About Us
Md.Nezam Uddin - (Chattogram)
প্রকাশ ২২/০৬/২০২১ ০৪:৫৮পি এম

পলাশী বিপযর্য়  ইংরেজদের লুণ্ঠণ বাংলার চালচিত্র

পলাশী বিপযর্য়  ইংরেজদের লুণ্ঠণ বাংলার চালচিত্র Ad Banner

বাংলার কৃষক একসময়ে সূর্য  ওঠা ভোরের লাঙ্গল কাঁধে ছুটত তার ফসলের জমিতে। ফিরত অস্তগামী সূর্যকে সামনে রেখে। তার ঘরে অন্ন-বস্ত্রের প্রাচুর্য ছিল না,তবে অভাব ও ছিল না। অভাব ছিল না আনন্দ -উৎসবের। বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকত। জারি,সারি,কীর্তন, যাত্রাপালা গানে জমে উঠত গ্রামবাংলার সন্ধ্যার আসর।  কিন্তু, পনের শতকের শেষ দিকে ইউরোপীয় বণিক সম্প্রাদায়ের আগ্রাসী আগমন ধীরে ধীরে কেড়ে নিতে থাকে উপমহাদেশের শাসন, বাংলা কৃষকের মুখের হাসি,তাদের আনন্দ -উৎসব।
১৭৪০ থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত আলীবর্দী খান বাংলা,বিহার, উড়িষ্যার নবাব ছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি সফলভাবে রাজ্য শাসন করেছেন।
সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। তিনি ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের দৌহিত্র। ১৭৫৬ সালে  আলীবর্দী খান মৃত্যুের পূর্বে  তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। ফলে সিরাজ  মাত্র ২৩ বছর বয়সে মুর্শিদাবাদের সিংহাসন আরোহণ করেন। সিংহাসন লাভের অল্পকাল পরেই ইংরেজদের সাথে  নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরোধ বাঁধে।
সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে বসলে রেওয়াজ অনুযায়ী  ইংরেজরা তাঁকে কোন উপঢৌকন পাঠায়নি।  সিরাজের শত্রু ঘষেটি বেগম ও শওকত জং-কে ইংরেজরা সহায়তা করেছিল। নবাবের শত্রু কৃষ্ণদাসকে ইংরেজরা আশ্রয় দেয়
ইংরেজদের বাণিজ্যিক সুবিধা যথেচ্ছা অপব্যবহার।  সিরাজের আদেশ অমান্য করে কলকাতা ও চন্দনপুরের দুর্গ নিমার্ণ।

১৭৫৭ সালের ১মে কলকাতায় ইংরেজ কমিটি তাদের বর্ণহিন্দু দালালদের সহায়তায় মীর জাফরের সাথে এগার দফা চুক্তিপত্র সম্পাদন করে। সেই ষড়যন্ত্রমূলক এগার দফা চুক্তির ভিত্তিতেই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম বাগানে যুদ্ধ প্রহসনের মধ্য দিয়ে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পতন হয়। সেই সাথে লুপ্ত হয় বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতা এবং কালক্রমে ভারতর্ষ- আসমুদ্র হিমাচল।
পলাশীর এই যুদ্ধকে কোন কোন হিন্দু লেখক ‘দেবাসুর সংগ্রাম’ নামে অভিহিত করেছেন। এখানে ‘দেবতা’ হলেন ক্লাইভ আর ‘অসুর’ রূপে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে জীবন দানকারী তরুন নবাব সিরাজকেই চিহ্নিত করা হয়। পলাশীর শোকাবহ বিপর্যয়কে কলকাতায় ‘পলাশীর বিজয়োৎসব’- রূপে পালন করা হয় এবং দুর্গাদেবীর অকাল-বোধনের মাধ্যমে বসন্তকালীন দুর্গোৎবকে শরাদীয় দুর্গোৎসবরূপে পালন করে ক্লাইভকে দেবতুল্য সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করা হয়।

১৭৫৭ সালে পলাশীতে সিরাজউদ্দৌলার ভাগ্য-বিপর্যয় এবং ১৭৬৪ সালে বখশারে মীর কাসিমের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে পাঁচশ’ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। স্বাধীনতা লোপ পাওয়ার সাথে সাথে ক্ষমতা চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামক এক বাণিজ্যিক সংস্থার হাতে। ফলে অতি অল্প সময়ের লুণ্ঠন-শোষণে বিপর্যস্ত হয় অর্থনীতিসহ জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ অরাজকতা ও বিপর্যয়। বিশেষ করে ভারতের পুরাতন শাসক মুসলমানরা যাতে আর কখনো মাথা তুলতে না পারে সেজন্য সব ব্যবস্থা পাকাপাকি করা হয়।
 
ইংরেজ ও তার এদেশীয় দালালদের লুণ্ঠন
ইংরেজরা দিল্লীর সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলার দেওয়ানী বা রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক ফরমান আদায় করে ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট তারিখে। কিন্তু ১৭৫৭ সাল থেকেই তারা শাসন কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করেছিল। মীর জাফরকে ‘পুতুল নবাব’ সাজিয়ে লর্ড ক্লাইভ শুরু থেকেই ‘প্রকৃত নবাব’ সেজে বসেছিলেন। আর এই পুতুল নবাবীর সূচনাকাল থেকেই ইংরেজনা এদেশে ইতিহাসের নজীরবিহীন শোষণ ও লুণ্ঠনে লিপ্ত হয়েছিল।
খোদ লর্ড ক্লাইভ পলাশীর ‘যুদ্ধ জয়ের’ বখশিশ হিসেবে মীর জাফরের কাছ থেকে ২ লাখ ৩৪ হাজার পাউন্ড আত্মসাৎ করে রাতারাতি ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ ধনীতে পরিণত হন। মীর জাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছয়জন কর্মচারীকে ১,৫০,০০০ পাউন্ড উৎকোচ প্রদান করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিলের সদস্যরা প্রত্যেকে ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ পাউন্ড ঘুষ আদায় করেন।
কোম্পানির ও কলকাতার অধিবাসীদের ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে এবং সৈন্য ও নৌবহরের ব্যয় বাবদ কোম্পানি আদায় করে মোট ২৫,৩১,০০০ পাউন্ড। তাছাড়া মীর কাফর ইংরেজ কর্মকর্তাদের খুশি করতে ৬,৬০,৩৭৫ পাউন্ড উপঢৌকন দেন। বিভিন্ন ইংরেজ

