About Us
সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Verified আই নিউজ বিডি ডেস্ক
প্রকাশ ২৮/০৭/২০২১ ১২:০৯এ এম

লোকসানের মুখে বিনোদন খাত, ভেঙে ফেলা হচ্ছে সিনেমা হল

লোকসানের মুখে বিনোদন খাত, ভেঙে ফেলা হচ্ছে সিনেমা হল Ad Banner
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদাগুলোর ষষ্ঠ নাম্বারে রয়েছে বিনোদন। এই বিনোদন মানুষ সৃষ্টির পর থেকে শুরু হয়েছে। মানুষ যখন বুঝতে শিখেছে যে, বেঁচে থাকতে বিনোদন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ তখন থেকেই মানুষ নিজেদের সুখে রাখার কৌশল হিসেবে বিনোদনের নানা মাধ্যমের তালাশ করে আসছে।

হাসি আনন্দে থাকার জন্য খেলাধুলা,পুঁথিপাঠ, জারি-সারি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়াসহ নানান রকমের গান, হাসি আনন্দের গান, নাটক, সিনেমা, যাত্রাপালা, সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ নানা উপায়ে মানুষ বিনোদনে নিজেদের মাতিয়ে রাখার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে আসছে।

প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার সাথে সাথে মানুষের হাতে মোবাইল চলে আসায় বিনোদনের অন্যসব উৎসই যেন নিস্প্রভ হতে চলেছে। বাইস্কোপ ও যাত্রাশিল্প যেমন ধীরে ধীরে আমাদের বিনোদনের জায়গা থেকে হারিয়ে গেছে তেমনি জারি সারি ভাটিয়ালি মুর্শিদি ভাওয়াইয়াসহ নানান জাতের গান, নাটক, যাত্রাপালা এমনকি বিনোদনের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম সিনেমা হলও হারিয়ে যেতে বসেছে।

লক্ষ্মীপুর জেলার একসময়কার বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহ ছিল- বুলবুল টকিজ, তারপর এক এক করে ঝুমুর সিনেমা, হ্যাপী সিনেমা, রায়পুরের তাজমহল সিনেমা, বাঁশরী সিনেমা, চন্দ্রগন্জের সমতা সিনেমা, রামগঞ্জের জাবেদ সিনেমা, কমলনগরের মেঘনা সিনেমা, সুমন সিনেমা, মতিরহাটের মিতালী সিনেমা, করুনানগরের রীতা সিনেমা, আলেকজান্ডারের বাণী সিনেমা ও রামগতির বর্ণালী সিনেমা হল।
সময়ের উন্নতির সাথে সাথে এক এক করে সকল সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়। নিভু নিভু আলো জ্বালিয়ে রেখেছে হ্যাপি সিনেমা, কমলনগরের মেঘনা, আলেকজান্ডারের বাণী সিনেমা হল তিনটি। গত রমজানের ঈদের সময় এই তিনটি প্রেক্ষাগৃহে ছবি চলেছিল। অত্যান্ত দুঃখের বিষয় হল সে হ্যাপি সিনেমা, মেঘনা সিনেমা এবং বাণী তিনটি সিনেমা হলই এক সাথে বন্ধ হয়ে যায়। গত দু'দিন ধরে জেলা সদরের হ্যাপি সিনেমা হলটি ভাঙন কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে কমার্শিয়াল ভবন তৈরি করা হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

চলচ্চিত্র জগতের সেই গৌরব গাঁথা সোনালী দিনগুলো আজ আর নেই। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে মানুষের রুচির পরিবর্তন হওয়ায় চিত্ত বিনোদনে একদিকে এসেছে পরশ্রীকাতরতা। অন্যদিকে ভারতীয় সিনেমার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মফস্বলের সিনেমা হলগুলো। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের চিত্ত বিনোদনের প্রধান মাধ্যম সিনেমা তৈরি না হওয়ায় সাধারণ দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এখন আর শখের বশে সিনেমা হল মুখী হতে তেমন একটা রাজী নয় তারা।

