About Us
Verified আই নিউজ বিডি ডেস্ক
প্রকাশ ০৬/০৬/২০২১ ০৪:৫০পি এম

শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্ভাবন গাঁজার কেক!

শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্ভাবন গাঁজার কেক! Ad Banner

এমন বিপদজনক মাদক দেশে এসে গেছে; মেধাবী শিক্ষার্থী দা দিয়ে নিজের গলা নিজে কোপ দিয়ে কেটে ফেলতে পারে! অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কিছুই জানতো না? যে নিজেকে কুপিয়ে হত্যা করতে পারে, সে নিজ পরিবারের জন্য, তথা শত মানুষের জন্য হুমকি। অবশ্য বাংলাদেশে মাদকাসক্তির সমস্যা যত প্রকট, সমাধানে জাতীয় উদ্যোগ সে তুলনায় একেবারেই কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর আগে অনেকে শুনেইনি লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড (এলএসডি) নামক নেশাও আছে! ফেসবুকে গ্রুপ ও আইডি খুলে পশ্চিমের ভয়ঙ্কর এ মাদকের বিকিকিনি চলছে বাংলাদেশে, যা এতদিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধারণার বাইরে ছিল বলে, ছিল নজরেরও বাইরে। একজন মেধাবী, উচ্ছল, প্রাণবন্ত ছাত্রের এরকম অকাল পরিণতি কিছুতেই মেনে নেয়ার মতো নয়। ছেলেটার বেশভূষা দেখলে বোঝার উপায় নেই, সে মাদকাসক্ত হতে পারে। এ যেন তরতাজা এক সপ্নকে, নেশা নামক জীবনবিধ্বংসি ভাইরাস, টগবগে রক্তের শ্রোত বইয়ে নিজকে নিজে মেরে ফেললো! অসহনীয় কষ্ট হচ্ছে ওই মায়ের জন্য যে তার ছেলেকে এ অবস্থায় দেখলো। কষ্ট হচ্ছে সেই বাবার জন্য যার কাঁধে সন্তানের লাশ! মাদকের শিকার হয়ে একজন মা তার সন্তান হারিয়েছেন; যে কোনো মায়ের জন্য এর চেয়ে কষ্টের কিছু নেই।

না জানি কতো স্বপ্ন বুকে লালন করেছিলো হাফিজের মা-বাবা। ছেলে-মেয়েগুলোও পর্বতসম স্বপ্ন বুকে লালন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকে। যে কোনোভাবেই হোক, মাদকাসক্ত হয়ে সে প্রতিভার মৃত্যুতে মা-বাবার বুকের আগুন ও হাহাকার পৃথিবীর সাগর-মহাসাগরের সমস্ত পানি ঢেলেও নেভানো যাবে কী? দুঃখজনক ও ভয়াবহ উদ্বেগের সংবাদ হলেও সত্যি- হেরোইন, ফেনসিডিল, কোকেন, আফিম, পিয়োট, মারিজুয়ানা, খাট, আইস, এনপিএস, ইয়াবার পর এলএসডি নামের ভয়ংকর মরণনেশা এসে গেছে বাংলাদেশেও। বিশেষজ্ঞরা এলএসডিকে দানবের সঙ্গে তুলনা করছেন।

তারা বলছেন, এই মাদক স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর। এলএসডি সেবনকারীর মধ্যে আত্মহনন অথবা অন্যকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে। এলএসডি সেবনকারীর মনে অলীক মায়াজাল বিস্তার করে বলে এর অন্য নাম ‘হ্যালুসিনোজিক ড্রাগ’। কখনো কখনো ‘হ্যালুসিনেট’ বা অলীক বস্তু প্রত্যক্ষ করা ছাড়াও মতিভ্রম হয়ে উদ্ভট কিছু অস্তিত্বে বিশ্বাস ও সেবনকারীর মধ্যে ভীতিকর অনুভ‚তি তৈরি করে। এ ধরনের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং কখনো কখনো অলীক বস্তু প্রত্যক্ষ করে। আবার কেউ বলেন, ভয়াবহতার বিচারে এলএসডি হলো ‘লাস্ট স্টেজ অব ড্রাগ’। অর্থাৎ, মাদক নেশার অন্তিম পর্বে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের মাদকসেবীরা। বলা বাহুল্য এ অবস্থা দেশের তরুণ সমাজের চরম সর্বনাশের ইঙ্গিত দেয়। এই ভয়ংকর মাদক সেবনে এতটাই বিভ্রম তৈরি হয় যে, সেবনকারী নিজেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী মনে করে। কিছুতেই কিছু হবে না, এমন বেপরোয়া মনোভাব থেকে সেবনকারী হয়ে ওঠে আত্মঘাতী। এক ধরনের কাল্পনিক বিভ্রম ঘটার সাথে সেবনকারী আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

