেনে ধরা। এছাড়াও, সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ক্রমবর্ধমান ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য তারল্য সংকট তৈরি করছে এবং সুদের হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সম্মিলিত কারণগুলোই ব্যাংকিং খাতে বর্তমান উচ্চ সুদের হারের প্রবণতাকে তীব্র করেছে, যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে শ্লথগতি এবং নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সুদের হার বৃদ্ধির এই প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রথমত, উচ্চ সুদের হার বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাত, যাদের পুঁজির উৎস মূলত ব্যাংক ঋণ, তারা উচ্চ সুদের হারে ঋণ গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন এবং বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM) এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চ সুদের হার এবং ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের লাভজনকতা হারাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলোর জন্য উচ্চ সুদের হার একদিকে যেমন নিট সুদ আয় (Net Interest Margin - NIM) বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, অন্যদিকে এটি খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। উচ্চ সুদের হারে ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা অনেক ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি হতে বাধ্য করছে, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের খেলাপি ঋণের হার ঐতিহাসিকভাবেই বেশি। তৃতীয়ত, মানি মার্কেটে তারল্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ আরও প্রকট হয়েছে। আন্তঃব্যাংক কল মানি রেট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন তারল্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সরবরাহ ও শোষণের জন্য বিভিন্ন টুল ব্যবহার করলেও, বাজারে স্থিতিশীল তারল্য বজায় রাখা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
| সূচক | জুন ২০২৩ | ডিসেম্বর ২০২৩ | এপ্রিল ২০২৪ |
|---|---|---|---|
| নীতি সুদ হার (রেপো) | ৬.৫০% | ৭.৭৫% | ৮.০০% |
| ইন্টারব্যাংক কল মানি রেট (মাসিক গড়) | ৬.৮০% | ৭.৫০% | ৮.২৫% |
| গড় ঋণের হার (বাণিজ্যিক ব্যাংক, আনুমানিক) | ১০.১০% | ১১.২০% | ১৩.১০% |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, BIBM প্রতিবেদন, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীলতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ না থাকে। এ লক্ষ্যে, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
- আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সমন্বিতভাবে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর অধীনে খেলাপি ঋণ হ্রাসকরণ এবং কর্পোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য BIBM কর্তৃক প্রস্তাবিত সুপারিশমালাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।
- সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য আনতে হবে, যাতে ব্যাংক ব্যবস্থার উপর চাপ কমে আসে। এ জন্য, সরকার দীর্ঘমেয়াদী বন্ড ও ট্রেজারি বিলের একটি শক্তিশালী ও গভীর সেকেন্ডারি মার্কেট তৈরি করতে পারে, যা বাংলাদেশ ব্যাংককে ওপেন মার্কেট অপারেশনের মাধ্যমে তারল্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালনে সহায়তা করবে।