About Us
Mahdi Hasan - (Chattogram)
প্রকাশ ১৯/০৬/২০২১ ১২:২৮পি এম

বাবার বিয়ে

বাবার বিয়ে Ad Banner
বাবার বিয়ে
মাহদী হাসান

নিস্তব্ধ রাত। হঠাৎ করে মাইকে কাওয়ালীর সুর। "কী অইছে! কী অইছে!!" বলে লাফিয়ে ওঠলো তারেকুল। সমানে ভক্তিমূলক গান বাজছে। কে শোনে কার কথা! সারাদিন কোচিং করানোর পর শান্তিতে একটু ঘুম যাবে, তারও কোনো উপায় রাখলো না। ঘড়ি ডংডং করে জানান দিল- রাত বারোটা বাজে। কোনো রকম উঠে, তার পরনের লুঙ্গি খুঁজে না পেয়ে— মেজাজ আরও চরমে। এমনিতেই সে লুঙ্গি ছাড়া ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতে পারে না। অবশেষে লুঙ্গি খুঁজে পেলেও, এই রাতে এতো উচ্চ শব্দের কোনো কাওয়ালী গানের উৎস খুঁজে পেলো না। আবারও বাঁজখাই কণ্ঠে বলে ওঠলো, "কী অইছে! কী অইছে!!"

এই 'কী অইছে'র জবাব দেবার মতো মধ্যরাতে কেউ জেগে থাকলে, একমাত্র তার মা'ই আছে। বাদবাকি সবাই বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। লুঙ্গি পরিধানের পর্যাপ্ত সময় রেখে মা তারেকুলের রুমে প্রবেশ করলো।
—"কিরে ভঁইষের মতো এতো রাইতে চিল্লাস ক্যা!"

ঘুমের রেশ এখনও চোখ থেকে যায় নাই। তার উপরে মাথার ভেতরে কারা যেনো কাওয়ালীর সাথে ঢোল বাজাতে লাগলো। তারেকুল ঢুলতে ঢুলতে বললো, "কী অইছে! বাইরে কী অইতাছে! এতো রাইতে কার আবার হাঁঙ্গা লাগছে!"। মায়ের উত্তরের অপেক্ষা না করে, সেন্ডো গেঞ্জি পরে তার উপরে গামছা জড়িয়ে বের হয়ে পড়লো তারেকুল।

পূর্ণিমার আলোয় চারদিকে মোটামুটি সবকিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। অসময়ে মনুষ্য শরীরের ঘ্রাণ পেয়ে তিন চারটে কুকুর ঘেউঘেউ শব্দে তারেকুলের কাছে ছুটে আসলো। উদ্দেশ্য ছিল, কামড়ে ভিতরে জলাতঙ্কের জীবাণু প্রবেশ করিয়ে দেবে। কিন্তু কাছে এসে দেখলো— এ যে তাদের প্রিয় তারেকুল! বিড়াল বন্ধুর বাবা! ক্ষুধার যন্ত্রণায় যখন জিহ্বা বের হয়ে যায়, তখন এই তারেকুলের পোষ্য বিড়ালই তাদের শেষ ভরসা। কোত্থেকে কী এনে যে তাদের সামনে দপ করে ফেলবে, কল্পনা করা যায় না। এইতো— গত দুদিন আগে পোয়াতি শরীর নিয়ে কোত্থেকে এক স্থুলকায় মুরগির বাচ্চা এনে সামনে রাখলো, তাদের সামনেই বাচ্চাটি ধরফড়িয়ে মারা গেলো। এমন তাজা মুরগিছানার গোশতের স্বাদ এখনও জিহ্বায় লেগে আছে। বন্ধুর এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ আপ্যায়ণের স্মৃতি কী করে ভুলে থাকা যায়! তার উপর আবার বন্ধুর আব্বা! কুকুরগুলো ঘোঁৎঘোঁৎ করে বিনয়ের সাথে রাস্তা ছেড়ে কোনো রকমে মুখ লুকালো। ভেতরে ভেতরে তারেকুল অনেক ভয় পেয়েছে। তার হার্টবিটের উত্থান পতনের ধ্বনি তার নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছিল। ভয় আরও দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছিল। মনে মনে সে সুরা আত্-তারিক্বের শেষ তিন আয়াত পড়ে বুকের মধ্যে থুথু ফেলল। কুকুরের এহেন আচরণে সে কিছুটা মুগ্ধ হয়ে, পাঁচ থেকে ছয় মিনিট থমকে দাঁড়িয়েছিল। আর মনে মনে কোরআনের এমন শাশ্বত মোজেজায় তার ভেতরে প্রশান্তির বাতাস অনুভব করল। তারপর, তারেকুল তার লুঙ্গির কিয়দাংশ উপরে তুলে হেলেদুলে সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিল।

