About Us
Abdul Mazid - (Chattogram)
প্রকাশ ০৬/০৬/২০২১ ০৩:১১পি এম

সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ।

সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ। Ad Banner

"সাইবার নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ "

 It takes 20 years to build a reputation and few minutes of cyber - incident to ruin it . "

   - Stephane Nappo ( Vice President , Global Chief Information Security )

সাইবার অপরাধ ও সাইবার নিরাপত্তা বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক আলােচিত বিষয়। উইকিলিকস - এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস অ্যাসাঞ্জ ও সি আই এর তথ্য ফাঁসকারী আডওয়ার্ড স্নোডেনের কল্যাণে বিষয়টি এজেন্ডা হিসেবে বিশ্বরাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চলে আসে। তাছাড়া পানামা পপার্স কেলেংকারি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি এতে নতুন মাত্রা যােগ করে । ১২ মে ২০১৭ বিশ্বের ১৫০ টি দেশে একযােগে ব্যানসমওয়্যার দিয়ে ভয়াবহ সাইবার হামলা প্রযুক্তিপ্রেমীদের চরম আতঙ্কে ফেলে দিয়েছে। সাইবার অপরাধ একটি সামাজিক , রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক , জাতীয় , বৈশ্বিক ও নৈতিক অপরাধ। বাংলাদেশের মতাে তথ্যপ্রযুক্তিতে দ্রুত উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি চরম উদ্বেগের বিষয়।

১. সাইবারজগৎ কী ?

কম্পিউটার ও ইন্টারনেটকেন্দ্রিক তথ্যব্যবস্থা , যার মধ্যে কম্পিউটার সিস্টেম , সার্ভার , ওয়ার্ক স্টেশন , টার্মিনাল , স্টোরেজ মিডিয়া , কমিউনিকেশন ডিভাইস , নেটওয়ার্ক রিসাের্স থাকে এবং কম্পিউটার ডাটা আদান - প্রদানের প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকে , তাকেই বলা হয় সাইবারজগৎ ।

২. সাইবার অপরাধ :

কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কোনাে ব্যক্তিকে তার কাজে বিরত রাখা বা কোনাে কাজে বাধ্য করা, কোনাে জনগােষ্ঠীকে ভীতি প্রদর্শন করা, কোনাে কম্পিউটার সিস্টেমের ক্ষতি সাধন করা , কম্পিউটার সংক্রামক, দূষক বা ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে ক্ষতি করা, জালিয়াতি করা, প্রতারণা করা, সরাসরি কিংবা ছদ্মবেশে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক বা ভীতি সৃষ্টিসহ মিথ্যা তথ্য প্রেরণ করা , দেশের অখণ্ডতা, সংহতি ও জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা বা করার চেষ্টা করা - এসবই সাইবার অপরাধ। আবার পর্নোগ্রাফি, বিনা অনুমতিতে ব্যক্তিগত গােপনীয় অঙ্গের আলােকচিত্র বা ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ ও প্রচার, কোনাে ব্যক্তি বা গােষ্ঠীর শিশুপর্নো উৎপাদনে প্রবেশ, সংরক্ষণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে জড়িতরাও সাইবার অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে । মােট কথা, ইন্টারনেট অথবা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যে কোনাে অপরাধ করলে তাকেই সাইবার অপরাধ বলে।

৩ , সাইবার অপরাধের প্রকারভেদঃ

বিভিন্ন প্রকার সাইবার অপরাধের মধ্যে নিচের আলােচনায় প্রধান প্রধান কয়েকটি আলােচনা করা হলােঃ 

৩.১ . সাইবার সন্ত্রাসঃ সাইবার সন্ত্রাস হলাে সেই ব্যক্তি যে সরকার বা প্রশাসনকে একটি কম্পিউটারভিত্তিক আক্রমণ করে তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্য জানতে ভয় প্রদর্শন বা বাধ্য করে । যেমন- দাবি না মানলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হামলা করা হবে এমন সংবাদ প্রচার করা ।

