About Us
Gazi Fazla Rabbi - (Sylhet)
প্রকাশ ০৭/০৬/২০২১ ০৭:৫৪পি এম

মহাযামিনী

মহাযামিনী Ad Banner

জীবনে অগণিতবার বাবার সাথে আমার রাগ হয়েছে। বহুবার বাড়ি থেকে চলে গেছি সবকিছু তছনছ করে দিয়ে। শেষবার যখন এরকম একটা কিছু হলো, সেদিন বাবা নিজে আমাকে বাইকে করে বাস ধরার জন্যে ছাড়তে গেছে। আমি তার পেছনের সীটে বসা ছিলাম। আমার সারা শরীর তখন ক্রোধের আগুনে জ্বলছে। আর সবচেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে আছে আমার চোখ, যেন দুই চোখের মণি দুটো কালো উদ্যত কামান, সেখান থেকে লাল স্ফুলিঙ্গ উড়ছে থেকেথেকে, কিন্তু ভিতরটা আশ্চর্য শান্ত, জিতে যাওয়ার আনন্দে, কাঁদিয়ে চলে যেতে পারার উল্লাসে। আমি একবার লুকিং গ্লাসের দিকে তাকালাম। সেখানে দেখা যাচ্ছে বাবার দুই চোখ। টকটকে লাল, টুপটুপ করে জল পড়ছে আর বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে আবার জল জমা হচ্ছে চোখে, সেই জল আবার পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে, আবার ঘন হয়ে আসছে চোখ, যেন একটা বয়স্ক আগ্নেয়গিরিতে আগুন পেরিয়ে পেরিয়ে বারবার উথলে উঠছে জল। তার শাদা পাঞ্জাবির ফাঁকে বুকটা দেখা যাচ্ছিলো কিছুটা, সেটাও তুমুল লাল, ঝাপরে গম্ভীর হাওয়া দিয়ে কামার যেভাবে আগুনলাল করে তোলে লোহাপিণ্ড, সেরকম। আর শক্ত দুই হাত, যা ধরে রেখেছিলো বাইকের দুই পাশের স্টিয়ারিং, সেই আঙুলগুলিতেও যেন আগুন জ্বলছে, হাতের মাংস খুলে খুলে পড়ছে, যে হাত আমাকে আর একটা দিন বাড়িতে রাখতে পারেনি, কিন্তু হাতদুটি, আঙুলগুলি স্থির স্টিয়ারিংএ, ড্রাইভিংএ'ও সম্পূর্ণ নিখুঁত, কারণ আমাকে তার রাস্তাটা পার করে দিতেই হবে, যদি আমি তার বুকে লাথি মেরে তার মাথায় লাথি মেরে ফুটবল খেলতে খেলতেও চলে যাই- যেভাবেই হোক, নিরাপদে আমাকে একটা গাড়িতে তুলে দিতেই হবে, যেখান থেকে বাস ধরে আমি চলে যাবো ঢাকায়, আর ঢাকা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্যে বেরিয়ে যাবো খুব দূরে কোথাও, চিরচেনা শহর, দেশ থেকে দূরে- আর কখনোও ফেরা হবে কিনা জানিনা। সে টিকিটও কেটে দেবে, আর আমি গাড়িতে উঠবো। একটা পাহাড়কে রেখে যেভাবে চিরকালের জন্যে দূরে সরে যায় কোনো মেঘ, সেভাবে আমিও চলে যাবো, তাকে পেছনে রেখে, তার পা ভর দেবে মাটিতে, তার কোমর ভর দেবে পায়ে আর তার শরীর ভর দেবে সর্বত্র, কিন্তু কোথাও তার হৃদয় ভর দিতে পারবেনা, কারণ ইতিমধ্যে তার হৃদয়কে এতোটাই অত্যাচার করে ফেলেছি আমি।


যখন সে আমার পায়ে পড়ে কাঁদছিলো, আমি বলেছিলাম, আমি যাবোই। আমার মা জানতো আমি চলে যাবো, কারণ জীবনে আমার কথার ব্যতিক্রম হয়না। মা জানে তার পুত্রের জেদের কথা, স্বভাবের কথা। তবু সে ডাকছিলো, কাঁদছিলো, যেভাবে একটা সমগ্র বধ্যভূমি কাঁদে, সেভাবেই দুজনে কাঁদছিলো, যদি আমি থাকি, যদি আমি ক্ষমা করে দিই, ভুলে যাই। কিন্তু কোনো এক বর্বর শাসকের মতোই আমার হৃদয় গলেনি। আমি অভিশাপ দিলাম, তোমরা এর ফল ভোগ করবে। তোমাদের এজন্যে ভুগতে হবে। আজ আমি জানি আমি কী করেছি, কী করেছে আমার তুমুল ক্রোধ। আমি চলে গেছিলাম। এভাবেই চিরকাল বাবা আমার কাছে হেরেছে। আর এভাবেই বাবা কোনোদিনও আমার কাছে হারেনি। বাবা একজন বাবা হিসেবে বিজয়ী হয়েছে। 

আমি আমার বাবাকে নিয়ে গর্ব করি, কারণ আমার বাবা জেদি, রাগী, কিন্তু তার কাছে তার জেদ ও রাগের মূল্য তার পিতৃত্বের পরে। আর আমার বাবা কোনোদিন মারা যাবেনা, কারণ আমারও কোনোদিন মৃত্যু হবেনা। আমি অমর। কারণ আমি মানুষ নই, ব্রহ্মাণ্ডে আমার একটা অন্যরকম চলাচল আছে। আর যতোদিন আমি বেঁচে থাকবো, ততোদিন আমার মধ্যে আমার বাবাও বেঁচে থাকবেন। 

আমি মাকে নিয়ে বড়ো কম কথা বলি, কারণ আমিই মা, আমার মা'ই আমি। আমরা ব্যাতিক্রম কিছু নই। বাবার ক্ষেত্রে- সেটা সূক্ষ্মতম সত্যি হলেও, এখানে একটা রক্তক্ষয়ী টানাপোড়েন আছে।



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Jahidul Dewan - (Dhaka)
প্রকাশ ২৩/০৬/২০২১ ০৭:৫৩পি এম
Ali Sohel
প্রকাশ ২৩/০৬/২০২১ ১২:০৯পি এম
Md. Al-Amin Rana - (Dhaka)
প্রকাশ ২১/০৬/২০২১ ০১:১৫পি এম