About Us
শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
Rejaul karim
প্রকাশ ০৫/০৫/২০২১ ০১:২৯পি এম

পশ্চিম বাংলার নির্বাচন নিয়ে মূল্যায়ন

পশ্চিম বাংলার নির্বাচন নিয়ে মূল্যায়ন Ad Banner


২০২১ সালের পশ্চিম বাংলার বিধান সভার নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ২৯২ টি আসনের মধ্যে ২১৩টি আসন পেয়ে বিশাল ব্যবধানে বিজয় লাভ করেছে। প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে ২টি আসনে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। বিজিপিও ভালো ফল করেছে। বিজিপি পেয়েছে ৭৭টি আসন। পশ্চিম বাংলায় বিজিপি এখন বিরোধী দল। অথচ পশ্চিম বাংলায় বিজিপির কোন অস্তিত্ব ছিল না। ২০১৬ সালের বিধান সভা নির্বাচনে পশ্চিম বাংলায় বিজিপি মাত্র তিনটি আসন পেয়েছিল। ৩ থেকে ৭৭ কম নয়। সবচেয়ে বড় কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করলেও তিনি নিজে পরাজিত হয়েছেন। তাও বিজিপির প্রার্থীর কাছে এবং নন্দীগ্রামে। যে নন্দীগ্রামের রক্তপাতকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগেসের উত্থান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যার কাছে পরাজিত হন তিনি হলেন তারই দলের এক সময়ের মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যদিও এ পরাজয় তাকে মুখ্যমন্ত্রী হতে বেগ পেতে হবে না। ছয় মাসের মধ্যে যেকোন আসন থেকে নির্বাচিত হলেই হলো। এ নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজিপির বিজয় হয়েছে। বিজয় হয়েছে মারদাঙ্গা পার্টির। পরাজয় হয়েছে বামফ্রন্টের, পরাজয় হয়েছে ভদ্র ও মার্জিত জনদের। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্তির পর পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডা. বিধান চন্দ্র রায়, প্রফুল্লা চন্দ্র সেন, অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এরা সবাই ছিলেন মার্জিত মানুষ, মার্জিত নেতা। এদের অধিকাংশের বাড়ি ছিল পূর্ব বঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশে। প্রফুল্ল রায়ের বাড়ি ছিল ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার মালিকান্দা গ্রামে। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের পর তিনি প্রথম পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন। তার পরে হন বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসক ডা. বিধান চন্দ্র রায়। বিধান রায়ের পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের সাতক্ষিরা জেলার দেবহাটা উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। তিনি ১৯৪৭ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত (১ জুলাই ১৯৬২) মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বিধান রায়ের পরে মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লা চন্দ্র সেন। তার বাড়িও ছিল খুলনা জেলার দিঘলীয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে। তিনি ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এরপরে আসেন অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়। তারপরে আসেন ব্যারিস্টার সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ছিলেন। তিনি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মেয়ের ঘরের নাতি। তার বাড়িও ছিল বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার হাঁসাড়া গ্রামে, ঢাকা-মাওয়া রোডের পাশে। চিত্তরঞ্জন দাশের বাড়িও ছিল বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার তেলিরবাগ গ্রামে।  ১৯৭৭ সালে মুখ্যমন্ত্রী হন জ্যোতি বসু। তিনি দীর্ঘ ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার পৈত্রিক বাড়ি নারায়নগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ে। এরপরে আসেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি হচ্ছেন কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর ভাতিজা। তার পৈত্রিক বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। তিনি ২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এলেন। তিনি তিনবার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে কি কোন মার্জিত কথা, মার্জিত আচরণ লক্ষ্য করা যায়? তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে কি কোন বিনয়, ভদ্রতা দেখা যায়? মমতাকে মনে