সেবনকারী নিজেকে অনেক শক্তিশালী ভাবে। এটি সেবনের পর মনে হয় ট্রেনকে তারা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারবে। অনেকের  অতীত স্মৃতি জেগে ওঠে। বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ তার শৈশব ও কিশোরকালের বর্ণনা সম্বলিত আত্মজীবনীমূলক বই ‘আমার ছেলেবেলা’য় মজা করে লিখেছিলেন, এল‌এসডি গ্রহণে নাকি মাতৃগর্ভে থাকাকালীন কথাও মনে পড়ে। এলএসডি ইউরোপ আমেরিকার অভিভাবকদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। এ মাদক মানবদেহের সাধারণ চিন্তা ও অনুভূতিকে পাল্টে দেয়। মাদক গ্রহণকারীর ভেতরে অলীক বা কাল্পনিক ভাবনা বা অনুভবের সৃষ্টি করে। মাদকটি গ্রহণের পর সেবীরা মনে মনে ভাবতে থাকেন, যেন আকাশে উড়ছেন! মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এলএসডি মানুষকে দানব করে তোলে। মানুষের মস্তিস্কে রাসায়নিক পদার্থ বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে হ্যালুসিনেশন হয় ভয়াবহভাবে। সেবনকারী বহুতল ভবনের ছাদে থাকলে সে ছাদ আর নিচের মাটি সমান দেখবে। এছাড়া এমন দৃশ্য দেখে, যা বাস্তবে নেই। কাল্পনিক জগতে বাস করে।

বাস্তবতা বিন্দুমাত্র কাজ করে না সেবনকারীর মধ্যে। কখনো সেবনকারী যেটি দেখছে মূল বস্ত্রটি আসলে সেটা নয়। যেমন, সামনে একটি রশি পরে আছে কিংবা ঝুলে আছে, কিন্তু সেটাকে সাপ ভাববে এবং চোখে সাপ দেখবে। এ মাদক গ্রহণে হ্যালুসিনেশন যদি কোন কোন ব্যাক্তির জীবনে দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে প্রথমত মানসিক রোগী থেকে পাগল হয়ে যেতে পারে। তরুণদের জন্য শিক্ষণীয় হলো, হাফিজের বাবা-মায়ের মতো এরকম পরিস্থিতিতে যেনো কেউ কারো পিতা-মাতাকে না ফেলেন। আজ হাফিজতো ভিকটিম। তার জীবনের প্রতিটা অধ্যায় সবার জানার প্রয়োজন। হাফিজ কীভাবে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণহীন’ মাদকাসক্ত হয়ে উঠলো সেটাই এই মুহুর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

হাফিজ কোন জনবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠা অপরাধী নয়। সে আমাদেরই কারও না কারও ঘরের ছেলে। পুলিশের তদন্তে যে এলএসডির কথা জানা গেছে, তার প্রভাব কতটা সর্বগ্রাসী হতে পারে হাফিজের ঘটনা তার উদাহরণ। ব্যক্তির বেড়ে উঠার প্রক্রিয়ার পেছনে মানুষের আচার-আচরণ পরিবর্তন হয়ে থাকে। এজন্য বলা হয়, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ কীভাবে একজন মেধাবী, উচ্ছল, প্রাণবন্ত ছাত্রের এরকম অকাল পরিনতি, সেটা তরুণ সমাজের জানা উচিত। মনে রাখতে হবে, কেউ অপরাধী হয়ে জন্মায় না। আর একটা নির্দিষ্ট বয়সে যদি নিজেকে সংযত করা যায় তবে আশা করা যায়, অনেক তরুণ এভাবে ঝড়ে পরবেনা, নিজের গলায় নিজে গা দিয়ে কোপ মারবে না। আমাদের দেশে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বেশীরভাগ ছেলেমেয়েরাই তাদের অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর প্রায় সকল ছাত্রছাত্রী অপার স্বাধীনতা ভোগ করে। আর এই অপার স্বাধীনতাই অনেকের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

