About Us
M. R. Sumon
প্রকাশ ১২/০৫/২০২১ ০৬:০০পি এম

গফরগাঁওয়ের আজব কথা কেউ জানে কেউ জানে না!

গফরগাঁওয়ের আজব কথা কেউ জানে কেউ জানে না! Ad Banner

গফরগাঁওয়ের চর-আলগী গ্রামে ছিলেন ওসমান আলী। গাঁয়ের এবাড়ি-ওবাড়ি দিন মজুরী করে সে কোন মতে চালাত তার সংসার। সেই বৃটিশ আমলের কথা। একদা দেশত্যাগ করে সে চলে যায় আসাম। কালক্রমে কঠোর পরিশ্রম করে সে হয়ে উঠে বিরাট বিত্তশালী। সওদাগর। নিজে এই উপাধি দেননি, গ্রামবাসীও দেয়নি। খোদ সরকার দিয়েছিলো এই উপাধি।

দেশব্যাপী তখন অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ লেগেছে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করতে গিয়ে বন্দী হল অসংখ্য লোকজন। ক্রমে রাজবন্দীতে জেল ভর্তি হয়ে গেল। জেল খানায় দেখা দিল খাদ্য সংকট। বৃটিশ সরকার পড়লেন মহা ফ্যাসাদে। দেশের ডাকে ও সরকারের আবেদনে ওসমান আলী জেলখানায় খাদ্য সংকট দূরীকরনার্থে দান করলেন- দশ হাজার মন ধান।

বৃটিশ সরকার তাঁর উদারতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে উপাধি দিলেন সওদাগর। সওদাগর হয়েও তিনি ভুলতে পারেননি জন্মভূমির কথা। একদিন যে মাতৃভূমি থেকে চাকরের বেশে তিনি দেশ ত্যাগ করেছিলেন সেই মাতৃভূমিতে সওদাগরের বেশে একবার বেড়াতে এসেছিলেন। ওসমান সওদাগর আজ বেঁচে নেই; তাঁর অবদান-স্মৃতিগুলো রয়েছে মানুষের মুখে মুখে। জানাগেছে তাঁর সন্তান-সন্ততি ও নাত-নাতনিদের অনেকেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও একজন ব্যারিস্টার। 

গফরগাঁওয়ের মানুষ ছিলো ভোজন বিলাসী। দরিদ্র পরিবারের লোকজনেও সপ্তাহে অন্তত দু একদিন মাছ-মাংস খেত। গফরগাঁওয়ের বিভিন্ন শ্রেণির লোকজন খানা-পিনায় অহেতুক টাকা পয়সা ব্যয় করতে গিয়ে তারা তাদের জীবনে স্বচ্ছলতা আনতে পারেনি। স্বপ্ল পূঁজির ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সর্বশ্রেণির লোক এমনকি দিনমজুর-কুলি পর্যন্ত যে যতটুকু আয় উপার্জন করতো তার বেশির ভাগই খেয়ে-দেয়ে সাবার করে ফেলতো। এসব নানা কারণে গফরগাঁওয়ের লোকজনের তুলনায় বাইরের লোকজনদেরকে স্থানীয় এলাকায় পয়সা কড়ি উপার্জনে বেশ প্রসার দেখা যায়। 

শিলাসীর বড় টিয়ার বাপের নাম শুনেনি এমন লোক খুব কমই আছে। সে আমলে টিয়ার বাপের নাম শুনলে ক্ষমতাশীল লোকদেরও অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতো। লোকমুখে শুনা যায় যে, তিনি একাই একটি জীপ গাড়ি উত্তোলন করতে পারতেন। তার দুঃসাহসিক একটা ঘটনা- একবার গফরগাঁওয়ের জমিদারের এক নেপালী দারোয়ান স্থানীয় বাজারে একদিন প্রজাদের সামনে লাঠি ঘুরিয়ে নর্ত্তন-কুর্দন করছিলো এমন সময় টিয়ার বাপ ঘটনাস্থলে গিয়ে হুংকার ছেড়ে নেপালী দারোয়ানকে এক হাতে উপরে তুলে দশ হাত দূরে ছুড়ে মেরেছিলো। নদীর স্রোত এবং ঝড়ের মত কোন বাঁধার সম্মুখীন হলেই বড় টিয়ার বাপ ভয়ংকর এবং প্রচণ্ডরূপ ধারণ করতেন।

