About Us
শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
Shahriar Mohammad
প্রকাশ ০১/০৫/২০২১ ০৭:৪৮পি এম

থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডিঃ ঔষধ শিল্প জগতের এক কালো অধ্যায়

থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডিঃ ঔষধ শিল্প জগতের এক কালো অধ্যায় Ad Banner

থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডি, ঔষধ শিল্পের জগতে এক কালো অধ্যায়। থ্যালিডোমাইড এমন একটি রাসায়নিক পদার্থ যা বার্থ ডিফেক্ট বা জন্মগত ত্রুটির অন্যতম কারণ। এটি একটি টেরাটোজেনিক এজেন্ট। মাতৃগর্ভে ভ্রুণের বৃদ্ধিতে অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে এই থ্যালিডোমাইডের।   

এই বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে তৎকালীন সময়ে প্রায় ১০ হাজার শিশু বিকৃত অঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে কারো হাত-পা দেহের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত ছোট বা অপূর্ণাঙ্গ ছিল, কারো হাত-পা দড়ি পাকানোর মত বাঁকানো, কারো আবার হাত-পা, নাক-কান বা যৌনাংগের মত কোন একটি অঙ্গ তৈরিই হয়নি। এ বিকৃত শরীরকে বোঝার মত বয়ে বেড়াতে হয়েছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

অনেকে আবার জন্ম নিয়েছে স্নায়বিক ত্রুটি নিয়ে। সরকারি হিসেবে থ্যালিডোমাইডের প্রভাবে মারা যাওয়ার চিত্র আরো ভয়াবহ, প্রায় ১ লক্ষ ২৩ হাজার শিশু জন্মের আগেই বা জন্মের সময় মৃত্যুবরণ করে। বাস্তব চিত্র যে এর থেকে আরো ভয়াবহ তা সহজেই অনুমান করা যায়। 

 থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডি নিয়ে আন্তর্জাতিক যতগুলো ডকুমেন্টারি রয়েছে, সে ডকুমেন্টারি গুলোতে সে সময়ে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের কমেন্ট পড়লেই বুঝা যায় অবস্থা কতটা ভয়াবহ ছিল। পুরো একটি জেনারেশনকে পঙ্গুত্ব মেনে নিতে হয়েছিল। রসায়ন বিজ্ঞানের ত্রুটিযুক্ত প্রয়োগ এবং অসতর্কতাকেই এই ভয়াবহ থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

থ্যালিডোমাইড প্রস্তুতকারক কোম্পানিঃ "কেমি গ্রুয়েন্থাল" নামক একটি জার্মান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এই থ্যালিডোমাইড প্রথম বাজারজাত করে। কেমি গ্রুয়েন্থাল কোম্পানিটিই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সর্ব প্রথম এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন বাজারজাত করার সুনাম অর্জন করেছিল। ১৯৫৪ সালে কোম্পানিটি থ্যালিডোমাইড আবিষ্কার করে এবং খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সেই বছরের এপ্রিলেই তারা থ্যালিডোমাইডের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করে। যে কোন ঔষধই বাজার জাত করার পূর্বে ওষুধের ক্ষতিকর মাত্রা ও কার্যকারিতা জানার জন্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং তার পূর্বে প্রিক্লিনিকেল ট্রায়াল অত্যাবশ্যক। ওষুধের ক্ষতিকর মাত্রা জানার জন্যে ইঁদুরের উপর প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা খুব ভালো ফলাফল পান।

১৯৫৬ সালে প্রকাশিত থ্যালিডোমাইডের স্ট্যার্ন্ডাড টক্সিসিটি টেস্ট রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গড়ে প্রতি কেজি ওজনের ইঁদুরে ৫০০০ মিগ্রা থ্যালিডোমাইড প্রয়োগেও কোন ক্ষতিকর প্রভাব পাওয়া যায় না। ফলে এটি হিউম্যান ট্রায়ালের জন্যে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করে। তবে ইঁদুরের উপর এ ট্রায়ালের অনেক তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। 

