About Us
Rejaul karim
প্রকাশ ১১/০৫/২০২১ ০১:৩৫পি এম

পশ্চিম বাংলার কী হলো?

পশ্চিম বাংলার কী হলো? Ad Banner

 বাংলা তথা পশ্চিম বাংলা নিয়ে আমার গর্ব হতো। কেননা বাংলার রাজধানী কলকাতা ছিল ভারতবর্ষের রাজধানী (১৭৫৭-১৯১১)। কলকাতাকে কেন্দ্র করেই বাংলায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। শুধু বাংলা কেন সারা ভারতেই আধুনিকতা ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের প্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতার হিন্দু কলেজ, যার বর্তমান নাম প্রেসিডেন্সি কলেজ। হিন্দু কলেজ,  এ কলেজের শিক্ষক ডিরোজিও ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে গড়ে উঠে ইয়াং বেঙ্গল মুভমেন্ট, শুরু হতে থাকে বাংলার জাগরণ। এ বাংলায় জন্ম নেয় সমাজসংস্কারক, ধর্মসংস্কারক, যুক্তিবাদী, আধুনিক পুরুষ রাজা রামমোহন রায়, মানবতার অবতার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মহামানব, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু (জন্ম পূর্ব বঙ্গের বিক্রমপুরে, কর্ম কলকাতা) প্রমুখ, যাঁদের সৃষ্টিকর্মে বাংলা পায় বিশ্ব দরবারে স্থান। চিন্তা-চেতনা, যুক্তি, দর্শন, লেখাপড়া, রাজনীতি ও সমাজসংস্কারে বাংলা তথা কলকাতা  ছিল ভারতের অনুকরণীয় আদর্শ ও গর্বের স্থান। কলকাতার চেতনাই ভারতে ছড়িয়ে পড়ত।

তখন বলা হতো ‘What Bengal thinks today, the rest of India thinks tomorrow’। এক কথায় কলকাতা ভারতকে পথ দেখাত। কিন্তু আজ সে কলকাতা, সে পশ্চিম বাংলার কী চেহারা! হিংসা, সহিংসতা, হানাহানি, মারামারি, খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ। তাও বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নিজের পছন্দের দল বা প্রার্থীকে ভোট দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার। সে অধিকার আজ পশ্চিম বাংলায় কোথায়? আমার পছন্দের দল, প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার জন্য সহিংসতার আশ্রয় নিতে হবে এমন কর্মকাণ্ড তো অসভ্য, বর্বর, জঙ্গলিদের কাজ। পশ্চিম বাংলা কি তাহলে জঙ্গলি হয়ে গেল? পাণ্ডাদের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই তারা এসব করছে। বাংলাদেশে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিজয়ীপক্ষ বিজিতপক্ষের উপর যেভাবে সহিংস তাণ্ডব চালিয়েছিল পশ্চিম বাংলা যেন তাকেও হার মানাল। ভোট দেওয়া না দেওয়ার জন্য যদি হিংসার শিকার হতে হয়, তখন মনে হয় এ গণতন্ত্র না থাকাই ভালো। আমার বোধোদয় হয় না, পশ্চিম বাংলা আজ কেমন করে এমন হলো? জন্মাবধি গণতন্ত্রের চর্চা করে তারা কী শিখল? একজন নেতা একটা দেশের আদর্শ, শিক্ষক, গুরু, বন্ধু। তাঁকে অনুসরণ করে দেশের মানুষ আদর্শ শিখবে, আলোকিত হবে, উন্নয়ন করবে। যেটা পশ্চিম বাংলার পূর্ববর্তী শাসকদের কম বেশি ছিল। অথচ মারদাঙ্গা যার পেশা সে আজ চলকের আসনে। সারা জীবন যে মারদাঙ্গা করেছে। মারদাঙ্গা করেই যার উত্থান। পুলিশের সাথে মারামারি, পার্লামেন্টে মারামারি, শিল্পায়নের জন্য সিপিএম সরকার কর্তৃক নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতায় কৃষকদের উস্কে দেওয়া, রক্তপাত ঘটানো প্রভৃতি হিংসাত্মক ঘটনায় পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা উৎসাহিত হলো, আশার আলো দেখতে পেল।