কর্মচারী মীর জাফরের কাছ থেকে চব্বিশ পরগণা জেলার জমি ছাড়াও ৩০ লাখ পাউন্ড ‘ইনাম’ গ্রহণ করেছিল। ১৭৫৯ সালে ক্লাইভকে ৩৪,৫৬৭ পাউন্ড বার্ষিক আয়ের দক্ষিণ কলকাতার জায়গীর প্রদান করা হয়।
ইংরেজদের বিভিন্ন রূপ টাকার দাবি মেটাতে মীর জাফর রাজকোষ শূণ্য করে ফেলেছিলেন। মীর কাসিম এই ঋণ পরিশোধ এবং মসনদের বিনিময়ে কোম্পানির কর্মচারীদেরকে ২০০,০০০ পাউন্ড দিয়েছিলেন।
মীর জাফরের পুত্র নাজমুদ্দৌলা ১৭৬৫ সালে পিতার মৃত্যুর পর মসনদ লাভের জন্য কোম্পানির কর্মচারীদেরকে যে ঘুষ দেন তার পরিমাণ ছিল ৮,৭৫,০০০ টাকা। রেজা খান ২,৭৫,০০০ টাকার উৎকোচের বিনিময়ে এই অপ্রাপ্ত বয়স্ক নবাবের নবাব-নাযিম নিযুক্ত হয়েছিলেন।
উৎকোচ নামক দুর্নীতি এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে আমদানী করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত মাত্র দশ বছরে ষাট লাখ পাউন্ড আত্মসাৎ করেছিল। এ কথা ব্রিটিশ সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। (Fourth Parliamentry Report 1773, P-534; সুপ্রকাশ রায় : ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ৯)।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা প্রথম সুযোগেই বাংলাদেশ থেকে প্রচুর অর্থ বিলাতে নিয়ে যায়। ক্লাইভের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলে তিনি নিজ আচরণ সমর্থন করে বলেন:
“পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর আমার যে অবস্থা হয়েছিল, তা আপনারা ভেবে দেখুন। একজন বড় রাজার ভাগ্য আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে। একটি সমৃদ্ধ নগর আমার দয়ার প্রতিক্ষায় আছে। আমার মুখের সামান্য হাসিতে কৃতার্থ হওয়ার জন্য ধনী মহাজনরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। আমার দুই পাশে স্বর্ণ মণিমুক্তায় পূর্ণ সিন্দুকের সারি এবং এগুলি কেবল আমারই জন্য খোলা হয়েছে। (পার্লামেন্ট কমিটির) সভাপতি মহোদয়, এ মূহূর্তে আমি নিজেই ভেবে অবাক হয়ে যাই যে, তখন আমি কিভাবে নিজেকে সংযত রাখতে পেরেছিলাম”।
বাংলার সম্পদ লুণ্ঠনে ইংরেজরা একা ছিল না। তাদের পাশে ছিল তাদের দীর্ঘ দিনের সহচর এদেশী দালাল, গোমস্তা ও বেনিয়ানগোষ্ঠী। তাদের শোষণ, লুণ্ঠন ও ধ্বংসলীলা সম্পর্কে কট্টর সাম্রাজ্যবাদী লর্ড ব্যারিংটন মেকলে স্বয়ং মন্তব্য করেছেনঃ
“কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের প্রভু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য নয়, নিজেদের জন্য, প্রায় সমগ্র অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ওপর একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।


তারা দেশী লোকদের উৎপন্ন দ্রব্য অত্যন্ত কম দামে বেচতে এবং অন্যদিকে বিলাতি পণ্য খুবই চড়া দামে কিনতে বাধ্য করত। কোম্পানি তাদের অধীনে একদল দেশী কর্মচারী নিয়োগ করত। এই দেশীয় কর্মচারীরা যে এলাকায় যেত, সে এলাকা ছারখার করে দিত। সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করত। ব্রিটিশ কোম্পানির প্রতিটি কর্মচারী ছিল তার উচ্চপদস্থ (ইংরেজ) মনিবের শক্তিতে বলীয়ান। আর এই মনিবদের প্রত্যেকের শক্তির উৎস ছিল খোদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। (তাদের ব্যাপক লুণ্ঠন ও শোষণের ফলে) শীঘ্রই কলকাতায় বিপুল ধন-সম্পদ স্তূপীকৃত হলো। সেই সাতে তিন কোটি মানুষ দুর্দশার শেষ ধাপে এসে দাঁড়ালো। বাংলার মানুষ শোষণ ও উৎপীড়ন সহ্য করতে অভ্যস্হ একথা ঠিক, কিন্তু ও ধরনের (ভয়ঙ্কর) শোষন ও উৎপীড়ন তারাও কোনদিন দেখেনি”। (Macaulay : Essaya on Lord Clive, P-63; সুপ্রকাশ রায় : ভারতের কৃষক বিদ্রোহ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ১০)
ইংরেজরা শাসন ক্ষমতা লাভের আগে দীর্ঘকাল চেষ্টা করেও তাদের পণ্য-ব্যবসা সমাজের গভীর অভ্যন্তরে বিস্তৃত করতে পারেনি। এদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমাজের কাঠামো অক্ষত রেখে তাদের এই ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করা সম্ভব ছিল না। আগে যা কখনো সম্ভব হয়নি, পলাশীর পরে এখন তা সম্ভব হলো। ইংরেজরা শাসন ক্ষমতা হাতে পাওয়ার সাথে সাথে নজীরবিহীন ক্ষিপ্রতার সাথে বাংলা ও বিহারের প্রাচীন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমাজের এই ভিত্তি ও কাঠামোটাকে গুঁড়িয়ে দেয়।
এই সমাজকে ইংল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহের যন্ত্ররূপে ব্যবহারের প্রক্রিয়া হিসেবে তারা-
ভুমি-রাজস্বের নতুন ব্যবস্থা চালু করে এবং
ভূমি-রাজস্ব হিসেবে ফসল বা উৎপন্ন দ্রব্য আদায়ের প্রচলিত পদ্ধতির বদলে মুদ্রার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা প্রবর্তন করে।
ইংরেজ প্রবর্তিত এই নতুন ভূমি-ব্যবস্থা ও কর-ব্যবস্থা সম্পর্কে সুপ্রকাশ রায় মন্তব্য করেন :
“এই দুই অস্ত্রের প্রচণ্ড ধ্বংসকারী আঘাতে অল্পকালের মধ্যেই বাংলা ও বিহারের প্রাচীন গ্রাম-সমাজের ভিত্তি ধূলিসাৎ হইল। বিহার ও বাংলা শ্মশান হইয়া গেল”। (সুপ্রকাশ রায় : ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ১০)
ইংরেজ শাসনের আগে এ দেশের শাসকরা সমগ্র গ্রাম-সমাজের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। কোন ব্যক্তির কাছ থেকে নয়। চাষী জমির ফসলের দ্বারা গ্রাম-সমাজের মাধ্যমে এই রাজস্ব আদায় করত। ইংরেজরা গ্রাম-সমাজের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের
এ ব্যবস্থা লোপ করে কৃষকদের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে এবং ফসলের বদলে মুদ্রার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের রেওয়াজ চালু করে। এভাবে এদেশের প্রাচীন সমাজ-ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ধ্বংস করে তারা সমগ্র ভূমি-ব্যবস্থা নতুনভাবে গড়ে তোলার আয়োজন করে। কৃষকদের কাছ থেকে যত খুশি খাজনা ও কর আদায় করে তার একটি নির্দিষ্ট অংশ ইংরেজদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এক নতুন জমিদার শ্রেণী সৃষ্টি করা হয়। এই জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য ইংরেজরা বাংলা ও বিহারের নিষ্ঠুরতম দস্যু সরদারদেরকে ‘নাযিম’ নিয়োগ করে।
নাযিম নামক এই দস্যুদের অত্যাচার ও লুণ্ঠন সম্পর্কে কোম্পানির দলিলপত্র থেকে জানা যায়। বাংলা ও বিহারের রাজস্ব কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ১৭৭২ সালের ৩ নভেম্বর ইংল্যান্ডে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব ডাইরেক্টরসকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন :
“নাযিমরা জমিদার ও কৃষকদের কাছ থেকে যত বেশি পারে কর আদায় করে নিচ্ছে। জমিদাররাও নাযিমদের কাছ থেকে চাষীদের লুণ্ঠন করার অবাধ অধিকার লাভ করেছে। নাযিমরা আবার তাদের সকলের (জমিদার ও কৃষকদের) সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার রাজকীয় বিশেষ অধিকারের বলে দেশের ধন-সম্পদ লুট করে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছে”।
১৭৬৫-৬৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর সে বছরই তারা প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ২ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সে আদায়ের পরিমাণ আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজদের রাজস্ব-নীতি ও ভূমি-ব্যবস্থা সম্পর্কে সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন :
“এই সকল ব্যবস্থার ফলে চাষীদের পিঠের ওপর বিভিন্ন প্রকারের পরগাছা শোষকদের একটা বিরাট পিরামিড চাপিয়ে বসে। এই পিরামিডের শীর্ষদেশে রহিল ইংরেজ বণিকরাজ, তার নীচে রহিল বিভিন্ন প্রকার উপস্বত্বভোগীর দলসহ জমিদারগোষ্ঠী। এই বিরাট পিরামিডের চাপে বাংলা ও বিহারের অসহায় কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়াল”।
 