বাইরের লোকজনদের হয়তবা অনেকের অজানা ব্যবহারিক জীবনে টিয়ার বাপ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। তিনি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েদেরকেও 'আপনি' বলে সম্বোধন করতেন।  নিধিয়ার চরে 'মড়ল' নামে এক নরপর্বত ছিল। অন্যান্যদের তুলনায় তার দেহের বিচার করলে তাকে নরপর্বত বলাটা অসমীচীন  হয় না। লম্বায় ১৮ ইঞ্চি ছিলো তার পায়ের জুতা। হাডুডু খেলায় সে যখন ডাক দিত তখন দু'একজন তাকে ধরলে- সে নড়তোনা। যখন ছয় সাত জনে মিলে ধরতো তখন সে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলে আসতো। খেলোয়াড়গুলো তার দেহে বাদুরের মত ঝুলে থাকত। একবার বাজারে বাজি রেখে সে আড়াই টিন মোয়া খেয়ে বিজয়ী হয়েছিলো।

পুরো রূপকথার গল্প মনে হচ্ছে তাইনা কিন্তু এগুলো সবই বাস্তব ঘটনা।  চারমছলন্দ গ্রামে নছু আহন নামে গফরগাঁওয়ে একজন পেশাধারী গুণ্ডা ছিলো। সে এমনি শক্তিধর ছিল যে, ডান হাতে লাঠি ধরে অন্যকে আঘাত করেল ঘাড় ছিঁড়ে যেত। তাই তার বাবা তাকে বলেছিল বাঁ হাতে লাঠি ধরতে।  রওনা এলাকায় ইসমাইল নামে জনৈক ব্যক্তি তার ভাইয়ের সাথে জমি নিয়ে মামলা করতো। দু'ভাইয়ের ছিল বিরাট লাঠিয়াল দল। জমির দখল নিয়ে প্রায়ই দু'দলে দা-বল্লম নিয়ে দাঙ্গা হত। মামলার তারিখের দিন দু'ভাই এক সাথে বসে খাবার খেয়ে, একই সাথে একই গাড়িতে চড়ে ময়মনসিংহে যেত।

কেউ জিজ্ঞেস করলে দু'ভাই একই রকম জওয়াব দিতো- 'বাড়ীতে ভাই মাঠে লড়াই'।  ঘুষ চাইলো কেন? এটা কোন ভদ্রলোকের কথা নয়। সৎ, ইনছানি কোন ব্যক্তিরও কথা নয়। গফরগাঁওয়ের এক দুর্ধর্ষ ডাকাতের কথা। কোন এক স্থানে সংঘটিত ডাকাতিতে ধৃত হয়ে একদা তাকে হাজির করা হয়েছিল ময়মনসিংহ কোর্টে। কয়েদীদের গাড়িতে উঠবার প্রাক্কালে কোর্টের কিছু দূরে হঠাৎ শুনা গেল তার তর্জন-গর্জন। দূর থেকেও তার গলাবাজি শুনা যাচ্ছিলো। "ডাকাতি করছি, অন্যায় করছি-শাস্তি হউক কিন্তু শালার পুত ঘুষ চাইলো কেন?"। তার তর্জন-গর্জন শুনে মুহূর্তে লোকজনের ভিড় জমে উঠল সেখানে। তার রাগের হেতু শুনে ত সবাই অবাক। পুলিশ তার মামলার তদবিরের জন্য ঘুষ চেয়েছিল।  গফরগাঁওয়ের রূপা মিয়াঁর নাম কে না জানে? বাইরের লোকজন তার নাম শুনলে তখনকার সময়ে শিউরে উঠত। গফরগাঁওয়ের কথা ও কাহিনী বইয়ের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে সেই রূপা মিয়ার কাছে গেলে- শুভেচ্ছা জানিয়ে রূপা মিয়াঁ বলেছিল- "এলাকার পুরানা কথাবার্তা গুলা লোপ পাইয়া যাইতাছে।

