About Us
মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
Motior Rahman Sumon - (Mymensingh)
প্রকাশ ১৬/০৬/২০২১ ১২:২৩এ এম

গফরগাঁওয়ের জিন্দাপীরের মাজার

গফরগাঁওয়ের জিন্দাপীরের মাজার Ad Banner

দু-দু'টি বিয়ে করে ৭০ বছর বয়সেও একটি সন্তানের মুখ দেখতে পারলাম না, আমার মৃত্যুর পর এ বংশে বাতি দেওয়ার মত আর কেউ থাকবেনা বলেই- একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন খোরশেদ তালুকদার। আমার জ্যাঠার দ্বারা মাজারের গাছটি কাটার ফলেই আজ বংশের চিহ্নটিও মুছতে বসেছে। এ গ্রামের আরো দুটি পরিবারের বাতি চিরতরে নিভে গেছে। তিনি মনে করেন বাবার মাজারের অবমাননা করার কারণেই এই শাস্তি। বাবার মাজারের অবমাননা করলে কারো রক্ষে নেই বলেই ধ্যানমগ্ন হয়ে পীরের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।



লোকমুখে ময়রা গ্রামের হযরত ইলিয়াস খান চৌধুরী সাহেবের মাজারের বহু অলৌকিক ঘটনার কথা শুনা যায়। ইলিয়াস খান চৌধুরী সাহেব নাকি এখনো জিন্দা। সেজন্য এই মাজারকে জিন্দাপীরের মাজার বলা হয়। তাঁর মাজারের প্রতি কেউ কোন বেয়াদবি করলে তার আর রক্ষে নেই একটা না একটা ক্ষতি তার হয়েই। জনাব খোরশেদ তালুকদার সাহেবের জ্যাঠা অন্যান্যদের সাথে মাজারের খাদেম ছিলেন বহুদিন। তিনি একবার মাজারের একটি কাঁঠাল গাছ কেটে নিতে চাইলেন। অগত্যা সবাই তাঁর দাবি মেনেও নিলেন। করাতী দ্বারা গাছ কাটলেন এবং ভালো মিস্ত্রী দ্বারা একটি সিন্দুক তৈরী করালেন। সিন্দুক ঘরে রাখলেন কিন্তু কি বিপদ, রাত্রে সিন্দুক গড়গড়-সড়সড় শব্দ করে বাতি নিবাতেই। কখনো কখনো রাত্রে অন্ধকারে সিন্ধুকের ভিতর থেকে উজ্জ্বল আলোর বিচ্ছুরিত ছটা দেখা যায়। কখনও সিন্দুক থেকে বের হয় অপরূপ সুন্দরী পরী। উপায়ন্তর না দেখে সিন্দুক বিক্রয় করার কথা ঘোষণা করা হয়। বহু ক্রেতা এসে দাম হাঁকেন কিন্তু বিক্রি হয়না উপযুক্ত মূল্যের অভাবে। সিন্দুকটি খুবই সুন্দর এবং পুরাতন গাছের শক্ত কাঠ দিয়ে তৈরি। অবশেষে ঐ এলাকার ধনী লোক বলে খ্যাত জুম্মন খাঁ সাহেব সিন্দুকটি ক্রয় করে বাড়ী নিয়ে গেলেন। বিপদ সেখানে আরো বেশি। জুম্মন খাঁ-এর বাড়ীই হঠাৎ পুড়ে গেল আগুনে। আগুনের কারণ কেউ খোঁজে বের করতে পারলেন না। আশ্চর্যের বিষয় বাড়ী-ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেল কিন্তু সিন্দুক পুড়লো না। দিন্দুকের ঘড়ঘড়ানী -সরসরানীর শব্দ জানা-জানি হয়ে গেল। সকলেই অনুমান করলেন আগুনের কারণ এই সিন্দুক। কাজেই সিন্দুক বিক্রয় কর। ততদিনে সিন্দুকের নানা কথা রসকষ মিশিয়ে প্রচারিত হয়ে গেছে। বাপরে বাপ! সাক্ষাৎ বিপদ। খাল কেটে কে কুমীর আনবে? কার ঘাড়ে দশটি মাথা? কার এত সাহস, এত বুকের পাটা? কাজেই কেহ-ই কিনলেন না। শেষপর্যন্ত  সিন্দুকটি পাঁঁচবাগের সর্বজন মান্য বুজুর্গ সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সবাই ভেবেছিলো হুজুরের কাছে সিন্দুক শান্ত হবে কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। অবশেষে সিন্দুকের স্থান হল ব্রহ্মপুত্রের বিক্ষুব্ধ উদরে। সিন্দুকের কাঠ যিনি কাটলেন সে ব্যক্তির ভবলীলা সাঙ্গ হল পাগল হয়ে। যে করাতীরা গাছ চিড়াফাড়া করলো এবং যে মিস্ত্রি সিন্দুক বানালো সকলের বংশে বাতি দিবার কেউ রইল না। আর তালুকদার ত সন্তানের আশায় একটির জায়গায় দু'টি বিবাহ করলেন। ডাক্তারীমতে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী তিন জনের মধ্যে কারোরি কোন দোষ ত্রুটি ছিলনা। কাজেই তালুকদার ধরে নিয়েছিলেন জ্যাঠারকৃত অপরাধেই তাঁর বংশ নির্বংশ হতে চলেছে। জীবিত থাকা অবস্থায় সময় সময় তিনি মাজার জিয়ারত করতেন, পূর্ব পুরুষের কৃত অপরাধের মার্জনা চাইতেন।