ব্যবসায়ের নামে ‘প্রকাশ্য দস্যুতা’
বাংলার জনগণের কাছ থেকে ছিনেয়ে নেওয়া বিপুল ভূমি-রাজস্ব, কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করা ঘুষ, ব্যবসায়ের নামে ব্যক্তিগত লুণ্ঠন এবং এদেশের টাকা দিয়ে এখানে নামমাত্র মূল্যে পণ্য কিনে ইউরোপে চালান করা হতো। ফলে যে মুনাফা তারা লাভ করত, তার পরিমাণ ছিল অবিশ্বাস্য রকম স্ফীত। এ দেশের জনগণের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া রাজস্বের টাকার একাংশ দিয়ে এ দেশেরই কারিগরদের তৈরি পণ্য-সম্ভার

নামমাত্র মূল্যে কেড়ে নিয়ে ইউরোপে চালান দিয়ে মুনাফা করা হতো বিপুল অংকের টাকা। সমুদয় গ্রাম করত ‘কোম্পানি-লগ্নি’। এই অদ্ভুত লগ্নির চেহারা ছিলো :
“বাংলাদেশের জনগণের টাকা, বাংলার কারিগরদের তৈরি দ্রব্য, কিন্তু মুনাফা কোম্পানির। কার্লমার্কস, রেজিনাল্ড প্রমুখ লেখক এই ‘ব্যবসায়ের’ নাম দিয়েছেন ‘প্রকাশ্য দস্যুতা”।
ব্যবসায়ের নাম ইংরেজ বণিক কোম্পানির এই দস্যুতার মুখে বহু শিল্প-কারিগর উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য নিজেদের বুড়ো আঙুল কেটে ফেলে অসহনীয় উৎপীড়ন থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। অনেকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে বন-জঙ্গলে পালিয়ে যায়। ১৭৫৮ থেকে ১৭৬৩- এই ছয় বছরে কৃষকদের সাথে কারিগরদের একটি অংশ স্থায়ী বেকারে পরিণত হয়। ইংরেজ লেখক রেজিনাল্ড রেনল্ডস লিখেছেন :
“ঐ সময়ের মধ্যে ঢাকার বিশ্বখ্যাত মসলিনের এক তৃতীয়াংশ কারিগর ইংরেজ বণিকদের শোষণ-পীড়নে অস্থির হয়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল”। (রেজিনাল্ড রেনল্ডস : সাহিবস ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৫৪)
 