বর্তমান সময়ে যে সব সিনেমা তৈরি হচ্ছে তাতে শিক্ষনীয় এবং উপভোগ্য ও চিত্ত বিনোদনের অনেক কিছুই অভাব থাকছে। মানুষ এখন ঘরে বসে ভারতীয় বিনোদন চ্যানেলগুলোতে চব্বিশ ঘন্টা একের পর এক ভারতীয় হিন্দী, বাংলা, তামিল, তেলেগু এবং হলিউডের নামী-দামী সিনেমা দেখে আনন্দ উপভোগ করছে। তাই তারা টাকা দিয়ে সিনেমা হলে বসে সস্তা ডায়লগ শুনতে চায় না। জেলার একাধিক সিনেমা হল মালিক ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ে এ ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। অনেকে হলের ভবন ভেঙ্গে সেখানে গড়ে তুলেছেন শপিং মল, এপার্টমেন্ট, সুপার মার্কেটসহ ভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কেউ কেউ ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়োজনে কোন রকমে কোন কোন হল মালিক তাদের সিনেমা হল চালু রেখেছেন।

মানুষ এখন আধুনিক ডিজিটাল যুগে বসবাস করছে। উঠে গেছে সাদাকালো পর্দার সিনেমা নির্মাণ। তার পরিবর্তে নির্মিত হচ্ছে রঙিণ ছায়াছবি। কিন্তু মানুষের চাহিদা অনুযায়ী রুচিশীল ও মান সম্পন্ন অধিকাংশ সিনেমা তৈরি হচ্ছে না। তবে একেবারে যে হচ্ছে না তা ঠিক নয়। কিছু কিছু ভালো ছায়াছবিও নির্মিত হচ্ছে। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। এতে করে দর্শকদের হলে ধরে রাখা যায় না।

চায়ের দোকানেই বিনোদনের ভরসা
রায়পুরে ‘তাজমহল’ ও ‘বাঁশরী’ নামে দু’টি সিনেমা হল থাকলেও প্রায় ৭/৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এখানে নেই কোনো শিশু পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র। দৃস্টিনন্দন মরা ডাকাতিয়া নদী প্রাকৃতিক লেকের সৌন্দর্য ছড়ালেও তা দখলদাররা দিন দিন ভরাট করে জবরদখল করায় সেটিও এখন আগের স্থানে নেই। তাই বিনোদন প্রেমী মানুষের এখন ভরসা স্যাটেলাইট টিভি ও ইন্টারনেট প্রযুক্তি। আবার যাদের এ দু’টির সংশ্রব নেই তারা ছুটে চলেছেন এলাকার চা দোকানগুলোতে। এক একটি চা দোকান এখন এক একটি ‘মিনি সিনেমা হল’।

রায়পুরে দুটি সিনেমা হল থাকলেও তা বন্ধ রয়েছে প্রায় ১৫ বছর। নেই কোন শিশু পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র। তাই চা দোকানগুলিই এখন মিনি সিনেমা হলে পরিনত হয়েছে। প্রতি বছর বাজেট হলেও কোন উদ্যেগ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এতে হতাশ ও উদ্ধিগ্ন রয়েছে বিনোদন পিপাসু মানুষ।

জেলা শহরে রয়েছে একটি শিশু পার্ক ও দশটি সিনেমা হল। হ্যাপি ছাড়া অন্য ১২টি সিনেমা হলই বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শিশু পার্কে ঘুরতে আসা পাঁচ উপজেলার মানুষ হতে হয় নানা বিড়ম্ভনা ও হয়রানির শিকার।

সরজমিনে ও কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাতে জানা যায়, সদর উপজেলায় অবস্থিত হ্যাপি ছাড়া, ঝুমুর, চন্দ্রগঞ্জের সমতা, রামগঞ্জ উপজেলায় জাবেদ, রায়পুর উপজেলায় তাজমহল ও বাঁশরী, রামগতি উপজেলায় বর্ণালী, আলেকজান্ডারে বাণী, কমলনগর উপজেলায় রীতা, হাজিরহাট মেঘনা,সুমন সিনেমা,মতিরহাটের মিতালী নামে মোট ১৩টি সিনেমা হল প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।

