About Us
M. R. Sumon
প্রকাশ ০৮/০৫/২০২১ ০৭:২০পি এম

১৬০ তম জন্মবার্ষিকীতে পিরালি ব্রাহ্মণ রবীন্দ্রনাথ কুশারীর জীবনবৃত্তান্ত!

১৬০ তম জন্মবার্ষিকীতে পিরালি ব্রাহ্মণ রবীন্দ্রনাথ কুশারীর জীবনবৃত্তান্ত! Ad Banner

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ধনাঢ্য, সংস্কৃতিবান, পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম তারিখঃ ৭ মে ১৮৬১ (২৫ বৈশাখ ১২৬৮), নতুন পঞ্জিকা অনুযায়ী ৮ মে, ২৫ বৈশাখ। এই সমস্যার জন্য দু'দিন ধরেই কবিগুরুর জন্মদিন উদযাপন হচ্ছে। এবার ছিলো কবিগুরুর ১৬০তম জন্মবার্ষিকী।

কবিগুরুর পরিবারটির পদবি ছিল কুশারী। যারা বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলা থেকে আগত। পঞ্চানন ও শুকদেব নামে দু’জন কুশারী গোবিন্দপুরে এসে বসতি গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে রূপান্তরিত কলকাতা শহরের একটি গ্রাম। কলকাতা, গোবিন্দপুর ও সূতানটি এই তিনটি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠে আজকের শুরুর কলকাতা। সে যাই হোক কুশারীরা জাহাজ ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েন। ব্রাহ্মণ হবার কারণে প্রতিবেশীরা তাদের ঠাকুরমশাই বলে ডাকতেন। ব্রিটিশরা দেশের ক্ষমতা অধিগ্রহণের পর “ঠাকুর” তাদের পারিবারিক পদবীতে রূপান্তরিত হয়। ইংরেজদের সুবিধার্থে তা ‘Tagore’ বা ‘ট্যাগোর’ এ রূপান্তরিত হয়।

কবিগুরু একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাকে বাংলাভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থঃ ৫৬টি, গীতিপুস্তকঃ ৪টি; নাটকঃ ২৯ টি; কাব্যনাট্যঃ ১৯টি, উপন্যাস ১২টি; প্রবন্ধ ৩৬ টি; ভ্রমণকাহিনী ৯টি; ছোটগল্প ১১৯টি; চিঠিপত্রের বই ১৩টি; গান ২২৩২ টি; এবং প্রায় ২ হাজার চিত্রাবলী।

রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে 'রবীন্দ্র রচনাবলী' নামে প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় একক কৃতিত্বে তিনি বাংলা সাহিত্য সম্ভার পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালী হিসেবে লাভ করেন নোবেল পুরস্কার এবং একই সালের ২৬ শে ডিসেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি. লিট উপাধি প্রদান করে। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ( লিখেছিলেন ১৯০৮-০৯ সালে, প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯১০ সালে)এর ইংরেজি অনুবাদ song offerings (প্রকাশিত হয় ১৯১২ সালে, অনুবাদ করেছিলেন কবি নিজে যার ভূমিকা লিখেছিলেন ইংরেজ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস) এর জন্য। শান্তিনিকেতন থেকে ২০০৪ সালে এই নোবেল পদক চুরি হয়ে যায়। এই ২০০৪ সালেই বিবিসির বাংলা বিভাগ পরিচালিত জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করেন। ব্রিটিশ সরকার ১৯১৫ সালে নাইটহুড(স্যার) উপাধি প্রদান করেন কিন্তু পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১৯১৯ সালের এপ্রিলে তা বর্জন করেন।(হত্যাকাণ্ড হয়েছিলো ১৩/০৪/১৯১৯)।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডি. লিট উপাধি দেয় ১৯৩৬ সালে আর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ডি. লিট দেয় ১৯৪০ সালের ৭ আগস্ট।

তিনি নিজে আইন বিষয়ে পড়ালেখা করতে ইংল্যান্ডে গেলেও ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমেরিকার আরবানায় ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান কৃষি ও পশুপালন বিদ্যায় প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে। এবং প্রথম বাঙালি হিসেবে গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন  শান্তিনিকেতনে ১৯০১ সালে 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম' নামে একটি আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে যা ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।

