About Us
Md.Harun-Or-Rashid - (Kurigram)
প্রকাশ ০৮/০৬/২০২১ ১১:৫৮এ এম

হারিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম

হারিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম Ad Banner

মৃত্যু তাে জীবনের অনিবার্য একটা অধ্যায়। এই অধ্যায়ের কোন বিকল্প নেই। আর জীবনের পরীক্ষায় এই অংশটাকে বাদ দিলে পরীক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু প্রশ্নটা জন্ম-মৃত্যু নিয়ে নয়।   

প্রশ্নটা একটা প্রজন্মকে নিয়ে, যে প্রজন্মটা একটা ইতিহাসের সাক্ষী ছিল। সাক্ষ্য বহন করছিল আবেগ, ভালােবাসা আর লড়াই দিয়ে গড়া একটা পরিবর্তনের। আর এই পরিবর্তনটার নাম স্বাধীনতা।   

সাল ১৯৭১, ১৬ ই ডিসেম্বর- তারিখটা খুব চেনা আমাদের, কিন্তু আমরা এই প্রজন্মের কেউ চাক্ষুষ সেই দিনটাকে দেখার সৌভাগ্য পায়নি। আমরা যে সেই প্রজন্মের একজন নই। সমাজের কিছু বয়স্ক মানুষেরা সেই দিনটা দেখেছেন। আর এই শ্রেণীর বেশিরভাগ সদস্যদের বর্তমান বয়স বাহাত্তর থেকে পচাত্তর, খুব বেশি হলে আশি। হিসেব করে দেখলে আজকের দিনে যার বয়স ষাট থেকে পঁয়ষট্টি, তিনি সেই সময় দশ থেকে র বছরের শিশু। স্বাধীনতা জিনিসটা কি সেটা কি আদৌ একজন আট - দশ  কিংবা তেরো বছর বয়সি ছেলে-মেয়ের পক্ষে বােঝা সম্ভব?     

হ্যাঁ, চারিদিকে যখন ১৬ ই ডিসেম্বরে (সাল ১৯৭১)মানুষ দেশ স্বাধীনের আনন্দ মিছিল করছিল, তখন হয়ত সেই বাচ্চাটাও পাড়ার মােড়ে একটু নেচেছিল। আনন্দ মুখর আওয়াজের সাথে দুলতে দুলতে হয়ত সেও সেই শােভাযাত্রার জিলাপি খাচ্ছিল। সেদিনের বাতাসে প্রবাহিত হতে থাকা দেশপ্রেমের জোয়ারে ওই বাচ্চা ছেলেটাও খুব চিৎকার করেছিল “ জয় বাংলা,বাংলার জয়”, বলে। কিন্তু এই “ জয় বাংলা ” শব্দটা অনুধাবন করার মতাে জ্ঞান হয়ত তার ছিলনা। বিকেলে বাবা দাদাদের আড্ডায় বসে সে শুনছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হল আর মনে মনেই স্বাধীনতা নামক একটা ভালােবাসা তৈরি করার চেষ্টা করছিল।     

অনেকেই হয়ত স্বাধীনতা শব্দটার মানেই জানত না। সেই সময় যারা স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিল , তাদের বয়স তখন অন্তত আঠারাে থেকে কুঁড়ি হবেই। অর্থাৎ আজকে তাদের বয়স দাঁড়ায় সত্তর - বাহাত্তর। এই প্রজন্মের খুব কম সদস্যই আজ বেঁচে আছেন। আজ থেকে সাত - আট বছর আগেও ঊনাদের সংখ্যাটা কিছু বেশি ছিল। পাড়ায় পাড়ায় অন্তত এক - দুইজন ছিল যারা সুযোগ পেলেই স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প বলতে শুরু করতেন। আবেগ আর ভালােবাসা ভরা কণ্ঠে শােনাতেন সংগ্রামের ইতিহাস। কোন বই পরে বা টিভিতে চলচ্চিত্র দেখে নয়, তারা শােনাতেন চাক্ষুষ দেখে আসা একটা ইতিহাসের গল্প।     

হয়ত উনাদের কেউ কেউ সরাসরি যুক্ত ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। হাতে বাংলাদেশের পতাকা,কাঁধে রাইফেল নিয়ে , মুখে “ জয় বাংলা" -এর শ্লোগান নিয়ে তারা যুদ্ধ করেছেন দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে। প্রতিবাদ বিক্ষোভে তখন বাংলাভুমি মেতে উঠেছিল। মেতেছিলেন ওই প্রজন্মের সদস্যরাও।তাদের অনেকেই রণাঙ্গনে শহীদ হয়েছেন। কিছুজন হয়তো ওপারে গিয়েও স্বর্গীয় সু-বাতাসে শুনেছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হল,পাকিস্থানীদের অত্যাচারের অবসান ঘটল।   