এজন্য তরুণদের নেশাখোর সহপাঠীদের এড়িয়ে চলতে হবে। নইলে হাফিজের মতো মা-বাবাকে শোক ও লজ্জার সাগরে ভাসিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। যারা নেশাগ্রস্ত তাদের পরিণতি করুণই হয়ে থাকে। হাফিজ হয়তো আগেই চলে গেছে। বেঁচে থাকলেও নেশাগ্রস্তরা পরিবারের জন্য বোঝা ও সমাজকে কলুষিত করে থাকে। ১৯৩৮ সালে সুইস রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান প্যারাসাইটিক ফাঙ্গাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এলএসডি আবিষ্কার করেন। এই অ্যাসিড বিভিন্ন দানাদার শস্যে থাকা এরগোট ছত্রাকে পাওয়া যায়।

আবিষ্কারের প্রথমদিকে এলএসডি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হতো। তবে ওষুধটি মস্তিষ্কের ক্ষতি করে বলে ১৯৬৮ সালে বিশ্বব্যাপী এলএসডি নিষিদ্ধ করা হয়। এটি এতই শক্তিশালী যে, এর ডোজগুলো সাধারণত মাইক্রোগ্রাম হিসেবে নেওয়া হয়। এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি  পদার্থ। যা পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়। এলএসডিকে ‘সাইকাডেলিক’ মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এলএসডি নামের এই মাদক উচ্চবিত্তদের জন্য।

দাম বিবেচনা করলে এটি সাধারণত উচ্চবিত্তের মাদক, কারণ প্রতি বøট বিক্রি হতো তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পর্যায়ে ক্রেতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এটি নেদারল্যান্ডস থেকে দেশে আনা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দুটি পেজের মাধ্যমে এ মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করা হতো। বর্তমান সময়ে এ মাদকের বেশির ভাগ গ্রাহকই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।’ যেখান থেকে লেখাপড়া শেষ করে দেশের প্রথম স্থানের নাগরিক হবে, যাকে সবাই স্যালুট দিবে। অথচ সে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের শিক্ষার্থীরা যখন এলএসডি, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক সেবনে জরিয়ে পরবে।

তাহলে এ জাতি কীভাবে উন্নতীর শিখরে পৌঁছবে? বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বরাবরই গবেষণায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করলেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাদক, সন্ত্রাসী, ক্যাডার, মারামারি ইত্যাদি সূচকে ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে! শিক্ষার্থীরা ইয়াবা, এলএসডি নিয়ে ব্যস্ত থাকলে তাদের দ্বারা কোনো আবিষ্কার, উদ্যোক্তা বা উদ্ভাবন আশা করা যায় কী? বরং যা হচ্ছে তা হলো, মাদকের উদ্যোক্তা! যার প্রমাণ, আটককৃত সাদমান জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ‘বেটার ব্রাওয়ারি অ্যান্ড বিওয়ন্ড’ নামে একটি ফেসবুক গ্রæপ পরিচালনা করতো সে। যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। সাদমান, আসহাব ও আদিব এই তিনজন মিলে ফেসবুক গ্রæপের মাধ্যমে এলএসডি বিক্রি করতো। এগুলোর মাধ্যমে তারা এলএসডি ও গাঁজার নির্যাস দিয়ে তৈরি এক ধরণের ‘গাঁজার কেক’ তৈরি করতো। এই ‘গাঁজার কেক’ নতুন উদ্ভাবন বলে দাবি তাদের। এই হলো অবস্থা! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা নতুন উদ্ভাবন হলো কথিত ‘গাঁজার কেক’। এছাড়া বেশিরভাগ মেধাবী ছাত্রছাত্রীর জীবন শেষ হয়ে যায় রাজনীতি নামক কালো থাবায়। ইতিমধ্যে এলএসডি বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

তারা হলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ছাত্র সাদমান সাকিব (রূপল) ও আসহাব ওয়াদুদ (তুর্জ) এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র আদিব আশরাফ। এরমধ্যে সাদমান সাকিব (রূপল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র বহিষ্কৃত ছাত্র। বর্তমানে তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ (শেষ বর্ষ) পড়ছেন। সা¤প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার খবর বেশ আলোচিত ছিলো। দেশে ইয়াবার প্রবেশ ঠেকাতে সরকার মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছিল। সরকারের মাদকবিরোধী অভিযান অল্পকিছু বিতর্কিত ঘটনা ছাড়া প্রশংসা পেয়েছিল। নতুন ভয়ংকর এই মাদক যাতে বিস্তার লাভ করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসন, ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। সবাইকে মাদকের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে, নাহলে মেধাবীরা মাদকের মাধ্যমে নিজের জীবন শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিবার ও সমাজকেও ধ্বংস করবে।


মোহাম্মদ আবু নোমান

abunoman1972@gmail.com


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