কবিগুরু ৮ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেন। কবিতাটির নাম ছিলো- 'হিন্দুমেলার উপহার' যা 'অমৃতবাজার' পত্রিকায় ১৮৭৪ সালে, ১৩ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়। একই সালে প্রকাশিত হয় প্রথম ছোটগল্প- 'ভিখারিনী' এবং এর চার বছর পর ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'কবি-কাহিনী'। একই সালে(১৮৭৮ সাল) ইংরেজি সাহিত্য পাঠের উদ্দেশ্যে প্রথম ইংল্যান্ডে যান। প্রথম প্রকাশিত নাটক 'বাল্মীকি প্রতিভা'(১৮৮১); উপন্যাস- 'বৌঠাকুরাণীর হাট'(১৮৮৩); (কিন্তু প্রথম লেখা উপন্যাস 'করুণা' যা অপ্রকাশিত!); প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থঃ বিবিধপ্রসঙ্গ(১৮৮৩) এবং প্রথম সংকলন- 'চয়নিকা'(১৯০৯)।'গীতাঞ্জলি'র জন্য নোবেল পদক পেলেও রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কাব্যসংকলন বলা হয় 'সঞ্চয়িতা'কে। কবিগুরুর আলোড়ন সৃষ্টিকারী 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' কবিতাটি প্রভাতসঙ্গীত(১৮৮৩) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। কবি গুরুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম- 'জীবনস্মৃতি'(১৯১২)। মৃত্যুর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- 'রবীন্দ্রনাথের ছড়া'(১৯৪১) ও  'শেষ লেখা'(১৯৪১)।

কবিগুরু ৯ ডিসেম্বর ১৮৮৩ সালে জোড়াসাঁকোর জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীকে বিয়ে করেন। তখন ভবতারিণীর বয়স ৮ কি ৯ আর রবির বয়স ছিল ২২ বছর ৭ মাস ২দিন। বিয়ের পর ভবতারিণীর নাম পরিবর্তন করে রাখেন মৃণালিনী দেবী। উল্লেখ বিয়ের দিন রবীন্দ্রনাথের বড় বোন সৌদামিনী দেবীর স্বামী সারদা প্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় শিলাইদহে মারা যান।ফলেপাত্রপক্ষ বিয়ের জন্য পাত্রীর পিত্রালয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে কন্যাহ্বানের নিয়মানুযায়ী পাত্রীকে পাত্রের বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করা হয়। দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্মের প্রাণপুরুষ হলেও তাঁর পুত্র রবীন্দ্রনাথের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল খুলনা অঞ্চলের হিন্দু বিবাহ রীতি অনুসারে। এমনটি হওয়ার কারণ অনুমান করা হয়ে থাকে ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস ছিল খুলনা অঞ্চলে এবং পরবর্তীকালে ঠাকুর পরিবারের অধিকাংশ বধূরা খুলনা-যশোর অঞ্চলের মেয়ে ছিলেন।

'ছিন্নপত্র' কবির চিঠির সমাহার যা লিখেছিলেন ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে(১৯১২)। ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেন প্রমথ চৌধুরী। পরবর্তীতে নাম হয় ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। আরেক ভাতিজী আশালতাকে বিয়ে করেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুল আশালতার নাম পালটে রাখেন প্রমিলা দেবী। (পরিবার প্রদত্ত নাম আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে দোলোনা সংক্ষেপে দুলী। প্রমীলা সেনগুপ্তা বাঙলা ১৩১৫ সালের ২৭ বৈশাখ (১০ মে ১৯০৮) জন্মগ্রহণ করেন)। রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুলের প্রতিভা শুরুতে অনুমান করতে পেরেছিলেন এবং বসন্ত ঋতুর সাথে তুলনা করে, 'কবি' সম্বোধনে উৎসর্গ করেন তার রচিত 'বসন্ত' নাটক।

৭ আগস্ট ১৯৪১ (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮) সালে ৮০ বছর বয়সে এ মহারথী রবি ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ ঘটে। আজকের এইদিনে কবিকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