তারেকুল পাড়ার তেমাথায় এসে একটা জটলা আবিষ্কার করল। সে খেয়াল করল, তারা কী একটা জটিল বিষয় নিয়ে ফুসুরফাসুর করছে। কাছে এসে দেখতে পেলো, সবগুলোই পরিচিত মুখ। সালাউদ্দিন খোঁচা মেরে বললো, "কীরে তারেকুল, এতো রাইতে উদোম গায়ে! বিরানীর ঘ্রাণ পাইছোস নাকি!"

তারেকুলের বুক এখনও ধড়ফড় করছে। কোনরকমে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, "কী অইছে সালাউদ্দিন ভাই!"

সালাউদ্দিন সোজাসাপ্টা জবাব দিতে পারে না। এটা তার চিরকালীন অভ্যাস। নতুন দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বললো, "তোদের ব্লকে তো ঘটনা ঘইটা গেছে তারেকুল! তোমাগো কোনো খবর নাই! ক্যামনে অইলো এই ঘটনা! নাকী বিরানী একলা একলাই খাইলা!"

তারেকুল কিছুই বুঝতে পারে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সালাউদ্দিনের মুখের দিকে। তিনি নতুন দাড়ি রেখেছেন। নামাজ কালাম ঠিকঠাক মতো না পড়লেও, চেহারায় মাশাআল্লাহ- হাজ্বী সাহেব। তিনি খুব সুন্দর করে রসবোধসহ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলতে পারে। অন্য সময় ভালো লাগলেও আজ কেনো জানি খুবই অসহ্য লাগছে। "কী অইছে সালাউদ্দিন ভাই!"

"তোগো ব্লকে তো খাসি বিয়া করি ফালাইছে! আকিজ কাকু আছে না! তার মাইয়া রাবিনার লগে! ক্যান কোনো কিছু জানস না মনে অয়! হাহাহা। নিশ্চিত— বাবায় জান্নাতের লোভ দেখাইছে!" একগাল হেসে হেসে বকছিল সালাউদ্দিন।

তারেকুলের মাথায় সবকিছু এলোমেলো তথ্য হাজির হতে লাগল। এক খাসি ছাড়া, আর কোনো কিছুই তার মাথায় ঢুকাতে পারলো না। কলোনিতে গত কয়েক বছর আগে সুদূর সিলেটের সুনামগঞ্জ থেকে এক পীর বাবা এসেছিলেন। কী দরাজ কণ্ঠ তার! ঐ বারই ফতোয়া দিয়ে গিয়েছেন— খাসি ও বলদ দিয়ে কোরবানি করা হারাম হারাম হারাম। বজ্রকন্ঠে তিনবার হারাম উচ্চারণ করে সুন্নিয়তের সিংহপুরুষ সেজেছিলেন। এমনকি উক্ত ফতোয়ার অনুকূলে পাঁচ লক্ষ টাকার ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মেরেছিলেন। যদিও তারেকুল ও তার বন্ধুবান্ধব মিলে বিভিন্ন স্কলারদের মাধ্যমে নিশ্চিত হলো যে, খাসি ও বলদ দিয়ে কোরবানি করা যাবে। পরেরবার এই একই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, তিনি একইভাবে হুংকার ছেড়ে বলেছিলেন, হারাম হারাম হারাম। সেইবার থেকেই বাবার নাম খাসি হুজুর নামে রুপান্তরিত হলো। আরও মজার বিষয় হলো— তিনি নিজেকে সাঁইত্রিশতম আওলাদে রাসুল দাবী করে বসে আছেন। মাইক পেলে নিজেই নিজের নসবনামা ঘড়ঘড় করে বলে বেড়ান। এমনকি তার এই নসবনামা লেমিনেটিং করে ভক্তকুলের মাঝে বিতরণ করে বেড়ান। প্রথমবার যখন মুরিদ করার জন্য তার পাগড়ি ছেড়ে দিলেন, আহারে নাদান মানুষদের কী যে হুড়োহুড়ি! সেইবারই তিনি তারেকুলের ব্লকেই খানকাহ্ গড়ে পিরালী ব্যবসার গোড়াপত্তন করলেন। পাড়ার মানুষদের তিনি দুইভাগে বিভক্ত করে দিলেন। কেউ সুন্নী, আর কেউ ওহাবী। পুলিশের প্রোটেকশন নিয়ে তিনি তার ব্যবসা ভালোই চালিয়ে আসছেন। কিন্তু ষাটোর্ধ্ব বয়সী এই খাসি বাবা আবারও বিয়ে করছেন, এই ব্যাপারটা তারেকুলের মাথায় আসলো না।