৩.২ . সাইবার চাঁদাবাজি : সাইবার চাঁদাবাজি তখনই ঘটে যখন একটি ওয়েবসাইট , ই - মেইল বা কম্পিউটার সিস্টেম ক্ষতিকারক হ্যাকার দ্বারা বশীভূত হয়ে পুনরাবৃত্তিমূলক হামলার সম্মুখীন হয় । এ হ্যাকাররা হামলা বন্ধ করার জন্য এবং সুরক্ষা প্রদানের প্রস্তাব করার বিনিময়ে অর্থ দাবি করে। ফেডারেল ব্যুরাে অফ ইনভেস্টিগেশন অনুযায়ী , সাইবার চাঁদাবাজরা ক্রমবর্ধমানভাবে কর্পোরেট ওয়েবসাইট এবং নেটওয়ার্ক আক্রমণ করছে , তাদের কাজ করার ক্ষমতা পঙ্গু করে দিচ্ছে এবং তাদের সেবা পুনরুদ্ধার করতে অর্থ দাবি করছে । 

৩.৩ , সাইবার যুদ্ধ : মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ দাবি করেছে যে , বেশ কিছু সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে ভূ - কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনার সাইবার স্পেস একটি জাতীয় পর্যায়ের উদ্বেগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে । ২০০৭ সালে এস্তোনিয়ার পরিকাঠামােতে রাশিয়ান হ্যাকার দ্বারা হামলা এর অন্তর্ভুক্ত । ২০০৮ এর আগস্টে রাশিয়া আবার জর্জিয়ার বিরুদ্ধে একটি সমরিত ও সুসংগত কথিত সাইবার আক্রমণ চালায় । ভয়ের বিষয় এই যে , এ ধরনের আক্রমণ ভবিষ্যতে জাতি - রাষ্ট্রের মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে , সাইবারস্পেসের ধারণা বদলে দিতে পারে এবং যুদ্ধপরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে পারে ।

৪ পঞ্চম ডোমেইনের যুদ্ধ : সাইবারস্পেসে হামলাঃ

তথ্যপ্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে যে যুদ্ধ হবে তা যতটা না ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য, তার চেয়েও বেশি সাইবারজগতের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। বিশ্বে সাইবারস্পেসের যুদ্ধকে বলা হচ্ছে পঞ্চম ডােমেইনের যুদ্ধ।

অনেক দেশই স্থল, নৌ, বিমান ও আকাশ-যুদ্ধ মােকাবিলায় সক্ষমতা অর্জনের পর পঞ্চম ডােমেইন সাইবারস্পেসে যুদ্ধ মােকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ যুদ্ধে যে অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে তা পরমাণু বােমা, বন্দুক, গােলাবারুদ নয়। এ যুদ্ধের অস্ত্রকে বলা হচ্ছে লজিক বােমা। কেউ কেউ একে ডিজিটাল কন্টিনেন্টাল ব্যালাস্টিক মিসাইল হিসেবে আখ্যায়িত করছে। এ যুদ্ধে প্রযুক্তি পণ্যে প্রােগ্রামিং কোড সংযােজন, সফটওয়্যার টেম্পার ও ওয়েবসাইট হ্যাক করে মেধাস্বত্ব, তথ্য ও ডাটা চুরি এবং কম্পিউটার ইন্টারনেটচালিত ব্যবস্থাকে পুরােপুরি অচল করে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতিবছর সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিসাধিত হয়। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ম্যাকাফি ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মেধাস্বত্ব ও ব্যবসায়িক তথ্য চুরি, সাইবার অপরাধ, সেবা প্রদানে বাধা, হ্যাকিং ইত্যাদি কারণে বিশ্বে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন

মার্কিন ডলার। আর ২০১৪ সালে ইন্টল সিকিউরিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে সাইবার আক্রমণজনিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাইবারজগতে একটি প্রবাদ চালু রয়েছে, 'Why to send a bullet where you can send a byte.' এসব বিবেচনায় নিয়েই অনেক রাষ্ট্র পঞ্চম ডামেইন সাইবারজগতে যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এ জগতে ব্যবহৃত লজিক বােমার শক্তি প্রদর্শনের

প্রথম ঘটনাটি ঘটে রাশিয়ায় ১৯৮২ সালে।

৫. সাইবার অপরাধ ও বিশ্ব

১১ মে ২০১৭ বিশ্বজুড়ে একযােগে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে । র্যানসমওয়্যার হামলায় আক্রান্ত হয় সাইবার জগৎ । এ মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫০ টি দেশের কম্পিউটার ব্যবস্থায় হানা দেয় হ্যাকাররা । এ সাইবার হামলায় তিন লক্ষাধিক কম্পিউটার আক্রান্ত হয় । এরূপ বিশ্বব্যাপী আলােচিত আরাে কয়েকটি সাইবার হামলার বর্ণনা নিচে দেওয়া হলােঃ

