About Us
Md.Sohel Rana - (Kushtia)
প্রকাশ ১৯/০৭/২০২১ ১০:১০এ এম

চাঁদা না দিলে গরুর গাড়ি নড়ে না

চাঁদা না দিলে গরুর গাড়ি নড়ে না Ad Banner
শনিবার রাত ৩টা। বগুড়া শহরতলির শাকপালা, বনানী ও লিচুতলা মোড়। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাত-আটজন যুবক। প্রত্যেকের হাতে লাঠি। সবার নজর চলাচলরত গাড়ির হেডলাইটের দিকে। দূর থেকেই তারা বুঝতে পারে কোনটি গরুবোঝাই ট্রাক এবং কোনটি সাধারণ মালবাহী ট্রাক। গরুর ট্রাক কাছে এলেই তারা ছুটে যাচ্ছে কাছে। সিগন্যাল দিয়ে সড়কের একপাশে দাঁড় করিয়ে চাঁদা নিচ্ছে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা। হুমকি-ধমকি দিচ্ছে টাকা না দিলে ট্রাক আটকে রাখার।

ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বগুড়ার বনানী মোড় থেকে ৫০০ গজ সামনে সোনার বাংলা হোটেলে। সেখানে খেতে বসে কিভাবে চাঁদাবাজির শিকার হলেন তার বর্ণনা করছিলেন ট্রাকচালক আমির হোসেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় বাড়ি জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে। তাঁর ট্রাকে এর আগে কখনো এই সড়কে গরু বহন করেননি। এ কারণে এভাবে চাঁদা দেওয়ার ঘটনাটি তাঁর জন্য নতুন। তিনি বললেন, যারা চাঁদা তুলছে তাদের মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া কিংবা লুকোচুরি নেই। প্রকাশ্যেই তারা চাঁদার টাকা নিচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোরবানি ঈদের আগে সীমাহীন চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কজুড়ে। বাস, ট্রাকসহ যেকোনো যানবাহন আটকে ওঠানো হচ্ছে টাকা। তবে মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ও ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদা তোলার কথা অস্বীকার করেছেন ওই সংগঠনের নেতারা। তাঁরা বলছেন, যারা চাঁদা তুলছে এরা শ্রমিক নয়, শুধুই চাঁদাবাজ। অন্যদিকে চাঁদাবাজরা বলছে, তারা শ্রমিক সংগঠনগুলোর নিয়োগ করা লোক।

দেখা গেছে চাঁদাবাজরা মহাসড়কে রীতিমতো ব্যারিকেড দিয়ে পণ্য ও গরুবাহী ট্রাক থামিয়ে আদায় করছে চাঁদা। সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠানো হচ্ছে এই চাঁদা। শুধু বগুড়া জেলার ১৫টি পয়েন্টে ওঠানো হচ্ছে চাঁদার টাকা। তবে দিনের বেলা চাঁদাবাজরা সতর্ক থাকলেও রাতে তারা বেপরোয়া।

আন্ত জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের বগুড়া জেলার সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে সাংগঠনিকভাবে সব ধরনের চাঁদা আদায় বন্ধ আছে। সড়কে কারা চাঁদা তুলছে তা আমি বলতে পারব না। তবে মোটর শ্রমিকের কিছু স্বেচ্ছাসেবী মহাসড়কে যানজট নিরসনে কাজ করছে বলে শুনেছি।’ তিনি দাবি করেন, ‘ট্রাক শ্রমিক পরিচয়ে কেউ চাঁদা আদায় করে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বগুড়া হাইওয়ে পুলিশের তথ্য মতে বগুড়ার দুটি বাইপাস মহাসড়ক ও মূল শহরের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০০ ট্রাক যাতায়াত করে। এগুলোর বেশির ভাগই বাইরের জেলার। মূলত চাঁদাবাজদের টার্গেটও বাইরের জেলার ট্রাক। কারণ এসব ট্রাকের চালকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছামতো চাঁদা আদায় করা যায়।

হাইওয়ে পুলিশের শেরপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ বানিউল আনাম জানান, মহাসড়কে পণ্য কিংবা গরুবাহী ট্রাক থামানো আইনগত দণ্ডনীয়। মহাসড়কে কারা চাঁদা তুলছে সেটি তাঁরা তদন্ত করবেন। প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করে মামলা দেওয়া হবে।

টাঙ্গাইল এলাকার বাসিন্দা ট্রাকচালক আফতাব হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মাটিডালি দ্বিতীয় বাইপাস সড়কের মানিকচক এলাকায় ও বনানী লিচুতলা এলাকায় তাঁকে দুই দফায় ৪০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। একই রকম অভিযোগ করে সিরাজগঞ্জের ট্রাকচালক সবুজ মিয়া বললেন, তিনি দাবিকৃত ৫০০ টাকা না দেওয়ায় গাড়িসহ এক ঘণ্টা তাঁকে লিচুতলা মোড়ে হোটেলগুলোর সামনে আটকে রাখা হয়েছিল। এরপর ৪০০ টাকা দিয়ে ছাড়া পান তিনি।

ঈদ সামনে রেখে প্রতিদিন উত্তরাঞ্চল সড়ক দিয়ে গরুবাহী ট্রাক রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। এ কারণে এসব ট্রাকই এখন টার্গেট। চাঁদার টাকা আদায়ের জন্য শুধু বগুড়া জেলার ১৫টি পয়েন্টে শতাধিক লোক (চাঁদার টাকা উত্তোলনকারী) রয়েছে। এরা কমিশন চুক্তিতে চাঁদার টাকা আদায় করে দেয়। ভুক্তভোগী ট্রাকচালকদের তথ্য মতে চাঁদা ওঠানো হচ্ছে বগুড়ার মোকামতলা, মহাস্থানগড়, মাটিডালির মোড়, চারমাথা বাসস্ট্যান্ড, তিনমাথা রেলগেট, শাকপালা, বনানী, লিচুতলা, শাহজাহানপুর, শেরপুর, মীর্জাপুর, ধুনট মোড়, মানিকচক, সাবগ্রাম ও চান্দাইকোনায়। এসব স্থানে নিজ জেলার গাড়ি থেকে আদায় করা হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। আর বাইরের জেলার গাড়ি থেকে ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।

বাংলাদেশ জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান আকন্দ জানান, তাঁরা মহাসড়কে চাঁদা আদায়ের পুরোপুরি বিপক্ষে। এর পরও কারা কিভাবে চাঁদা তুলছে সেটি বুঝতে পারছেন না বলেও জানান তিনি। তবে চাঁদা তোলার তথ্য তাঁর কাছেও রয়েছে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশের যেকোনো পদক্ষেপে ট্রাক মালিক সমিতির সমর্থন আছে।

বগুড়ার শাকপালা এলাকায় ট্রাক ড্রাইভার খলিল মুন্সি জানান, তিনি যশোর থেকে বগুড়ায় ভাড়ায় মাল এনেছেন। বগুড়ায় মেডিক্যালের পাশে বাবা কামালিয়া হোটেলের পাশে তাঁর কাছ থেকে শ্রমিক নামধারী কিছু সন্ত্রাসী জোরপূর্বক ৫০০ টাকা চাঁদা নিয়েছে। লাঠি বের করে ভয় দেখালে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছেন তিনি।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা জানান, কোথাও চাঁদা উঠছে না। যারা চাঁদা তুলবে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি জানান, গরুর ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করার কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই। তাঁদের টহল পুলিশ প্রতিনিয়ত মহাসড়কে কাজ করছে। গোয়েন্দা পুলিশও মাঠে রয়েছে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