যারা বেঁচে আছেন তাদের বেশিরভাগ এখন আর ঘর থেকে বাইরে বেরােনোর মত অবস্থায় নেই । কেউ কেউ হয়ত খুব অসুস্থ, লড়াই করছেন। জীবন - মৃত্যুর বেড়াজালে। ঠিক যেন একটা কাঁটাতারের গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে তারা গল্প বলছেন চোখে দেখা কিছু সংগ্রামের। আর এই কাঁটাতার কোন দেশের সীমানা নয়, একটা সময়, একটা জীবনের পরিসমাপ্তি । আজ থেকে আরও পাঁচ বছর পর তাদের কতজনকে খুঁজে পাবাে আমরা ?   

সময় গল্প লিখতে ভালােবাসে। আর সেই গল্পের সাক্ষী সে একাই থেকে যায়। এক্ষেত্রেও একসময় তাই হবে। প্রকৃতির আঙিনায় সময়ই তাে একমাত্র যে বেঁচে থাকে আর বাঁচিয়ে রাখে কিছু স্মৃতি। কিন্তু আজ যে মানুষগুলাে আমাদের তথা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস বলতে সক্ষম, তাদের দিকে কি একবারও তাকাবাে না আমরা? চোখের সামনে যখন দেখি একজন বুড়াে দাদু অথবা দাদী বসে আছে বাড়ির দরজায়, তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় কি একবারও আমাদের মনে শিহরণ জাগে? গায়ে কাটা দেয় ? মনে হয় একবারের জন্যও যে উনি কেবলই একজন বুড়াে - বুড়ি নন, উনি আমাদের অতীতের জীবন্ত দলিল।   

আর কয়েক বছর পর আমরা তাদের পাবাে না । হ্যাঁ,সংরক্ষণ করতে পারব না তাদের চিরকালের জন্য। প্রকৃতি সেই অনুমতি দেয়না আমাদের। তার পরও কি যে কদিন প্রকৃতি আমাদের সুযােগ দেয়, সেই সামান্য সময়টুকু কি আমরা একটু তাকাতে পারিনা তাদের দিকে? তাদের ভাঙা ভাঙা শব্দের সারিতে কি একবার ইতিহাস দেখার ইচ্ছে হয়না কারও?নাকি তারা এটুকু শোনানোর জন্যই আমাদের কাছে অমূল্য,”স্বাধীনতার ঘোষক মুজিব নাকি জিয়া?”   

আমেরিকা স্বাধীন হয়েছিল ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই । সেই স্বাধীনতার গল্প বলার জন্য আজ ২৪৪ বছর পর কেউ বেঁচে নেই । কেবলই নথির মধ্যে বেঁচে আছে সেইসব স্মৃতিগুলাে। হয়ত গত আড়াই শতকে অনেক উন্নতি করেছে সেই দেশ। সেখানকার সমাজ , অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা - সবকিছুরই পরিভাষা আর রূপ এখন অনেক আলাদা।   

কিন্তু তারপরও ইতিহাস তাে জন্মের কথা বলে। আর জন্মের মধ্যে একটা আবেগ লুকিয়ে থাকে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর হয়ত আমরাও অনেক উন্নতি করে নেব।

টেকনােলজির দৌলতে আমাদেরও সমাজ - সংস্কৃতির অনেক বিকাশ ঘটবে। কিন্তু ইতিহাস সেদিনও গল্প শােনাবে। সেদিনও ১৬ই ডিসেম্বর , ২৬শে মার্চ,২১শে ফেব্রুয়ারির  মত দিনগুলােতে স্কুল - কলেজে, পাড়ায় পাড়ায়, সরকারি অফিসে উত্তোলিত হবে জাতীয় পতাকা। সেদিনও স্কুল থেকে ফেরার সময় হাতে জিলাপি নিয়ে শহীদদের নিয়ে গল্প করবে দুই বন্ধু।   

আর বাড়িতে এসে দাদুর কাছে শুনবে- “আমার দাদু স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিল। আমি যখন তােমার বয়সি ছিলাম দাদুভাই, তখন আমার দাদু আমাকে স্বাধীনতার গল্প শােনাত।”


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Shamem Ahmed - (Dhaka)
প্রকাশ ১৯/০৬/২০২১ ১২:৩২পি এম