৫১. উইকিলিকসঃ উইকিলিকস - এর মাধ্যমে যে তথ্যগুলাে প্রকাশিত হয়েছে তা পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক সাইবার অপরাধ হিসেবে কুখ্যাতি লাভ করে। বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ গােপন তারবার্তা প্রকাশ করা হয় উইকিলিকসের মাধ্যমে । যার ফলে বিশ্বব্যাপী আন্তঃরান্ত্রিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়ে । উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাও সাইবার অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে যুাজ্যে ইকুয়েডরের দূতাবাসে বন্দী জীবনযাপন করছেন।

৫.২ . মার্কিন গােয়েন্দা কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নােডেন : মার্কিন গােয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেন সিআইএ যে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফোনে আড়ি পাতে সে খবর ফাঁস করে দিয়ে আলােড়ন সৃষ্টি করে। তিনিও সাইবার অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে বর্তমান রাশিয়া অবস্থান করছেন।

৫.৩ . পানামা পেপার্স : ৩ এপ্রিল ২০১৬ ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনসাের্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট ( ICU ) গােপন সম্পদধারীদের আইনি সহায়তা ও সেবাদানকারী পানামার প্রতিষ্ঠান মােসাক ফনসেকার ১ কোটি ১৫ লাখ নথি ফাঁস করে । এক বলা হচ্ছে ' crime of the century ' বা শতাব্দী সবচেয়ে বড় অপরাধ । এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় তথ্য ফাঁসের ঘটনা পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ফলে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ড গুনলাগসন ৫ এপ্রিল ২০১৬ ব্যাপক বিক্ষোভ ও জনদাবির মুখে পদত্যাগ করেন।

২৮ জুলাই ২০১৭ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রধানমন্ত্রী পদে অযােগ্য ঘােষণা ও পদত্যাগের শিকার হন পাকিস্তানের মিয়া মােহাম্মদ নওয়াজ শরীফ ।

৫.৪ . CIH : ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল এ ভাইরাস প্রথম আঘাত করে , ফলে চেরনােবিলে মর্মান্তিক তেজস্ক্রিয় ঘটে । এজন্য এ তারিখে আঘাতকারী CIH- কে চেরনােবিল ভাইরাস বলে । এছাড়া এ ভাইরাস ২৬ এপ্রিল ১৯৯৯ বিশ্বব্যাপী কম্পিউটারে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করে।

.৫ . হিলারি ক্লিনটনের ই - মেইল হ্যাক বিশ্ব মােড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজিত প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের ই - মেইল ফাঁসের ঘটনায় সাইবার নিরাপত্তা ভােটের রাজনীতিতে নতুন ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ।

৬. সাইবারর অপরাধ ও বাংলাদেশ:

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ সুদৃঢ় অবস্থানে থাকলেও এটি একটি তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ যার ফলে তথ্য ও প্রযুক্তিখাতে এখনাে পরিপকৃ হয়ে ওঠেনি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৈদেশিক সফটওয়্যার এর উপর নির্ভরশীল হওয়ার ঘন ঘন সাইবার হামলার স্বীকার হচ্ছে। নিম্নে কয়েকটি সাইবার হামলার আলােচনা দেওয়া হলাে-

৬.১. বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬সালে যুক্তরাষট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার বা ১০ কোটি ডলার অর্থ হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ মুদ্রার ঘটনার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে পদত্যাগ করতে হয়।

৬.২. এটিএম. ডেবিট, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি: ২০১৬ সালে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকের পাইরেসি করা এটিএম, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে এটিএম বুথ থেকে প্রচুর লুটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে ৪ মার্চ ২০১৬ পুলিশ ১৪ ব্যক্তিকে আটক করে তাদের মধ্যে ১২ জন ছিল বিদেশি নাগরিক যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাইবার অপরাধের সাথে জড়িত।

৬.৩. বাংলাদেশে সংঘটিত আরও কয়েকটি সাইবার অপরাধ: ২০১২ সালে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে কক্সবাজারে বৌদ্ধ সম্প্রসায়ের ওপর হামলা করা হয়। সম্প্রতি কে বা কারা পূর্ণিমা শীলের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তার ছবিও টেলিফোন নম্বর দিয়ে তার নামে পন্নোগ্রাফির ফেসবুক পেজ খােলে। কয়েকদিন আগে ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার গুজব রটিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করা হয়। তা ছাড়া ফটোশপের মাধ্যমে এর ছবি ওর সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া ঘটনা ক্রমাগত ঘটছে। এমনকি ২০০৮ সালের দিকে র্যাবের ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়। এসব ঘটনা আমাদের সাইবার নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।