হেইগুলি আপনারা রেকর্ড করতাছেন- এটা খুব ভালো কাজ।" বিচিত্র জীবনের বিচিত্র কাহিনীর বর্ণনার এক পর্যায়ে রূপা মিয়াঁ বললেন- হয়তবা জীবনে ভালো কিছু করতে পারিনি, কোনও হয়তবা আমাদের নেই; কিন্তু মাতা-পিতাকে আমরা যমের-মত ভয় করতাম। জ্ঞানী- গুণী, ময়-মুরুব্বীদের সাথে বেয়াদবি করব তো দূরের কথা রাস্তায় কিংবা কোথাও তাদেরকে দেখলে সেলাম ঠুকে দশহাত দূর দিয়ে চলে যেতাম। অনেক ক্ষেত্রে দুঃসাহসের পরিচয় দেয়েছি। কিন্তু তাই বলে চুরি ডাকাতের রেকর্ড কেউ দেখাতে পারবে না। বরঞ্চ চোর ডাকাতেরা ভয়ে আশেপাশে চুরি-ডাকাতি করতেই সাহসী হত না। রূপা মিয়াঁ তার এলাকারও একজন মাতব্বর ছিল। ছিল ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য।   গফরগাঁওয়ের সব ঘটনা, সব কাজের পেছনে কিছু না কিছু বিচিত্র কাহিনী জড়িয়ে থাকে।

এই অঞ্চলে ছিলো আজব এক চোর। এই চোরেরও ছিলো তেমনি এক বিচিত্র কাহিনী যা শুনলে যে কেউ মনে করবে ইহা আরব্য উপন্যাসের আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের কাহিনীর মতই নতুন আর এক চোরের কাহিনী। তার নাম মেনতু চোরা। মেনতু চোরাকে চিনে না এমন মানুষ এ অঞ্চলে নেই। রসিক প্রিয় মানুষেরা চোরকে ডাকে 'নিশি কুটুম্ব' কেননা অনেক কষ্ট করে নিশি বেলায় গৃহ স্বামীর ঘুমের ফাঁকে বেড়া কেটে কিংবা সিদ কেটে অতি সন্তর্পণে কারো ঘরের অতিথি হয়ে চৌর্যবৃত্তি সমাধা করে তারা। কিন্তু মেনতু চোরাকে 'নিশি কুটুম্ব' বলা চলে না কেননা সে গৃহ স্বামীর ঘুমের ফাঁকে কিংবা আড়ালে আবডালে অন্য কুটুম্বদের মতো লুকিয়ে কারো ঘরে দাওয়াত নিত না। সে বলে কয়ে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় চুরি করতো। মেনতু চোরার যখনি টাকা পয়সার প্রয়োজন পড়তো সে স্থানীয় ব্যবসায়ী, দোকানদার কিংবা অবস্থাপন্ন লোকের কাছে গিয়ে হাত পাততো। কেউ কেউ টাকা পয়সা দিত। অনেকে তাকে নিরাশও করতো। কিন্তু যে তাকে নিরাশ করতো চোখের পলকে ঐ মুহূর্তেই তার টাকা পয়সা কিংবা কিছু না কিছু চুরি হয়ে যেত।

গফরগাঁও বাজারের জনৈক প্রবীণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জানা গেছে- একবার মেনতু চোরা গফরগাঁও বাজার থেকে একটি কাঁসার থালা চুরি করে ঐদিনই ঐ বাজারেই দুই এক ঘণ্টার মধ্যে দশ জনের কাছে সেই থালা বিক্রি করে কৌশলে দশ জনের কাছ থেকেই চুরি করে নিয়ে আসে। মেনতু চোরা কদাচিৎ ধরা পড়তো। ধরা পড়ার পর মানুষ যখন মারপিট শুরু করতো তখন সে সহাস্য বদনে বলতো- "তোমাদের লজ্জা শরম নাই? লোকজনের সম্মুখে ঠাট্টা-তামাসা শুরু করছো; যেখানে সেখানে খেয়াল তামাসা করলে হয় নাকি?" সে সময় গফরগাঁওয়ে ছিলেন এক দূরদর্শী অভিজ্ঞ দারোগা।

দারোগা মেনতু চোরাকে বলল-'মেনতু তুই চুরি ছেড়ে দে, আমি তোকে সৎ পথে উপার্জনের পথ ধরিয়ে দেব।" উত্তরে মেনতু চোরা বলে- 'স্যার আমিতো ছেড়ে দিতে চাই কিন্তু  ঐ অবস্থাপন্ন মানুষগুলো বুঝলো না। মাঝে মাঝে আমারে কিছু সাহায্য করলে এতদিন এই বদ কাজটা আস্তে আস্তে ছেড়ে দিতাম।" মেনতু চোরা দারোগাকে উলটা প্রশ্ন করে- "স্যার আপানার দারোগাগিরি জীবনে আমার মত এমন চোর কী দেখছেন যে সাহায্য চেয়ে নেয়?" দারোগা সাহেব ত মেনতু চোরার কথা শুনে একেবারে অবাক।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