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর : মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ
ইংরেজদের নয়া রাজস্বনীতির কারণে কৃষকরা খাজনার টাকা যোগাড় করার তাকিদে বছরের খাদ্য-ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ইংরেজরা মুনাফা শিকারে সেরা সুযোগরূপে বেছে নেয় চালের মজুতদারীকে। তারা চালের একচেটিয়া ব্যবসা কুক্ষিগত করার জন্য বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ব্যবসা-কেন্দ্র খুলে ফসল ওঠার সাথে সাথে চাউল মজুদ করে রাখত। পরে সুযোগ বুঝে চাষীদের কাছে তাদেরই রক্ত পানি করা শ্রমের ফসল কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করত। তাদের এই একটি ব্যবস্থাই ‘ভারতের শস্য-ভাণ্ডার’ নামে খ্যাত, মোগল সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ প্রদেশ, যেখানে মুসলিম শাসনের দীর্ঘ সাড়ে পাঁচশ’ বছর মানুষ কখনো দুর্ভিক্ষের সাথে পরিচিত ছিল না, সেই বাংলা ও বিহারকে দুর্ভিক্ষের স্থায়ী কেন্দ্র পরিণত করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
১৭৬৯ সালে ফসল ওঠার সাথে সাথে ইংরেজরা বাংলা ও বিহারের সকর ফসল কিনে ফেলে। সারা বছর মজুদ করে রেখে ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬ সাল) সে খাদ্য-শস্য কয়েকগুণ বেশি দামে বেচতে শুরু করে। কয়েক বছরের নিষ্ঠুর শোষণে সর্বস্বান্ত কপর্দকশূণ্য কৃষক ও কারিগরদের পক্ষে এত চড়া দামে সে চাল কিনা সম্ভব ছিল না। ফলে বাংলা ও বিহারে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুর শিকার হয়। তৎকালীর গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হোস্টিংস-এর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ছিল এক কোটি পঞ্চাশ লাখ।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত এই মহা দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজ লেখকইয়ং হাসবেন্ড লিখেছেনঃ
“তাদের (ইংরেজ বণিকদের) মুনাফা শিকারের পরবর্তী উপায় হলো চাল কিনে গুদামজাত করে রাখা। তারা নিশ্চিত ছিল যে, জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের জন্য তারা যে দাম চাইবে, তাই তারা পাবে। দেশে যা কিছু খাদ্য ছিল তা (ইংরেজ বণিকদের) একচেটিয়া দখলে চলে গেল। খাধ্যের পরিমাণ যত কমতে লাগল, ততই দাম বাড়তে লাগল। শ্রমজীবী দরিদ্র জনগণের চির-দুঃখময় জীবনের ওপর পতিত হলো এই পুঞ্জিভূত দুর্যোগের প্রথম আঘাত। কিন্তু এটি এক অশ্রুতপূর্ব বিপর্যয়ের শুরু মাত্র। দেশিয় জনশক্রদের সহযোগিতায় একচেটিয়া শোষেণের বর্বরসুলভ মনোবৃত্তির অনিবার্য পরিণতিস্বরূপ যে অভূতপূর্ব বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখা দিল, তা এমনকি ভারতবাসীরাও আর কখনো দেখেনি বা শুনেনি”।
তিনি আরো লিখেছেনঃ
“চরম খাদ্যভাবের এক বিভীষিকাময় ইঙ্গিত নিয়ে দেখা দিল ১৭৬৯ সাল। সাথে সাথে বাংলা ও বিহারের সমস্ত ইংরেজ বণিক, তাদের সকল আমলা-গোমস্তা, রাজস্ব বিভাগের সকল কর্মচারী, যে যেখানে নিযুক্ত ছিল, সেখানেই দিন-রাত পরিশ্রমে ধান-চাল কিনতে লাগল। এই জঘন্যতম ব্যবসায় মুনাফা হলো এত শীঘ্র ও এতই বিপুল পরিমাণে যে, মুর্শিদাবাদের নবাব-দরবারে নিযুক্ত একজন কপর্দকশূণ্য ইংরেজ ভদ্রলোক এ ব্যবসা করে দুর্ভিক্ষ শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রায় ষাট হাজার পাউন্ড ইউরোপে পাঠিয়েছিলেন”। [Young Husband : Transactions in India (1786 ; P. 123-24]
‘মৃত্যু-ব্যবসায়ী’ ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় দালালদের সৃষ্ট এই ছিয়াত্তরের মহা-মন্বন্তর সম্পর্কে ইয়ং হাসবেন্ড মন্তব্য করেন :
“বাংলার সমগ্র ইতিহাসে এই দুর্ভিক্ষ এরূপ নতুন অধ্যায়ের যোজনা করেছে, যা মানব সমাজের সমস্ত অস্তিত্বকালব্যাপী ব্যবসানীতির এই ক্রর উদ্ভাবনা-শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে; অলঙ্ঘণীয় মানবাধিকারসমূহের ওপর কত ব্যাপক, গভীর ও কত নিষ্ঠুরভাবে অর্থ-লালসার উৎকট অনাটার চলতে পারে, এই অধ্যায়টি তারও কালজয়ী নির্দশন হয়ে থাকবে”। (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৩১)
এ দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতার বিবরণ দিয়ে এল. এস. এস. ও মলী লিখেছেন :
“চাষীরা ক্ষুধার জ্বালায় তাদের সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হলো। কিন্তু কে তাদের কিনবে? কে তাদের খাওয়াবে? বহু এলাকায় জীবিত লোকেরা মরা মানুষের গোশত খেয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্ঠা করেছে। নদী-তীর লাশ আর মুমূর্ষুদের দেহে ছেয়ে গিয়েছিল। মরার আগেই মুমূর্ষ লোকদের দেহের গোশত শিয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলত”। (L.S.S.O Molley : Bengal. Bihar and Orissa Under British Rule, P-113.)

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সম্পর্কে পরবর্তী যুগের ইংরেজ লেখক উইলিয়াম হান্টার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন :
“১৭৬৯ সনের শীতকালে বাংলার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যার জের দুই পুরুষ ধরে চলে। ইংরেজ ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতীয় ইতিহাস ছিল চমকপ্রদ সামরিক-সাফল্যে প্রাণবন্ত কোম্পানির প্রশংসাপত্রসহ ধারাবাহিক সংগ্রামগুলোর সমাহার। সুতরাং যুদ্ধ বা সংসদীয় বিতর্কের সাথে সংযোগহীন এই ঘটনা (দুর্ভিক্ষ) সম্পর্কে তাদের বক্তব্যের বিশেষ সম্পর্ক নেই বললেই চলে। ১৭৭০ সনের সারা গ্রীষ্মকাল জুড়ে গণমড়ক অব্যাহত থাকে। কৃষকরা গবাদিপশু বিক্রি করে দেয়: বিক্রি করে কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি; তারা বীজধান খেয়ে ফেলে; নিজেদের ছেলেমেয়েদের তারা বিক্রি করতে থাকে এবং তারপর তারও কোন ক্রেতা পাওয়া যায় না। তারা গাছের পাতা, ক্ষেতের ঘাস খেতে থাকে এবং ১৭৭০ সনের জুন মাসে দরবারের আবাসিক প্রতিনিধি শভ ভক্ষণের সত্যতা সমর্থন করেন। দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত, রোগগ্রস্ত হতভাগ্যের দল দিবারাত্রি বড় বড় নগরগুলো পূর্ণ করতে থাকল। বছরের প্রথমে মহামারির প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। ........ অর্ধমৃতদের সাথে শবদেহের অবিন্যস্ত স্তূপে পথ অবরুদ্ধ, নির্বিচারে কবর দিয়েও সমস্যার আশু সুরাহা হলো না; এমন কি প্রাচ্যের ঝাড়ুদার হিসেবে খ্যাত শিয়াল-কুকুরের দলও সাফাইয়ের বিতৃষ্ণাকর কাজে ব্যর্থ হলো এবং অবশেষে পচাগলা শবদেহগুলো নাগরিকের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলল। সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী ১৭৭০ সনের মে মাস শেষ হওয়ার আগেই জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ বিনষ্ট হয়। জুন মাসে মৃত্যু-সংখ্যা হিসেবে বলা হয় ‘সমগ্র জনসংখ্যার প্রতি ষোল জনে ছয় জন মৃত’; এবং হিসাব করে দেখা হয় যে, ‘কৃষকসহ খাজনা প্রদানকারী জনসাধারণের অধিকাংশ ক্ষুধার জ্বালায় ধ্বংস হবে’। বর্ষাকালে (জুলাই হতে অক্টোবর) জনশূণ্যত এত প্রকট হয়ে উঠে যে, আতংকগ্রস্ত সরকার পরিচালক-সভার কাছে ‘দুর্ভিক্ষ দ্বারা বিনষ্ট কৃষক ও ক্ষুদে উৎপাদকদের (কারিগর) সংখ্যা ‘সম্বন্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে”। [ডবলিউ ডবলিউ হান্টার : গ্রাম বাংলার ইতিকথা (এ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল গ্রন্হের অসীম চট্টোপাধ্যায় কৃত তরজমা), পৃষ্ঠা ১০

এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, এই নযীরবিহীন গণমৃত্যু সম্পর্কে ইংরেজরা কতটা নিরুদ্বেগ ও বেপরোয়া ছিল তার বিবরণও হান্টারের লেখায় বিধৃত। ইংরেজরা তাদের লুণ্ঠনের পরিমাণ সম্পর্কেই আগ্রহী ছিল। এদেশের মানুষের ব্যাপারে তাদের জাতীয় মানসিকতা ছিল অদ্ভুত রকমের হৃদয়হীন নির্লিপ্ততার।


হান্টার লিখেছেনঃ
“১৭৭২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ জনসাধারণ বাংলাকে একটা বিশাল গুদামখানা হিসাবে দেখত, যেখানে বেশ কছু দুঃসাহসী ইংরেজ মোটা লাভে এক বিশাল ব্যবসা চালাচ্ছে। বিপুল দেশীয় জনসংখ্যা সম্বন্ধে তারা সচেতন ছিল ঠিকই, এটা যেন তারা একটা আকস্মিক পরিস্থিতি বলে বিবেচনা করত এবং বর্তমানে আমরা নাটাল বা প্রিয়েরীলিয়নের অধিবাসীদের সম্পর্কে যে আগ্রহ বোধ করি, তার চেয়েও কম আগ্রহ তারা এ সম্বন্ধে বোধ করত”। (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৭)
এ দেশের জনগণের ব্যাপারে ইংরেজদের মানসিকতার প্রমাণ পাওযা যায় দুর্ভিক্ষের ব্যাপারে তাদের অবলম্বিত ব্যবস্থা থেকে। হান্টারের বিবরণ থেকে জানা যায়ঃ
“বিশ হাজার লোক যে জেলায় প্রতি মাসে মারা যাচ্ছে, সে জেলার ত্রাণ-কার্যের জন্য কোম্পানি-সরকার একশত পঞ্চাশ টাকা বরাদ্দ করে। চার লাখ উপবাসী মানুষের প্রতিদিনের সাহায্যের জন্য এক প্রাদেশিক পরিষদ ‘গভীর বিবেচনার পর মহানুভবতার সাথে’ দশ শিলিং মূল্যের চাউল অনুমোদন করেন। ‘অর্ধেক কৃষক ও প্রজা উপবাসে মারা যাবে’ এই সতর্কবাণী সত্ত্বেও কোম্পানি কাউন্সিল তিন কোটি মানুষের ছয় মাসের নির্বাহের জন্য অনুদান ধার্য করেন চার হাজার পাউন্ড”।
এই অনুদান প্রকৃত ভুক্তভোগীর হাতে যায় কিনা, সে সম্পর্কেও হান্টার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
দুর্ভিক্ষের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে হান্টার লিখেছেনঃ
“ যে দেশের জনসাধারণ সম্পূর্ণ কৃষিজীবী, সেখানে গণমৃত্যুর ফলে আনুপাতিক হারে জমি অনাবাদি থাকে। বাংলাদেশের জনসাধারণের এক তৃতীয়াংশ মারা যায় এবং এক তৃতীয়াংশ আবাদি জমি দ্রুত পতিত জমিতে পরিণত হয়। দুর্ভিক্ষের তিন বছর পর এত বেশি জমি অকর্ষিত থাকে যে, দেশীয় রাজন্যবর্গের প্রজাদেরকে বাস্তুত্যাগ করে পরিষদশাসিত এলাকায় আনার জন্য (কোম্পানি সরকারের) পরিষদ ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। দুর্ভিক্ষ –পরবর্তী প্রথম পনের বছরে জনশূন্যতা অবিচলিতভাবে বাড়তে থাকে। ঘাটতির সময়ে সবচে বড় বিপর্যয়ের শিকার হয় শিশুরা এবং ১৭৮৫ সন পর্যন্ত বৃদ্ধরা মারা যায়। কিন্তু তাদের শূন্যস্থান পুরণের জন্য নতুন কোন প্রজন্ম ছিল না। জমি পতিত পড়েই রইল এবং তিন বৎসরের সতর্ক তদন্তের পর ১৭৮৯ সনে লর্ড কর্ণওয়ালিস বাংলার কোম্পানির এক তৃতীয়াংশ অঞ্চলের বন্যজন্তু-আকীর্ণ জঙ্গল বলে ঘোষণা করেন”।
সারা দেশে যখন মৃত্যুর এই বিভীষিকা চলছে, তখন ১৭৭২ সালে ইংল্যান্ডে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডাইরেক্টরদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তৎকালীন বাংলা ও বিহারের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস লিখেনঃ

