About Us
Towhid Ahmed - (Brahmanbaria)
প্রকাশ ০৮/০৬/২০২১ ০১:২৭এ এম

ভয়াবহ এক মাদকের নাম এলএসডি ড্রাগ

ভয়াবহ এক মাদকের নাম এলএসডি ড্রাগ Ad Banner

এলএসডি যার পূর্ণনাম লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড, এর আবিষ্কার ঔষধ হিসেবে হলেও তাঁর অপব্যবহার হচ্ছে মাদক হিসেবে।   ১৯৩৮ সালে সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানী সুইস রসায়নবিদ অ্যালবার্ট হফম্যান ঔষুধ হিসেবে আবিষ্কার করে এলএসডি ।

পরে এটি অপব্যবহার হয়ে মাদক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।  যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করে ব্যবহার, অনুভূতি এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন করে। 

এলএসডি নেয়ার পর সাধারণত মানুষ 'হ্যালুসিনেট' করে বা এমন দৃশ্য দেখে যা বাস্তবে নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে মানুষ। 

এটি সেবন করে সেবনকারী নিজেকে অনেক শক্তিশালী ভাবে। সেবনকারী চিন্তা করে, সে উড়তেও পারবে। তার অতীত স্মৃতি চলে আসে। অনেকে বলেছে, এটি সেবনের পর তারা মনে করে যে, তারা ট্রেনেও ধাক্কা দিতে পারবে। 

এলএসডি কী?  যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী, এই এলএসডি রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ যা রাই এবং বিভিন্ন ধরণের শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরণের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়। 

এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে, এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়।

  ১৯৩৮ সালে প্রথমবার এলএসডি সংশ্লেষণ করা হয়। এরপর ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে নানা ধরণের মানসিক রোগের চিকিৎসায় এলএসডি ব্যবহারের জন্য প্রচারণা চালান গবেষকরা।

সেসময় এই বিষয়ে বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়, আয়োজিত হয় একাধিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনও।  তখন এলএসডি'কে 'সাইকাডেলিক' মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধরণের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশেপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং কখনো কখনো 'হ্যালুসিনেট' বা অলীক বস্তু প্রত্যক্ষও করে থাকে। 

এলএসডি গ্রহণ করে ভুল রাস্তা দেখে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, বাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া বা অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার বেশ কিছু ঘটনা নথিবদ্ধ রয়েছে। 

১৯৩৮ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে এলএসডিসহ সব ধরণের সাইকাডেলিক ড্রাগ নিষিদ্ধ করে। এরপর ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ চিকিৎসা কাজে এলএসডি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে এই বিষয়ে গবেষণায় ভাটা পড়ে। 

তবে বিশ্বের নানা দেশে বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের মত অসুস্থতার চিকিৎসায় এলএসডি'র কার্যকারিতা নিয়ে এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোচিকিৎসক ও রসায়নবিদরা। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে আসে যে, চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট মাত্রায় এলএসডি গ্রহণের ফলে অসুস্থতার কারণে দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকা রোগীদের দুশ্চিন্তা কমে। 

এরপর লন্ডন, বাসেল এবং জুরিখ শহরের ৯৫ জন রোগীর ওপর গবেষণাটি পরিচালনা করেন সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিসিন বিভাগের গবেষক মাথিয়াস লিখটি। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসার প্রয়োজনে বা গবেষণার কাজে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট মাত্রায় এলএসডি গ্রহণ করে থাকে মানুষ। তবে এটি মূলত ব্যবহার হয়ে থাকে মাদক হিসেবে। 

এলএসডি ক্ষতিকর কেন?   ইউরোপের বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের বাণিজ্যিক ওয়েবসাইট রিসার্চগেইট'এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় মোট ৬৪ জনের মৃত্যু হয় এলএসডি গ্রহণের পরবর্তী জটিলতায়। 

বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগা ব্যক্তিরা এলএসডি গ্রহণের পর আরো বেশি বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হতে পারেন বলেও উঠে এসেছে অনেক গবেষণায়। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন বলছে, এলএসডি গ্রহণের পর অনেকে মনে করেন যে তিনি সবকিছু পরিষ্কার দেখছেন এবং তার শরীরে অতিমানবিক শক্তি এসেছে। এরকম বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার ফলেও অনেকে নানা ধরণের দুর্ঘটনা শিকার হতে পারেন।

অতিরিক্ত আতঙ্কের কারণে মানুষ অনেক সময় মনে করতে পারে যে সে শীঘ্রই মারা যাবে বা মারা যাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতেও মানুষ আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে নানা ধরণের কাজ করে থাকে যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। 

আতঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি অতি দ্রুত অনুভূতির পরিবর্তন হওয়ার কারণেও মানুষ মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করতে পারে বলে বলছে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন। 

সংস্থাটি বলছে এলএসডি গ্রহণের আগে এটা বোঝা সম্ভব নয় যে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন হতে যাচ্ছে। এছাড়া এলএসডি মানুষের শরীরে বিভিন্ন রকম প্রভাব ফেলে থাকে। 