কেননা হিন্দুরা তো ভীতু, কাপুরুষ। তাদের জয়ের ইতিহাস নেই, পরাজয়ের ইতিহাস আছে, মার খাওয়ার ইতিহাস আছে, মার দেওয়ার ইতিহাস নেই। বখতিয়ার খলজি ১৭ জন সৈন্য নিয়ে বাংলা দখল করে ফেলল। লক্ষণ সেন ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারত আক্রমণ করে। প্রতিবারই ভারত থেকে সোনা গহনা, ধন সম্পদ, সুন্দর নারী নিয়ে গজনি ফিরে যেত। ৭১২ সালে মুহম্মদ বিন কাসিম রাজা দাহিরের কাছ থেকে সিন্ধুর দখল নেয়। ১১৯২ সালে মুহম্মদ ঘুরি পৃথ্বিরাজের কাছ থেকে ভারতের দখল নেয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার ভারত দখল করেছিল। তাই হিন্দুরা কোন এক নেত্রীর মারপিট দেখে আশান্বিত হয়, তাকে দিয়ে অতীত পরাজয়ের গ্লানি দূরীভূত করার স্বপ্নে বিভোর হয়, কত জনমের সাধনায় ভগবান মিলিয়ে দিয়েছে এমন পতিতপাবন। আর মুসলমানরা তাকে পছন্দ করে। কারণ সেই শয়তানের শাসন (কমিউনিস্ট শাসন) থেকে মুসলমানদের মুক্ত করতে পারে। তাই হিন্দু মুসলমান মিলে তাকে বিপুল ভোটে বার বার নেতা নির্বাচিত করে। সে সাথে চলে মারদাঙ্গার অনুশীলন। আমার ধারণা ছিল হিন্দুদের সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও অর্থনীতির অনুশীলন করা তাদের সহজাত প্রবৃত্তি, মারদাঙ্গা নয়। মারদাঙ্গা হলো মহান জাতির সহজাত প্রবৃত্তি। এখন দেখা যাচ্ছে হিন্দুরাও মহান জাতির মহান পেশা রপ্ত করছে। সভ্যতা ভব্যতা, নম্রতা, বিনয় লুপ্ত হচ্ছে।  আমি মাঝে মধ্যে কলকাতা নিউজ টাইম টিভির টকশো দেখি।

তা কি দেখা যায় বা শোনা যায়? একজনের মধ্যে আরেকজন কথা বলে, কারো কথাই শেষ করতে দেয় না, কারো কথা কেউ শুনে না, একে মাছ বাজার বললে ভুল হবে, যেন ঝগড়ার বাজার। সঞ্চালকও ঐ রকম। চ্যানেলটা খুললেই আমার স্ত্রী বলে ওটা বন্ধ কর। তখন ভাবি রবীন্দ্রনাথের কলকাতার আজ এ অবস্থা। ভব্যতা সভ্যতা শিষ্টাচার সব মহতী নেত্রীর আদর্শে নতুন রূপ পেয়েছে। বৈরিতা বিরোধিতা, ওদ্ধত অহঙ্কার যার আদর্শ। সে আদর্শে আদর্শান্বিত হওয়ার জন্য মানুষ উৎগ্রীব হয়ে পড়ছে। পশ্চিম বাংলার একমাত্র প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সাথেও মহতী নেত্রীর বৈরিতা। তার ভেটোর জন্য দিল্লি সরকার তিস্তা চুক্তি করতে পারছে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং তিস্তা চুক্তি করতে ঢাকায় এসেও মহতী নেত্রীর ভেটোর জন্য চুক্তি করতে পারলেন না। নরেন্দ্র মোদিও পারছেন না। অথচ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু গঙ্গা চুক্তিতে হস্ত প্রসারিত করে দেন। তাঁর সহযোগিতার কারণে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি হয়, ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬।   