“প্রদেশের সমগ্র লোকসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু এবং তার ফলে চাষের চরম অবনতি সত্ত্বেও ১৭৭১ সালের নীট রাজস্ব আদায় এমনকি ১৭৬৮ সালের রাজস্বের চেয়ে বেশি হয়েছে। যে কোন লোকের পক্ষে এটা মনে করা স্বাভাবিক যে, এরূপ একটা ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে রাজস্ব তুলনামূলকভাবে কম আদায় হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা না হওয়ার কারণ এই যে, সকল শক্তি দিয়ে রাজস্ব আদায় করা হয়েছে”। (পূর্বোক্ত, পরিশিষ্ট)
এ প্রসঙ্গে হান্টার লিখেছেনঃ
“১৭৭২ সালে, পুরোনো চাষীরা মরীয়া হয়ে তাদের কাজ ছেড়ে দিলে তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং বকেয়া খাজনার দায়ে কলকতার ‘ঋণগ্রস্তদের কারাগারে’ তাদেরকে কয়েদ করা হয়। রাজস্ব নির্ধারণের প্রতিটি পর্যায়ে একই ঘটনা ঘটে। দুর্ভিক্ষের প্রায় ২০ বছর পর ব্রিটিশরা জেলার দায়িত্ব গ্রহণকালে জেলাগুলো বকেয়া খাজনাজনিত বন্দীতে পূর্ণ ছিল এবং কোনো বন্দীরই পুনঃমুক্তির কোনো আশা ছিল না। দেশ যখন প্রতিটি বছরের সাথে আরো অধঃপতিত হচ্ছে তখন ইংরেজ সরকার ক্রমাগত বর্ধিত খাজনা দাবি করতে থাকে। ১৭৭১ সনে আবাদি জমির এক তৃতীয়াংশেরও বেশি জমি সরকারি হিসেবে পরিত্যক্ত বলে দেখানো হয়। ১৭৭৬ সনে এই হিসেবে সমগ্র আবাদি জমির অর্ধাংশেরও বেশি দাঁড়ায়, প্রতি সাত একর আবাদি জমির সাথে চার একর পতিত থাকে। অন্যদিকে কোম্পানির দাবি ১৭৭২ সনে ১০,০০,০০০ পাউন্ডের কম হতে বেড়ে ১৭৭৬ সনে প্রায় ১১,২০,০০০ পাউন্ডে দাঁড়ায়”।
বাংলায় ইংরেজ বণিক শ্রেণী, আর তাদের লুণ্ঠন-সহচর বর্ণহিন্দু রাজা-মহারাজা, জগতশেঠ-আলম চাঁদ প্রমুখ কোটিপতি লগ্নি-পুজির মালিক, তাদের আত্মীয়-স্বজন, নব্য বিত্তশালী এজেন্ট, বেনিয়া, নিলামে জমিদারী খরিদকারী নতুন বর্ণহিন্দু শহুরে জমিদার শ্রেণী, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা তাদের দালাল, নায়েব, গোমস্তা প্রভৃতি অর্থলগ্নীর দল তাদের গোলা, মড়াই, আড়ত, কাচারীতে সারা বাংলার খাদ্যশস্য মজুত রেখে যে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তার তুলনা নেই। স্বল্পকালের লুণ্ঠন-শোষণের মাধ্যমে কোম্পানির কর্মচারীরা ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। জগত শেঠ, আলম চাঁদ প্রমুখ কোটিপতিগোষ্ঠী এ সময় সম্পদের পাহাড় গড়েছিল। কেউ প্রত্যক্ষ মজুতকারবারী, কেউ বেনামী অংশীদার, আর কেউ অর্থের লগ্নিকারী। ইংরেজ বণিকশ্রেণীর শাসনকালের ইতিহাসে এই সময়কাল নিষ্ঠুরতার বিচারে তুলনাহীন। ইংরেজ বণিকশ্রেণীর এই অদ্ভুত শাসনকে ইংল্যান্ডের বাগ্মীশ্রেষ্ঠ এডমন্ড বার্ক মানব সভ্যতার ইতিহাসে ‘মৃত্যুর শাসন’ আর ওরাঙ ওটাঙ বা ‘নেকড়ের শাসন’ নামে অভিহিত করেছেন। (Speeches of Edmaund Bark)


কোম্পানি শাসনের এই ভয়াবহ রূপ দেখেই বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এ্যডাম স্মিথ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেনঃ
“কোন ব্যবসায়ী কোম্পানির একচেটিয়া শাসনই যেকোন দেশের বিভিন্ন প্রকার শাসন-ব্যবস্থার মধ্যে নিকৃষ্টতম শাসন”। (Adam Smith : Essays on Political Economy, P-131)
সমসাময়িক বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্হ সিয়ারুল মুতাআখখেরীন-প্রণেতা এই দুর্ভিক্ষের ফলে সৃষ্ট মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় কাতর হয়ে লিখেছেনঃ
“ইয়া আল্লাহ। তোমার দুঃখ-দুর্দশাক্লিষ্ট বান্দাহদের সাহায্যের জন্য একবার তুমি নেমে আস। এই অসহনীয় উৎপীড়ন থেকে তুমি তাদের উদ্ধার কর”। (গোলাম হুসাইন তাবাতাবাই : সিয়ারুল মুতাখখেরীন- গোলাম হুসাইন খান অনূদিত)
 
ভূমি-ব্যবস্থার ধ্বংস ও কৃষক শোষণের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’
ইংরেজ ও এদেশীয় জনশক্রদের সৃষ্ট ছিয়াত্তরের ভয়াবহ মন্বন্তর বাংলা ও বিহারের প্রাচীন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমাজের শেষ চিহ্ন মুছে দিয়েছিল। ভয়াল ধ্বংসযজ্ঞের এই পটভূমির ওপর দাঁড়িয়েই ইংরেজ বণিক-শাসকরা তাদের কৃষক-শোষণের ব্যবস্থা পাকাপাকি করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও সূর্যাস্ত আইনের দ্বারা মুসলমানদের হাত থেকে সমস্ত ইজারা, জমিদারী, একে একে খসিয়ে ফেলে নতুন হিন্দু জমিদার ও তালুকদার শ্রেণীর আমদানি করা হয়। যেসব হিন্দু কর আদায়কারী ঐ সময় পর্যন্ত নিম্ন পদের চাকরিতে নিযুক্ত ছিল, নয়া ব্যবস্থার বদৌলতে তারা জমিদার শ্রেণীতে উন্নীত হয় (ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার : দি ইন্ডিয়ান মুসলমান; এম. আনিসুজ্জামান অনূদিত পৃষ্ঠা ১৪১)। ফলে অভিজাত মুসলমান পরিবারগুলো একেবারে উৎখাত হয়।
হেস্টিংস-এর চুক্তি (১৭৭২-৯৩) ও লর্ড কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) ফলে এদেশের বুনিয়াদি ও পুরনো জমিদারদের ভাগ্যে নেমে আসে দুর্ভাগ্যজনক পরিবর্তন। নিলামের ডাকে যারা প্রচুর অর্থ দিতে পারতো, তাদেরকেই জমিদারী দেওয়া হতো। পুরনো জমিদারদের পক্ষে ইংরেজদের চাহিদা মাফিক অর্থ দেওয়া সম্ভব ছিল না।
প্রচুর জমানো টাকা নিয়ে এগিয়ে এল বেনিয়ান, গোমস্তা, মহাজন আর ব্যাংকের মালিকরা। লুণ্ঠন-শোষণের মাধ্যমে অর্জিত নগদ টাকার জোরে রাতারাতি তারা জমিদার হয়ে বসল। তাদের সকলেই ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু। তাদের গোত্রীয় পরিচয় দেব, মিত্র, বসাক, সিংহ, শেঠ, মল্লিক, শীল, তিলি বা সাহা। তাদের অনেকেরই পূর্ব পরিচয় তারা পুরাতন জমিদারদের নায়েব কিংবা গোমস্তা। আর তাদের অভিন্ন পরিচয় তারা বাংলা নব্য-প্রভু শাসকদের দালালরূপী লুটেরা-শোষক।