৭ সাইবার নিরাপত্তা ও বিশ্ব

লজিক বােমার এমন ভয়াবহ বিস্ফোরণের তিন দশক পর আরাে অত্যাধুনিক কম্পিউটার সিস্টেম ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডিভাইস ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হয় । বিদ্যুৎকেন্দ্র , শিক্ষা , স্বাস্থ্য , কৃষি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটার - ইন্টারনেট ব্যবহৃত হচ্ছে । বিভিন্ন দেশ কম্পিউটার ইন্টারনেটচালিত ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত ও নিরবচ্ছিন্ন করার জন্য এরই মধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে । যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশের ডিজিটাল অবকাঠমােকে ডিজিটাল সম্পদ ও স্ট্র্যাটেজিক ন্যাশনাল সিকিউরিটি হিসেবে ঘােষণা করেছেন । পেন্টাগনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির ( এনএফএ ) পরিচালকের নেতৃত্বে রয়েছে একটি সাইবার কমান্ড ( সাইবারকম ) । এ কমান্ডকে আমেরিকার মিলিটারি নেটওয়ার্কের প্রতিরক্ষায় পূর্ণ শক্তিতে নিয়ােজিত করেছে । একই সঙ্গে অন্য দেশের নেটওয়ার্ক আক্রমণের ম্যান্ডেট দেওয়া হয়েছে এ কমান্ডকে । চীন ' সাইবারস্পেস সার্বভৌমত্ব ' নাম দিয়ে পঞ্চবার্ষিক সাইবার নিরাপত্তা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে । আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও বসে নেই । নরেন্দ্র মােদি সরকার ২০১৪ সালে গৃহীত ডিজিটাল ইন্ডিয়া পরিকল্পনার আলােকে ন্যাশনাল সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা যুগােপযােগী করার উদ্যোগ নিয়েছে ।

৮ , সাইবার অপরাধ প্রতিরােধে করণীয় : বাংলাদেশে যেভাবে সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে তার লাগাম টেনে না ধরা গেলে নিকট ভবিষ্যতে তা আরও ভয়ানক আকার ধারণ করতে পারে । নিচে প্রতিকারের উপায়গুলাে নিয়ে আলােচনা করা হলাে :

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে কাউন্টার টেরােজিম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট ' গঠন করা হয়েছে , যা সাইবার অপরাধের বিষয়গুলাে দেখছে । তবে পুলিশ সাইবার অপরাধ বিষয়ক নতুন ইউনিট খােলা প্রয়ােজন । যার কাজ হবে সাইবার অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট আইনগুলােকে যথাযথ প্রয়ােগ করা । তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ ( সংশােধিত ২০১৩ ) -এর ৫৪.৫৬.৫৭ ধারা অনুযায়ী বর্তমানে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত । মলয় রায় দেওয়া হয় । ঘি ৫৭ ধারা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে যে , এ ধারায় মানুষের বাক - স্বাধীনতাকে অবহেলা কর । হয়েছে তাই ৫৭ ধারাকে সংশােধন করে সময়ের উপযােগী করে আইন তৈরি করা প্রয়ােজন । কে এইত করে নয় , এই প্রয়ােগের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে । ইতােমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় । ও বিদ্যালয় ক্রিমিনােলজি বা অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়েছে । ব্যাংকে দেশীয় সফ্টওয়্যার ব্যবহার করা উচিত যাতে বর্তমানে সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলাের পুনরাবৃত্তি এড়ানাে যায় । সইর ব্রাধ সংঘটিত হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর এরকম ঘটনা না ঘটতে পারে । এইন মেলা বাহিনী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদেরকে নিয়ে টার্সফোর্স গঠন করতে হবে , যাতে তারা সাইবার নিরাপত্তা উস্তু সর্বক্ষক ন রাখতে পারে । আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং আমাদের এন্টিভাইরাস ও সিকিউরিটি সফটওয়্যার সবসময় হালনাগাদ রাখতে পারে । সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট তৈরির লক্ষ্যে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা । গবেষণায় দেখা গেছে ৮০ % সাইবার অপরাধের সাথে জড়িত থাকে অফিসিয়াল কর্মকর্তা । এক্ষেত্রে সকল অফিস , ব্যাংক , বীমা প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানাে উচিত যাতে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদেরকে চিহ্নিত করে যথাযথ আইনের অধীনে এনে শাস্তির বস্থা করা যায় ।