তালুকদার সাহেবের ভাষ্যমতে, মাওলানা ইলিয়াস খাঁন চৌধুরী সাহেবকে সাদা পোষাকে, সাদা আরবি ঘোড়ায় চড়ে তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে দেখেছেন। আরও অনেক লোকে তাঁকে এ অবস্থায়ই এ পোশাকে সাদা ঘোড়ায় চড়ে নিশীথ রাতে যাতায়াত করতে দেখেছেন।

এখানে ইলিয়াস খাঁন সাহেবের মৃত্যু হয়েছে বলে কেহ বলেন না। কেহ কেহ তাঁকে এখনো দেখেন। তিনি নাকি জিন্দা কবর নিয়েছেন! ময়রা গ্রামের স্ত্রী-পুরুষ, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সকলেই গভীর শ্রদ্ধা করে এ কামেল দরবেশকে। তার কিছু কারণ বিদ্যমান। ময়রা গ্রামে কখনো কলেরা-বসন্ত মহামারী হতে দেখা যায়নি। কদাচিৎ কেউ বাইরের কোন জায়গা থেকে কলেরা বসন্তে আক্রান্ত হয়ে এ গ্রামে আসলে একমাত্র সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য কেহ সংক্রমিত হয়নি।



এ মাজারে বহু লোক আসে। দরবেশকে জিন্দা মনে করে তাঁর অসিলা ধরে আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা করে। শুনা যায় রোগ-শোক, ব্যামারী আজারী, মামলা, মোকদ্দমা প্রেমপ্রীতি কোন ক্ষেত্রেই কেহ নিরাশ হয়না, যদি আন্তরিকতার সাথে সে প্রার্থনা করা হয়।



এ মাজারে একটি কালো পাথর আছে। আনুমানিক দুই হাত হবে। তবে কেউ মেপে দেখেননি। বেয়াদবি হবে বলে এখানকার জমিও কেহ মাপ-জোক করেন না। কথিত আছে, এ পাথর নিশীথ রাতে পুকুরে নেমে গোসল করে আসতো। এখন এ পাথরের উপর মোমবাতি জ্বালানো হয়। মানতের পয়সাও এ পাথরে ছুঁইয়ে দেয়া হয় খাদেমের হাতে। খাদেম উপস্থিত না থাকলে এ পাথরের উপরই টাকা পয়সা রেখে দেওয়া হত।



এ পরীরের এখানে আগমন ঘটে প্রায় ৪০০ বৎসর পূর্বে। তাঁরা দু'ভাই দুইটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে সাদা পোষাকে দক্ষিণ দিক থেকে এখানে আগমন করেন বলে জানা যায়। তাঁর ভাই দৌলত খান চৌধুরীও কামেল পীর ছিলেন। তাঁর মাজার শরীফ গ্রামের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত। মাজারটির পাদদেশে একটি বিরাট শেওড়া গাছ ছিল- যা বহুবছর থেকে দৃষ্টি গোচর হত।

দক্ষিণ দিকে সূর্য থাকা অবস্থায় মাজারে ছায়া দিত। কেউ কখনো এ গাছের ডাল কাটতো না। আশ্চর্যের বিষয় এ মাজারে মানত না করে কেহ মাজারের কোনো গাছ কাটলে না নাকি মাটিতে না পড়ে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতো। কথিত আছে একবার মাজারের একটি বড়ই গাছ বিক্রি করা হয়। ক্রেতা কেরাতি নিয়ে এসে গাছটি কাটলেন কিন্তু গাছ পড়েনা। বহু চেষ্টা হল ৩/৪ দিন পর্যন্ত কিন্তু কোন কিছুতেই কিছু হলনা। তারপর মাজারে এসে মানত করে আবদার জানিয়ে গাছের গাছে ফিরে গিয়ে দেখেন গাছ এতক্ষণে মাটিতে পড়ে আছে। অনেক কাহিনী জড়িয়ে আছে এ মাজার দু'টিকে কেন্দ্র করে।



ময়রা গ্রামে ইলিয়াস খান চৌধুরীর মাজারে প্রতি বৎসর পৌষ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার উরস শরিফ অনুষ্ঠিত হয়। তার এক সপ্তাহ পরে দৌলত খান চৌধুরীর মাজেরের উরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। ময়রা গ্রাম ছাড়াও বাহির হতে বিভিন্ন মানত নিয়ে লোকজন যোগদান করে। অন্যান্য মাজারের মত এখানেও মুর্শেদী, মারফতি গান হয়।



বর্তমানে হযরত ইলিয়াস খাঁন চৌধুরী সাহেবের মাজারের দেখাশুনা করেন হাফেজ মোঃ শওকত আলী সরকার (ইমাম ও খতিব বাঙালকান্দি মড়লবাড়ি জামে মসজিদ) তিনি বলেন উপরে লিখিত বিভিন্ন ঘটনার কথা পূর্ব জেনে আসছেন বলে জানান। ৪০০ বছর আগে থেকে মাজারটি অবস্থিত। সুতরাং সঠিক ইতিহাস বলা সম্ভব নয়। এগুলো পূর্ব থেকে লোকমুখে শুনা যায়। তিনি বলেন বর্তমানের মানুষ হারাম খায়, হারাম কাজ করে যুগও পালটে গেছে, মানুষের বিশ্বাসও নেই তাই এখন আর কিছু দেখা যায় না। আগে মাঝে মাঝে মাঝ রাতে সাদা ঘোড়ায় চড়ে সাদা পোষাকে কাউকে এখানে আসতে দেখা যেত। কোন মহামারি, বন্যা, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় এগুলো এগ্রামে কখনো হয়নি। তিনি এও বললেন এখন পর্যন্ত কোনো করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান এগ্রামে পাওয়া যায়নি।



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