এলএসডি নেয়ার ফলে মানুষের হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এছাড়া অনেকের ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ঘাম সহ নানা ধরণের মানসিক সমস্যাও তৈরি হয়। 

(সূত্র : বিবিসি)   বাংলাদেশে এলএসডির প্রভাব:  গত বুধবার (২৬ মে), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানের ‘আত্মহত্যা’র কারণ খুঁজে বের করার তদন্তে প্রথমবারের মত আলোচনায় আসে এলএসডি ভয়ানক মাদক। 

সে সময়ে রাজধানীতে হাফিজুরের তিন বন্ধুকে ২০০ ব্লট এলএসডিসহ গ্রেফতারও করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।  এলএসডি মাদক অনেক পুরোনো হলেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার নতুন।

এ মাদক অনেক বেশি ব্যয়বহুল। কয়েক বছর ধরে এলএসডি উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।  গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাদক কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ করে কুরিয়ারের মাধ্যমে এই মাদক দেশে আনা হচ্ছে। 

স্টিকার বা তরল পানি শোষণ করে রাখে এমন কাগজ ব্যবহার করে এটি দেশে আনা হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ মাদকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। 

যদিও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলছে, এবারই প্রথম নয়। ২০১৯ সালেও এলএসডি সহ গ্রেফতার করা হয়  দুজনকে।  পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানান, টেলিগ্রাম অ্যাপে যোগাযোগ করে টিম নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে নেদারল্যান্ডস থেকে এলএসডি আনেন।

সেজন্য প্রতি ব্লটে খরচ হয় এক হাজার টাকা। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ওই মাদক দেশে আসে।  গত রবিবার (৩০ মে), মাদক সেবন ও বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো পাঁচ ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগ।

পুলিশ বলছে, এই পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদে এলএসডি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আরও ১৫ টি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছে তারা। কুরিয়ার সহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেশে আনে এই ভয়ানক এলএসডি। 

প্রতিরোধমূলক প্রচেষ্টা:  সেই অতীত কাল থেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারাও মাদকাসক্তির প্রতিকারের প্রচেষ্টা চালিয়েছে সমাজ। এই অভিশাপ থেকে সমাজ তথা বিশ্বকে রক্ষা করতে গেলে সর্বস্তরে সার্বিকভাবে এর প্রতিকারের জন্য একান্ত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

বর্তমানে পৃথিবী জুড়ে নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এর জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে।  সমাজের নিম্ন স্তর থেকে আধুনিক রাষ্ট্রকেও এই ব্যাপারে অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে উঠতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা। গঠনমূলক শিক্ষার বহুমুখী বিস্তার ঘটাতে হবে।

মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর দিকগুলি মানুষের কাছে আরো বেশি করে তুলে ধরতে হবে। আধুনিক গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে এই সচেতনতা গড়ে তোলা যেতে পারে। 

মাদকের বিস্তার রোধে একটি হটলাইন সেবাও চালু করেছে বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ৯৯৯ হটলাইন নম্বরে ফোন করে মাদক সম্পর্কে যে কোনো রকম তথ্য জানাতে পারবে সাধারণ মানুষ। 

তদুপরি মাদক ব্যবসা এবং চোরাচালানকারীদের চক্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রে পৃথিবীকে আরো অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে। যুবক যুবতীদের জন্য সৃষ্টি করতে হবে কর্মসংস্থান। সুস্থ বিনোদনকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্ম তথা সমস্ত মানুষকে নেশার অমোঘ হাতছানি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।   

প্রতিকারমূলক প্রচেষ্টা:  অন্যদিকে যে সমস্ত মানুষেরা ইতিমধ্যেই নেশার কবলে জর্জরিত তাদের সুস্থ করে তোলার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আরো বেশি করে গড়ে তুলতে হবে নেশা মুক্তি কেন্দ্র। মানুষকে শিখতে হবে মাদককে ঘৃণা করতে, মাদকাসক্তকে নয়। বুঝতে হবে মাদকাসক্তি কোন ট্যাবু নয়, নিছকই একটি সামাজিক রোগ। 

সৃষ্টির সেই আদি লগ্ন থেকে মাদকাসক্তি সমাজের জন্য একটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই অভিশাপ সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করে।

সমাজে মূল্যবোধ গড়ে উঠতে বাধা দেয়। ফলে আমাদের সকলের সুন্দর ও নির্মল এক সমাজের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। আধুনিককালে বিজ্ঞানের এই সর্বময় জয়যাত্রার যুগে আমাদের চেষ্টা করতে হবে বিজ্ঞান কে কাজে লাগিয়ে সমাজের এই সমস্যাকে নির্মূল করার। 

বিজ্ঞান যাতে আর এল.এস.ডি কিংবা কোকেনের মত ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য তৈরিতে ব্যবহার না হয় সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সকলের।

সমাজের নিম্নতম স্তর থেকে সকলে একসাথে একত্রিত হয়ে এই অভিশাপের বিরুদ্ধে লড়াই করলে নিশ্চয়ই একদিন আমরা মাদকাসক্তি মুক্ত পৃথিবী উপহার দিতে পারব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মেকে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