আকিজ কাকার মেয়ে রাবিনার বয়স ২০/২২ এর বেশি হবে না। তার মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই ইহকালীন জীবন বাবার পায়ের নিচে সমর্পণ করেছে। কিন্তু কলোনির বেশিরভাগ মানুষ এই বিয়েটা মেনে নিতে পারছে না। এমনকি বাবার অনেক মুরিদ তাদের বায়আত খারিজ করে কথিত ওহাবী হয়ে গেছে। বিরানীর মৌ মৌ গন্ধে বিদ্রোহীদের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। তারেকুল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। জীবন থেকে ত্রিশ বসন্ত পার হয়ে গেলো, খোদা তাআলা তার দিকে মুখ তুলে তাকালেন না। কোনোরকম দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে চোখ রাখলেন তোফাজ্জলের দিকে।

তোফাজ্জল দীর্ঘদিন বাহরাইন ছিলেন। কাজের ফাঁকে ইসলাম শিখে এসে, এখানে বিদআতের গন্ধে তিনি টিকতে পারেন না। অতঃপর তিনি সুকৌশলে পরিবর্তনের হাল ধরেন। তিনি তার দাড়িতে আঙুল দিয়ে চিরুনির কাজ করতে করতে বলে উঠলেন— "য়্যাঁই ইয়ানে সমইস্যার কিছু দেহি না! আমাগো নবী মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মা আয়েশা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা'র বয়সের পার্থক্কো জানস না! কোডে ৫৩, আর কোডে ৯! কোনো সমইস্যা অইছেনি! ইয়ানের বিরোধিতা কইল্লে ঈমান নষ্ট অই যাইবো। তোরগো এতো মাথা ব্যথা কিয়েল্লাই ক চে! হেতেরগো তো কোনো সমইস্যা নাই! সমইস্যা খালি তোরগো মাথাত। য়েঁরে তারেকুল, য়েঁরে ইচুপ— তোরা তাড়াতাড়ি বিয়া করিয়ালা। নইলে, তোরগো মাথা নষ্ট অই যাইবো। ঈমান নষ্ট অই যাইবো।"

এতক্ষণে তারেকুল সবকিছু বুঝতে পারলো। এখনও তার মাথায় কাওয়ালী সুরের সাথে সাথে কারা যেনো অনবরত ঢোল পিটাচ্ছে। তারপরের ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্ত। রাবিনার ভেতরে কেমন অনুভূতি কাজ করছে জানা নেই। সে এখন আওলাদে রাসুলের বউ। বিয়ের একদিন পরই কড়া গার্ডসহ সিলেটের সুনামগঞ্জে পীরের ডেরায় পা রেখেছে সে। কলোনির অধিকাংশ মুসলমান— হযরত মুহম্মদ (সঃ) ও আয়েশা (রাঃ) এর বিয়ে মেনে নিলেও, পীর বাবা ও রাবিনার বিয়ে মেনে নিতে পারছে না।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Nargis Arman - (Narayanganj)
প্রকাশ ২৬/০৭/২০২১ ০৬:১০পি এম
Nargis Arman - (Narayanganj)
প্রকাশ ২৫/০৭/২০২১ ১১:২৯পি এম
Md Chuton Mia - (Kishoreganj)
প্রকাশ ১১/০৭/২০২১ ০৮:৪৩পি এম