হয় এ যুগের হিটলার মুসোলিনি। এখন তিনি বিজিপির ঘোর বিরোধী। অথচ তিনি বিজিপির প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে সমর্থন করে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি একবার লোকসভার এক সদস্যকে নারী বিলের বিরোধিতা করার জন্য কলার ধরে লোকসভার করিডোর থেকে বের করে নিয়ে আসেন। মমতার রাজনৈতিক উত্তরসুরী ভাবা হচ্ছে তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু তার আচরণ, কথাবার্তায় বিনয় বা মার্জিত ভাব পরিলক্ষিত হয় না। গণতন্ত্র তো মানুষকে বিনয়ী করে। কিন্তু কৈ? পশ্চিম বাংলা থেকে বিনয় উঠে যাচ্ছে। নির্বাচন মানে হিংসা, সহিংসতা। হিংসা-হানাহানি লাঘবের তরে দুই মাসব্যাপী নির্বাচন হলো। এ দুই মাসের প্রতিদিনই কোন না কোন হিংসার ঘটনা শোনা গেছে। খুন হয়েছে এক ডজনের অধিক মানুষ। আহত, ঘরবাড়ি ভাঙ্গচুর অনেক। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সহিংসতা বেড়ে গেল। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন (০৩/০৫/২০২১) অর্ধ ডজন খুন হলো, বাড়িঘর ভাঙ্গচুর হলো, আহত হলো অনেকে। ০৪/০৫/২১ তারিখে খুন হলো ৭ জন। মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে। নেতানেত্রীরা সমর্থকদেরকে অসহিষ্ণুতা শেখাচ্ছে। উগ্র সমর্থকেরা তা বাস্তবায়ন করছে। আজ তৃণমূল যা করছে, এক সময় বিজেপিও তাই করবে। দুর্বল ও ভদ্রজনদের রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে, পেশি শক্তির জয় হচ্ছে। এ নির্বাচন পশ্চিম বঙ্গ থেকে বামদের ধুয়ে মুছে দিয়েছে। অথচ এ বামরা পশ্চিম বঙ্গে একটানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও ৭৫টি আসন পেয়ে সিপিএম বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করেছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে তারা একটি আসনও পায়নি। কংগ্রেসও একটি আসন পায়নি। তারাও দীর্ঘকাল ভারত ও পশ্চিম বাংলা শাসন করেছে। যদিও কংগ্রেস ভেঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস হয়েছে। অনেকের ধারণা তৃণমূল কংগ্রেস ভবিষ্যতে টিকবে না। কারণ এ সংগঠনটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তৃণমূল পার্টিতে এক ব্যক্তিই সব। সেখানে গণতন্ত্র বা ভিন্নমতের কোন সুযোগ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতোদিন আছেন, ততোদিন তৃণমূল কংগ্রেস আছে। তারপর এর কি পাত্তা থাকবে? ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দল। কিন্তু সেখানে এখনো সর্বভারতীয় সংগঠন তেমন গড়ে উঠছে না। যা গড়ে উঠছে তা আঞ্চলিক দল। বিজিপি এখন সর্বভারতীয় দল হয়ে উঠছে। কিন্তু তার প্রতিপক্ষ কৈ? এক সময় কংগ্রেস ছিল সর্বভারতীয় সংগঠন। আজ তাদের অবস্থান খুবই নাজুক। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। এটা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে, রাজার কোন স্ত্রী, সন্তান, পরিবার থাকবে না। দেশের জনগণই তার সন্তান। সমগ্র দেশই তার পরিবার। রাজার সন্তান, পরিবার থাকলে রাজার পক্ষে দুর্নীতিমুক্ত হওয়া কঠিন। ভারতীয় রাজনীতিবিদরা প্লেটোকে অনুসরণ করছেন কিনা কে জানে? পশ্চিম বাংলার ৮ জন মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে ৫ জনই বিয়ে করেননি। যেমন বিধান চন্দ্র রায়, প্রফুল্ল চন্দ্র সেন, অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (কৈশোরে বিবাহ হলেও দাম্পত্য জীবন হয়নি), বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী বিয়ে করেননি। দেশসেবাকেই তারা ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের ত্যাগকে স্যালুট জানাই, তাদের গণতন্ত্রকে স্যালুট জানাই। তবে গণতন্ত্রের নামে সহিংসতাকে নিন্দা জানাই। বিশেষ করে পশ্চিম বাংলায় তো সহিংস নির্বাচন ছিল না। কিন্তু এবার তা ভালো করেই দেখা দিল। ভারতের রাজনীতিতে একটা ভালো গুণ তা হলো পরাজয়কে মেনে নেওয়া। পশ্চিম বঙ্গে নির্বাচনে হেরে গিয়ে বিজিপি মমতাকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং বলেছে তাদের কোথায় ভুল হয়েছে তা বৈঠক করে চিহ্নিত করে ভুল শোধরে আবার মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এটা খুবই ইতিবাচক দিক। তবে মমতার দল পরাজিত হলে কী বলতেন, দেখার বিষয় ছিল।

রেজাউল করিম, সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। ইমেইল: rejaulkarim1975@gmail.com


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