পশ্চিম বাংলায় আশানুরূপ কোন উন্নয়ন নেই, শিল্পায়ন নেই, কর্মসংস্থান নেই। উন্নয়নের পরিবর্তে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বেশ অর্থ ব্যয় করা হয় এবং তাতে দল ভারী হয়, মস্তান পোষ্য হয়। পশ্চিম বঙ্গের সাথে ভারতের আরো চারটি প্রদেশে নির্বাচন হয়। সে সব জায়গায় তো পশ্চিম বঙ্গের ন্যায় এমন হিংসার ঘটনা শুনতে পাওয়া যায় না। আসামে তো বিজেপি ক্ষমতায় ছিল, এবারও এল। কৈ, সেখানো তো হিংসার খবর শোনা যায়নি। অথচ মানুষ বিজেপিকে ভয় পায়। আশির দশকে আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট শাসন ছিল। আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য পুঁজিপতিরা ও মুসলিম ধার্মিকেরা আফগানিস্তান থেকে কমিউনিস্ট শাসন উৎখাতের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল। কেননা পুঁজিবাদ হচ্ছে আল্লাহর শাসন। আল্লাহ হচ্ছে সর্বশক্তিমান। তাঁর ইশারায় ইচ্ছায় সব কিছু হয়। ধনী গরিব, ধন বৈষম্য তো স্রষ্টার সৃষ্টি। স্রষ্টা ইচ্ছা করলেই তো সব সমান করতে পারেন। তিনি করেননি। যেহেতু তিনি সমতা পছন্দ করেন না, তাই যারা সাম্য সমতার কথা বলেন তারা শয়তানের অনুসারী।

সে অর্থে কমিউনিস্টরা শয়তান আর তাদের শাসন শয়তানের শাসন। তাই শয়তানের শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে পুঁজিপতি ও ধার্মিকেরা এক হলো। আমেরিকার অর্থ, অস্ত্র আর মুসলিম ধার্মিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠল বিভিন্ন মহান সংগঠন- তালেবান, লাদেন, আল কায়েদা প্রভৃতি। এক পর্যায়ে আফগানিস্তান থেকে শয়তানের শাসন বিতাড়িত হলো। ফিরে এল আল্লাহর শাসন, জান্নাতি শাসন। আহ! আফগানিস্তানে কী শান্তি! তাই স্বর্গীয় শান্তির সুবাতাস পেতে পশ্চিম বঙ্গবাসী শয়তানের শাসনকে উৎখাত করে মহতী নেত্রীর নেতৃত্বে দেবদূতের শাসন ফিরিয়ে আনে। নির্বাচনের সময় শান্তির সুবাতাস উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কখনো ভুল করে না। এ কথা সর্বদা সঠিক নয়। যেমন ১৯৩৩ সালে জার্মানির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ভোট দিয়ে  হিটলারকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ভাইয়েরা স্বাধীন বাংলা না চেয়ে পাকিস্তান চেয়ে নিল। তার জন্য কত লড়াই সংগ্রাম, দাঙ্গা করল।

তারাই আবার ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ লোকের রক্ত ক্ষয় করে পাকিস্তানকে তালাক দিল। (এ বিষয়ে বাঙালির অদূরদর্শিতা নিয়ে আমি ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অভিন্ন সত্তা’ গ্রন্থে অনেক লিখেছি।  পশ্চিম বঙ্গে আরেকটা বিষয় বেশ অবাক লাগে। তাহলো টিভিতে আজগুবি বিজ্ঞাপন প্রচার। যেমন ধনলক্ষ্ণী যন্ত্র, ভাগ্যলক্ষ্ণী যন্ত্র। এ যন্ত্র ব্যবহারের পর কারো অসুখ ভালো হয়ে গেছে, কেউ মামলার রায় পেয়েছে, কারো চাকরি হয়েছে, কেউ পরীক্ষায় ভালো করেছে ইত্যাদি। এ সব মিথ্যা, গাজাখুরি, অবৈজ্ঞানিক গল্প কাহিনী কিভাবে প্রকাশ্যে তাও টিভি চ্যানেলে চলতে পারে তা ভাবতে অবাক লাগে। উনিশ শতকে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে সব কুপ্রথা, অন্ধত্ব, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আলো পথ দেখিছিলেন তা কি আজ লুপ্ত হয়ে গেল? তবে মহতী নেত্রীর একটা স্লোগান বেশ ভালো লাগে, তাহলো ‘জয় বাংলা’। 


রেজাউল করিম: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।

ইমেইল: rejaulkarim1975@gmail.com      


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