MD. ASHRAF ULLAH( - (Bhola))
প্রকাশ ০২/০৮/২০২১ ০৪:৫৯পি এম
রামপুরার একটি নাম করা ব্র্যান্ডের টিভি-রেফ্রিজারেটর শো-রুমে কথা হয় হাসান নামের এক ম্যানেজের সাথে। তিনি বলেন, সারা বছরের অর্ধেক রেফ্রিজারেটর বিক্রি হয় ঈদুল আজহার আগে; কিন্তু এ বছর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা গেছে। করোনার প্রভাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আয় কমায় ঈদের আগে রেফ্রিজারেটর বিক্রি হয়নি বললেই চলে।

যে পরিমাণ পণ্য শো-রুমে আনা হয়েছিল তার চার ভাগের এক ভাগও বিক্রি হয়নি। অন্য সময়গুলোতে বিক্রি শেষে আরো কয়েক দফায় রেফ্রিজারেটর আনতে হতো। এমনিতেই সারা বছরই বিকিকিনি কম ছিল। এতে দোকানভাড়া চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

ছয়জন কর্মচারীর স্থানে দুইজনে নামিয়ে আনা হয়। ঈদের আগে বিক্রি কমে যাওয়ায় ভাড়া দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরুপায় হয়ে ব্যবসা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

নাম করা আরেক ফার্নিচারের দোকানোর সিরাজুল ইসলাম নামে একজন বিক্রয়কর্মী জানিয়েছেন, আগে যে পরিমাণ আয় করতেন তাতে দিন ভালোই চলছিল; কিন্তু করোনার প্রভাবে তার চাকরি হারিয়েছেন। ব্যাংকের কিস্তি নিয়ে টিভি-রেফ্রিজারেটর কিনেছিলেন।

এখন ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ তো দূরের কথা সংসারই চালাতে পারছেন না। বিকল্প পেশা খুঁজছেন; কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সংসার চালানোর মতো কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। এ দিকে ব্যাংক থেকে কিস্তি আদায়ের জন্য বারবার চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।

গত বছরের মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আবার যেগুলো চালু আছে সেগুলোও চলছে ধুঁকে ধুঁকে। বন্ধ কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেকার হয়ে গেছেন। যেগুলো চালু আছে সেগুলোর কোনো কোনোটি অর্ধেক লোকবল নিয়ে চলানো হচ্ছে।

বিশেষ করে দোকান, বিভিন্ন শো-রুমে ছয়জনের জায়গায় দুইজন বা একজন নিয়ে খোলা রাখছেন মালিকরা। এতে আয় কমে গেছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের। আয় কমে যাওয়ায় এক দিকে তাদের সংসার চালানো কষ্ট হচ্ছে, অপর দিকে যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে সংসারের পণ্য কিনেছিলেন তারা আর ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে ব্যাংকগুলোও ঋণ আদায় করতে না পেরে বেকায়দায় পড়ে গেছে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছর ধরে কাঠামোগত বিনিয়োগের ধীর গতিতে ব্যাংকগুলো অপ্রচলিত বিনিয়োগের দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েছিল। বিভিন্ন ভোক্তাঋণের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল ব্যাংক। আবার এসব ঋণ থেকে আদায়ের হারও অন্য সব ঋণ থেকে বেশি ছিল। কারণ এসব ঋণের বড় একটি অংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবীদেরকেই এসব ঋণ বেশি দেয়া হতো। মাস শেষে বেতন থেকে তা পরিশোধ করতেন গ্রাহক; কিন্তু সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গত বছরে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ভোক্তাঋণে বেকায়দায় পড়ে গেছে ব্যাংকগুলো।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে মানুষের আয় কমে গেছে। অনেকেই ব্যয় নির্বাহ করতে না পেরে ঠিকানা বদল করেছেন। তাই জামানতবিহীন এসব ঋণ আদায় করা ব্যাংকের জন্য অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে ব্যাংকের সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো থেকে শিল্পের মেয়াদি ও চলতি ঋণের পাশাপাশি ভোক্তাঋণ বিতরণ করা হয়। ব্যাংকের আয়ের বড় ধরনের অবদান রাখে ব্যক্তিপর্যায়ের ভোক্তাঋণ, ক্রেডিট কার্ডের ঋণসহ জামানতবিহীন ঋণ। জামানতবিহীন ঋণ হওয়ায় এসব ঋণে ঝুঁকিও বেশি। আর ঝুঁকি বেশি হওয়ায় এসব ঋণগ্রহীতাকে বাড়তি সুদ বা মুনাফা পরিশোধ করতে হয়। এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ক্রেডিট কার্ডের ঋণ সিঙ্গেল ডিজিট অর্থাৎ ৯ শতাংশের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ ভোক্তাঋণ বাদে সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ভোক্তাঋণের সর্বোচ্চ সুদহার বেঁধে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করা যাবে না ভোক্তাঋণের ক্ষেত্রে।

ব্যাংকারা জানিয়েছেন, এসব ঋণের তেমন কোনো জামানত নেয়া হয় না। যেমন, কেউ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে তার বেতনের বিপরীতে এ ঋণ দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শুধু বেতনের তথ্যাদি জমা দিতে হতো।

এর ওপর ভিত্তি করে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নেয়া হতো সংশ্লিøষ্ট গ্রাহকের; কিন্তু গত বছরের মার্চ থেকে করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সব হিসাব এলোমেলো হয়ে পড়ে। দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন।

আনেক প্রতিষ্ঠানের বেতনভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যারা নিয়মিত বেতনভাতা পেয়ে সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে বাড়তি অর্থ দিয়ে ব্যাংকের ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতেন তারা পড়ে যান বিপাকে। বেতনভাতা না পেয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন না অনেকেই।

আবার কেউ কেউ বাড়িভাড়া পরিশোধ না করে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছেন। এর ফলে ইতোমধ্যে যেসব জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ওই সব ঋণ ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে। বেশির ভাগ জামানতবিহীন ঋণই এখন আদায় হচ্ছে না। এতে এক দিকে ব্যাংকের আয় যেমন কমে গেছে, তেমনি এসব ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ভোক্তাঋণ এখন ব্যাংকের গলার কাঁটা হয়ে গেছে। আগে যেসব ঋণগ্রহীতারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন আয় কমে যাওয়ায় এখন তারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। আবার অনেকেই ঠিকানা বদল করেছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাকে পাাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এমনি পরিস্থিতিতে সবচেয়ে লাভবান খাত ভোক্তাঋণ দিতে অনেকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন ব্যাংকাররা। গতকাল বেসরকারি একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়ে ঝুঁকির মাত্রা বাড়াতে চাচ্ছেন না। একসময় ভোক্তাঋণের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল ব্যাংকের। করোনার কারণে সব হিসাব পাল্টে গেছে। এখন জামানতবিহীন ঋণ দিয়ে কেউ ঝুঁকির মাত্রা বাড়াতে চাচ্ছেন না। অনেকটা নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকে পড়ছে ব্যাংকগুলো।

এ মুহূর্তে নিরাপদ বিনিয়োগ কোন খাত এমন এক প্রশ্নের জবাবে ওই ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, প্রণোদান প্যাকেজ অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে না। কারণ এই মুহূর্তে ঋণ নিয়ে কোনা প্রজেক্টই লাভবান হবে না। এ কারণে যারা ঋণ নেবেন তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না। এ কারণে ব্যাংকগুলো সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে।

এতে বছর শেষে বেশির ভাগ ব্যাংকেরই আয় কমে যাবে। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে আর মানুষের আয় বাড়লে আবারো বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে উৎসাহী হবে ব্যাংকগুলো।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