 
কোম্পানির সমর্থকরূপে নব্য জমিদার ও মহাজন
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার যে শোষণ-ব্যবস্থা চালু হয় সে সম্পর্কে সুপ্রকাশ রায় লিখেছেনঃ
“বাংলাদেশের জমিদারদের দেয় মোট রাজস্বের পরিমাণ স্থির হইল চার কোটি দুই লক্ষ টাকা। কিন্তু এই বন্দোবস্তের প্রথম বছরেই জমিদারগোষ্ঠী কৃষকদের নিকট হইতে প্রায় তিনগুণ খাজনা ও কর আদায় করে। তখন হইতে জমিদারগোষ্ঠীর আদায় ক্রমশ বাড়িয়ে গিয়াছে। কিন্তু শাসকদের রাজস্ব অপরিবর্তিত রহিয়া গিয়াছে। এইভাবে ইংরেজ শাসকগণ তাহাদের লুণ্ঠনের একটা বিরাট অংশ ভাগ দিয়া এদেশে জমিদার নামক একদল স্থায়ী শাসককে তাহাদের রক্তাক্ত শাসন ও শোষণে চিরস্থায়ী সমর্থগোষ্ঠীরূপে সৃষ্টি করে”। (সুপ্রকাশ রায় : ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ১৬)
ইংরেজ শাসক ও তাদের সমর্থক জমিদারদের খাজনার দাবি মিটাতে কৃষকরা তাদের জমি ও বাড়িঘর বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণের জন্য মহাজনদরে শরণাপন্ন হয়। সুদে-আসলে সে ঋণ পরিশোধ করতে কৃষকরা ব্যর্থ হয়, আর মহাজনরা তাদের ঘরবাড়ি-জমি-জিরাত কেড়ে নেয়। এভাবে মহাজনরা কালক্রমে জমিদার হয়ে ওঠে এবং ইংরেজদের শোষণের যোগ্য অংশীদারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে পল্লী অঞ্চলের ব্যবসায়ী মহাজন মাত্রই হিন্দু। ইংরেজ শাসকদের সৃষ্ট এসব জমিদার-মহাজনরাই ছিল বাংলাদেশের নিরীহ সরল কৃষকদের প্রধান শক্র।
ঋণদান ছাড়া মহাজনদের অন্য একটি ভূমিকা ছিল। ফসল বিক্রি করতে হলে চাষীকে সেই মহাজনের কাছেই ধর্ণা দিতে হতো। ঋণ ও সুদের দাবি মিটাতে চাষীকে মহাজনের শোষণের স্থায়ী শিকার হয়ে থাকতে হতো। মহাজনের বিরুদ্ধে কোনরূপ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করারও উপায় ছিল না। কখনো ক্ষেপে গিয়ে চাষীরা যাতে মহাজনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালাতে না পারে, সে জন্য ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী সর্বশক্তি দিয়ে মহাজনশ্রেণীকে রক্ষা করার ব্যবস্থা নেয়। এভাবে উনিশ শতকের প্রথম থেকেই বাংলাদেশের কৃষকদের ওপর তিনটি ভয়ঙ্কর শোষক-শক্তি তাদের সমস্ত ভার নিয়ে চেপে বসে। বৃটিশরা আদায় করে তাদের খাজনা ও বিভিন্ন কর। আর মহজনরা কৃষকের বাকি ফসলের প্রায় সবটুকু কেড়ে নেয় তাদের ঋণের সুদ হিসাবে।

এ প্রসঙ্গে আর পি দত্ত উল্লেখ করেছেনঃ
“বৃটিশ-ভারতের একজন কৃষকের বার্ষিক গড়পড়তা আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৮ থেকে ৪২ টাকা। ট্যাক্স-খাজনা এবং মহাজনের ঋণ বা ঋণের সুদ পরিশোধ করার পর কৃষকের হাতে অবশিষ্ট থাকত মাত্র ১৩ থেকে ১৭ টাকা। অর্থাৎ আয়ের এক তৃতীয়াংশ হাতে নিয়ে কৃষকের সারা বছর কিভাবে চলবে সেই সমস্যার কথা ভাবতে হতো” (আর পি দত্ত : ইন্ডিয়া টু-ডে, পৃষ্ঠা ২৫১)
বাংলাদেশের লুটের টাকায় বিলাতে শিল্প-বিপ্লব
কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলাদেশের ভূমি-ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটল। জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে সৃষ্টি হলো ধ্বংসের বিভীষিকা। মোগল আমলের বাংলার সমৃদ্ধ সমাজ-কাঠামো ধ্বংস হলো এবং কোম্পানির অনুগ্রহপুষ্ট দালাল, বেনিয়া, মুৎসুদ্দি, নব জমিদার ও মহাজন নামক লুণ্ঠনকারীরা সমাজ-জীবনের সকল ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করল। ইংরেজ বেনিয়াদের এ সকল ভাগ্যন্বেষী অনুচর, দালাল ও মোসাহেবদের দস্যুব্রত্তির দৌরত্ম্যে দেশ জুড়ে ঘনিয়ে আসে শিল্পের ঘোরতর দুর্দিন।
এই নিব্য লুটেরা শোষক শ্রেণীটি সত্যিকার জমিদার যেমন হতে পারেনি, ব্যবসায়ী হিসেবেও তারা ছিল দালাল-পর্যায়ভুক্ত। কোম্পানির একাধিপত্যের দরুন তারা বহির্বাণিজ্যে যেমন নাক গলাতে পারেনি, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের বড় বড় দিকও তেমনি ইংরেজদের একচেটিয়া দখলে চলে গিয়েছিল। ফলে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যৈর সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ছিল বিদেশীদের হাতে।
বাঙালি নব্য জমিদারগোষ্ঠী কৃষি ধ্বংস করল, কৃষকের সর্বনাশ ঘটালো, ব্যবসা হারাল, শিল্পকে অবহেলা করল, ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প কেড়ে বাড়ি-ঘর ও জমি-জমায় টাকা খাটাবার দিকে মন দিল। ফলে সমৃদ্ধ একটি জাতি সব দিক দিয়ে রিক্ত এবং নিঃস্ব হয়ে পড়ল। তাদের অগ্রগতির সকল দুয়ার রুদ্ধ হলো।
পলাশী যুদ্ধের পর থেকে বাংলা ও বিহারের সম্পদ লুট করে ইংরেজ বণিকগোষ্ঠী যে বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ বিলাতে নিয়ে যায় তার ফলে ইংল্যান্ডে শিল্প-বিপ্লব ত্বরান্বিত হয়। ইংল্যান্ডে শিল্প-বিপ্লব আরো আগে শুরু হলেও ‌১৭৬০ সাল পর্যন্ত এর গতি ছিল মন্হর। কিন্তু বাংলার লুণ্ঠিত সম্পদ ইংল্যান্ডে পৌঁছতে শুরু করার পর থেকে সেখানে অতি দ্রুত বিভিন্ন কল-কারখানা গড়ে উঠত।
মুসলিম শাসনামলে বাংলাদেশ ছিল একচেটিয়া রফতানিকারী দেশ। এদেশের পণ্য সম্ভার দিয়েই ইংল্যান্ডে ব্যবসা-বণিজ্য চলতো। ইংল্যান্ড বা ইউরোপের অন্য কোন দেশ থেকে পণ্যদ্রব্য এনে এদেশ বিক্রি করার কথা কেউ তখন কল্পনাও করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার মতো উন্ন ত বস্ত্রশিল্প তখনো ইউরোপের কোন দেশে গড়ে ওঠেনি। ব্যবসা-বাণিজ্যে ইংল্যান্ডের অবস্থা যে তখন খুবই শোচনীয় ছিল, তার বিবরণ দিয়ে ব্রুকস এডামস লিখেছেন:
“ব্যংক অব ইংল্যান্ড স্থাপিত হওয়ার ৫০ বছর পরও ব্যাংকের প্রচলিত নোটের মধ্যে সবচে বড় নোট ছিল ২০ পাউন্ডের নোট। ১৭৫০ সালে সমগ্র প্রদেশে বারোটার বেশি বাংক ছিল না। অথচ ১৭৯০ সাল নাগাদ শহরের প্রতিটি বাজারে ব্যাংক গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ থেকে রূপা আসার সাথে সাথে শুধুমাত্র অর্থের প্রচলন বেড়ে যায়নি, আন্দোলনও জোরদার হয়েছে”।

পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতার সূর্যাস্ত ঘটল ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর শিবিরে দু’দিন সসৈন্যে অবস্থান করলেন ক্লাইভ। তারপর দু’শ ইংরেজ ও পাঁচশ’ দেশীয় সৈন্য নিয়ে তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদের অধিবাসীরা নীরবে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই মোড় পরিবর্তনের ঘটনার সাক্ষী হলো। ক্লাইভ নিজে স্বীকার করেছেনঃ
“ইচ্ছা করলে মুর্শিদাবাদের জনতা শুধু লাঠি আর পাথর মেরে এই নতুন বিজেতাদেরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারত। লোকেরা নাকি বলাবলিও করেছে, কোন অস্ত্র ছাড়া শুধু ইটপাটকের মেরেই মুর্শিদাবাদের লোকেরা ইংরেজদের ধরাশায়ী করতে পারত”। (ভোলানাথ চন্দ্র : দি ট্রাভেল অব এ হিন্দু, লন্ডন, ১৮৬৯, পৃষ্ঠা ৬৮)
মুর্শিদাবাদের লুটপাট : উত্থানের সূচনা
পলাশী বিপর্যয় মুর্শিদাবাদের সাথে সাথেই কোন বড় রকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বলে জানা যায় না। শাসক মহলের অন্তঃপুরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আর বিশেষ সম্প্রদায়ের ‘বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষয়রোগ’ জাতির প্রতিরোধ-চেতনা পঙ্গু করে ফেলেছিল। শাসক ও জনতা ছিল আত্মিক সম্পর্কহীন, পরস্পর বিচ্ছিন্ন। উদ্যমহীন এই নিস্পৃহ মানুষেরা অবাক চোখে দেখল মুর্শিদাবাদ লুণ্ঠনের ঘটনা। ক্লাইভের নিজ তত্ত্বাবধানে মুর্শিদাবাদের রাজকোষ নিঃশেষে লুণ্ঠিত হলো। এরপর ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই পুতুল নবাব মীর জাফর আলী খাঁ রাজকীয় শন-শওকতের সাথে ইংরেজদের ‘যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের’ প্রথম কিস্তির টাকা কলকাতায় পাঠালেন সোনা-চাঁদির মাধ্যমে।
“সামরিক বাদ্য সহকারে শোভাযাত্র করিয়া প্রথম কিস্তির টাকা দুই শত নৌকায় বোঝাই করিয়া কলিকাতা অভিমুখে রওয়ানা হইল”। (রমেশচন্দ্র মজুমদার)
কলকাতার উত্থানের সূচনা এখান থেকেই। মুর্শিদাবাদের জনগণ এবারে তারেদ অন্তরে একটা অব্যক্ত জ্বালা অনুভব করল। কোথায় যেন একটা বড় রকম ছন্দপতন ঘটে গেছে! ২৩ জুন পলাশী দিবস থেকে আমাদের অনেক কিছু  পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক , সাংস্কৃতিক
পলাশী থেকে ইংরেজদের শাসন, পাকিস্তানির শোষন থেকে আমাদের  কাছে সুস্পষ্ট হয়েছে  জাতিসত্তা নির্মাণে ভুল ও বিভ্রান্তি একটি জাতির অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি। পাল আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত বিভিন্ন যুগের শাসকের ভুলের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে স্পষ্ট। আমাদের যে কোন ভুলের সুযোগ নেওয়ার জন্য হাঙ্গরের মতো মুখ ব্যদান করে আছে এমন এক শক্তি, যাদের সাথে হাজার বছর লড়াই করে আমাদের সাহসী জতি এগিয়ে এসেছে এত দূর। স্বাধীন-সার্বভৌম ও সংহত অস্তিত্বের জন্য বাংলাদেশকে তার রাষ্ট্রগঠন কার্যক্রমের পাশাপাশি জাতিগঠনকে দিতে হবে অগ্রাধিকার। কাটিয়ে উঠতে হবে আত্মপরিচয়ের সকল বিভ্রান্তি। আর এ জন্য
বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকঙ্ক্ষা, ইতহাস-ঐতিহ্য এবং বিশ্বাস ও মূ্ল্যবোধের ভিত্তিতে জাতীয় ইমেজ ও আইডেন্টিটি নির্মঅণ করতে হবে।
জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে ও সকল ক্ষেত্রে ঐক্য জোরদার করতে হবে। যে কোন ঐক্য-বিনাশী তৎপরতা দেশের শক্রদের হাতেই অস্ত্র তুলে দেবে। বিভিন্ন চেতনার ধুয়া তুলে জাতিকে ঘুমে অচেতন রেখে যারা জাতির সত্তা ও অস্তিত্বের সিন্দুক চুরি করতে চায়- তাদের সম্পর্কে সজাগ-সচেতন, জাগ্রত থাকতে হবে সকলকে।


লেখক
নেজাম উদ্দিন
শিক্ষার্থী- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সদস্য- বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চবি।




   



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