এসব সিনেমা হলে অশ্লিল ছবি প্রদর্শন, ফিল্ম মূল্য বৃদ্ধি না পাওয়া, দর্শক কমে যাওয়া বন্ধ রয়েছে বলে দর্শকদের মতামত।

পৌর শিশু পার্কে ঘুরতে আসা রায়পুরের দুই গৃহবধু জানান, হলগুলোতে পরিবেশ না থাকায় ছবি দেখা হয় না। বৃহস্পতি ও শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাচ্চাদের চাপে পড়ে ১৫ কিলোমিটার পাড়ি সদরের এই শিশু পার্কে এসেছি।

তাও আবার উপযুক্ত মেয়েদের নিয়ে ঘুরতে আসলে নানা প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। তাই মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে ঘরে বসে স্যাটেলাইটে অনুষ্ঠান দেখি। তাই প্রতিটি উপজেলায় বিনোদন কেন্দ্র নির্মান ও তা পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাই।

এ প্রসঙ্গে হ্যাপী সিনেমা হলের মালিক মোজ্জামেল হায়দার মাছুম ভূইয়া বলেন, ১৯৮৬ সালে ৫০ শতাংশ জমির উপর হলটি নির্মান করেন। ভালো ছবি প্রদর্শন হলে প্রায় ১২০০ দর্শকের আগমন ঘটে। ফিল্ম মূল্য বৃদ্ধি না পাওয়ায়, খরচ বেশি হওয়ায় সিনেমা হলের ধ্বস নেমেছে।

তাছাড়া ডিজিটাল নির্মানে ব্যায় কমছে এবং সিনে কমপ্লেক্স পরিকল্পনা আছেন বলে দাবি করেন। প্রতিনিয়ত ভালো ভিডিও পাইরেসি হলেও দর্শকও ভালো হয়। সরকারে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরো বেশি বিনোদন সুবিধা দিতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

ডাকাতিয়া নদী সংলগ্ন টিসি সড়কের পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত ৩ একর জায়গায় শিশু পার্ক নির্মানের জন্য পঞ্চাশ লাখ টাকার আবেদন জমা করা হলেও অদ্যবধি কোন আলোর মুখ দেখা যায়নি। আবেদনটি পাশ হলে রায়পুরবাসির জন্য একটি বিনোদন কেন্দ্র হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সিনেমাহলগুলোতে ভালো পরিবেশ ও ছবি না থাকায় মানুষ এখন আর হল মুখি নেই। এখন বাসায় ও চায়ের দোকান গুলোতে বসে বিনোদন উপভোগ করে। ঠিক একই মন্তব্য করেছেন রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতি উপজেলার সাহিত্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।।

এ প্রসঙ্গে বন্ধ থাকা রায়পুর তাজমহল সিনেমা হলের মালিক হাজী ইসমাইল খোকন বলেন, ভালো ছবি নির্মান হওয়ায় এবং অর্থ সংকটের কারনে হল বন্ধ করে দিয়েছি। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ও ভালো ছবি নির্মান হলে আবার হল চালু করতে পারি। একই কথা বললেন বন্ধ থাকা অন্য ৮টি সিনেমা হলের মালিকগন।

★ লেখাটিতে সহযোগিতা করেছেন ইছমাইল হোসাইন বিপ্লব, এআই তারেক, তাবারক হোসেন আজাদ ও বেলায়েত হোসেন বাচ্চু।

অ আ আবীর আকাশ
লেখক কবি প্রাবন্ধিক কলামিস্ট ও সাংবাদিক
সম্পাদক আবীর আকাশ জার্নাল
ইমেইলঃ abirnewsroom@gmail.com

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