১, সাইবার নিরাপত্তা সূচক ও বাংলাদেশ : সাইবার নিরাপত্তা সূচক ( সাইবার সিকিউরিটি ইনডেক্স- এনসিএসআই ) প্রকাশিত হয়েছে । সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ । আগের ৭৩ তম অবস্থান থেকে ৬৮ তম স্থানে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ । বাংলাদেশের পয়েন্ট ৪৪ দশমিক ১৬। তালিকায় স্থান পাওয়া দেশগুলাের মৌলিক সাইবার হামলা প্রতিরােধে প্রস্তুতি এবং সাইবার ঘটনা , অপরাধ ও বড় ধরনের সংকট ব্যবস্থাপনায় তৎপরতা মূল্যায়ন করে সূচকটি তৈরি করেছে এনসিএসআই । র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দেশ- গ্রিস এবং সবচেয়ে নিচে আছে- দক্ষিণ সুদান ।

১০, সাইবার নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপঃ

সাইবার অপরাধ বা সন্ত্রাস থেকে সাইবারজগৎকে নিরাপদ রাখার জন্যই বাংলাদেশেরও প্রতিরােধমূলক ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার। এ কারণেই সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ধাপে ধাপে যে অগ্রগতি বা উন্নতি বাংলাদেশে হচ্ছে , তার সঙ্গে সঙ্গে সাইবারজগতের নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে । তাই সরকার অত্যন্ত সক্রিয়ভাবেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ।


২০১৪ সালে তথ্য ও যােগাযােগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে তথ্য নিরাপত্তা পলিসি গাইডলাইন ' ও ' সাইবার সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি ’ প্রণয়ন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে ।আর সাইবার সিকিউরিটি স্ট্রাটেজিতে কিছু কৌশল ও Action Plan প্রণীত হয়েছে । এর মধ্যে তিনটি মুখ্য বিষয়ের উল্লেখ আছে । ( ১ ) একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ; ( ২ ) একটা স্বতন্ত্র সাইবার এজেন্সি গঠন এবং ( ৩ ) জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন । এখন সরকার সেই স্ট্রাটেজির অনুসরণে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের কাজটি করছে । এই আইনের মধ্যেই সাইবার এজেন্সি ও জাতীয় কাউন্সিল গঠনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রাখা হচ্ছে । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , তথ্য ও যােগাযােগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ - এর মধ্যে সাইবার অপরাধ দমনের কিছু বিষয় বিদ্যমান আছে । তবে তা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় ( এ আইনটি ২০০৯ ও ২০১৩ সালে আংশিক সংশােধন হয়েছে ) । এ জন্য শুধু সাইবার নিরাপত্তার জন্যই নতুন আইন করা হচ্ছে।সাইবার হামলা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে নতুন আইনের অধীনে সৃষ্টি করা হচ্ছে বাংলাদেশ সাইবার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ’ নামে বিশেষ টিম । প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিদেশে বসেও অপরাধ করলে এ দেশে বিচার করা যাবে । অপরাধী বিদেশি নাগরিক হলেও দেশে বিচার করার বিধান থাকছে এ আইনে । প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের তথ্য ও যােগাযােগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে । এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য পূরণে ‘ সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি ' নামে নতুন দপ্তর গঠন করা হবে । সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তাকেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হবে । এর মহাপরিচালক হিসেবে নিয়ােগ দেওয়া হবে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে , যিনি কারিগরিভাবে প্রশিক্ষিত কিংবা এ বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন হবেন । ইতােমধ্যে বাংলাদেশ এসেছে ‘ পে - পাল । নিকট ভবিষ্যতে আসবে ইবে , আমাজন , আলিবাবা । তাই অনলাইন বিপণনে আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে । যুগােপযােগী ও যথাযথ আইন প্রণয়ন করে সাইবার নিরাপত্তা বাড়ানাে উচিত । শিক্ষার্থীদের সাইবার ইথিক্স শেখানাে উচিত । যাতে রাজকোষ ও জনতার অর্থ নিরাপদ হয় । নিশ্চিত হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের নিরাপত্তা ।

" Passwords are like underwear : don't let people see it , change it very often , and you shouldn't share it with strangers . "

-Chris Pirillo

( Founder and ex - CEO of LockerGnome )



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