১৯৫৬ সালের নভেম্বরে কোন ধরণের প্রেগ্ন্যান্সি ট্রায়াল না করেই 'কমন ফ্লু' প্রতিরোধী রেসপিরেটরি ইনফেকশন এর ওষুধ হিসেবে ‘গ্রিপেক্স’ ব্র‍্যান্ড নামে বাজারে আসে থ্যালিডোমাইড। Quinine, vitamin C, phenacetin, এবং acetylsalicylic acid এর সাথে কম্বিনেশন থেরাপি হিসেবে গ্রিপেক্স বাজারজাত করা হয়। প্রচার করা হয় সন্তানসম্ভবা নারীদের মর্নিং সিকনেস প্রতিরোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর।  মর্নিং সিকনেস সমস্যাটি প্রথম সন্তান ধারণকারী নারীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠার পরপরই প্রচন্ড বমি ভাব, মাথা ঘোরানো মর্নিং সিকনেসের প্রধান উপসর্গ।

গর্ভকালীন সময়ে বিশেষ করে ১ম ও ২য় মাসে মর্নিং সিকনেস বেশি অনুভূত হয়। মর্নিং সিকনেস প্রতিরোধে থ্যালিডোমাইড থেকে অত্যন্ত ভালো ফলাফল পাওয়ায় "ডেসটেভাল" ব্র‍্যান্ড নামে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও এর বাজারজাত করে ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। 

১৯৫৭ সালে ‘কন্টারগ্যান’ ও ‘কন্টারগ্যান ফোর্ট্যে’ নামক আরো দুটো ব্র্যান্ড নামে বাজারে আসে থ্যালিডোমাইড। ‘কন্টারগ্যান’ ওষুধটি দুশ্চিন্তার ওষুধ হিসেবে ছাড়া হয়, আর ‘কন্টারগ্যান ফোর্ট্যে’ ছাড়া হয় ঘুমের ওষুধ হিসেবে। দুটোই বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

১৯৫৯ সালের দিকে প্রেগন্যান্ট মায়েদের জন্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন মর্নিং সিকনেস প্রতিরোধী ও সিডেটিভ ওষুধ হিসেবে থ্যালিডোমাইড ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তখনও কেউ আন্দাজ করতে পারেনি অদূর ভবিষ্যতে কি ভয়াবহ অবস্থার জন্ম দিতে যাচ্ছে এই থ্যালিডোমাইড। এটির ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণ হলো, প্রসূতি মায়েদের জন্য এবং বিভিন্ন ব্যথার জন্য অনেক বেশি মাত্রার সিডেটিভ প্রয়োগ করতে হতো। ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল উল্লেখজনক। এদিকে থ্যালিডোমাইডের মাত্রা যেমন কম লাগে, তেমনি এটি দারুণ কার্যকরী এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তখন পাওয়া যায়নি। 

১৯৬১ সালের মধ্যে থ্যালিডোমাইড অসম্ভব জনপ্রিয় এক ওষুধে পরিণত হয়। ফলে ৪৬টি দেশে ঝড়ের গতিতে বিক্রি হচ্ছিল এই ওষুধ। ওষুধটি জার্মানির জন্য বিশাল এক আশীর্বাদে পরিণত হয়। বাজারের অন্যান্য ওষুধের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি বিক্রি হচ্ছিল এটি। 

১৯৫৮ সালের দিকেই জার্মানিতে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটি দেখা দিচ্ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অনেকে ধারণা করে নিচ্ছিলেন, জীনগত কারণে বা পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার কারণেই হচ্ছে এই জন্মগত ত্রুটি।

শেষমেশ ১৯৬১ সালের শেষের দিকে বিজ্ঞানীরা "কন্টারগ্যান" ওষুধটিকে এই বার্থ ডিফেক্টের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। থ্যালিডোমাইড ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর কোণায় কোণায়। বাজার থেকে এই ওষুধকে অপসারণ করতেও লেগে যায় দীর্ঘ সময়। 

 যে সকল গর্ভবতী মায়েরা মর্নিং সিকনেস দূরীকরণে এই থ্যালিডোমাইড গ্রহণ করেছিলেন, তাদের প্রায় দশ হাজার শিশু বিকৃত অঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল। মারা গিয়েছিল প্রায় ১,২৩,০০০ শিশু। এক কথায় বলা যায়, পুরো একটি প্রজন্ম নিমজ্জিত হয় পঙ্গুত্বের মত অন্ধকার অধ্যায়ে।   

থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডি ও স্টেরিওকেমিস্ট্রি এই থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যায়, স্টেরিওকেমিস্ট্রি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান রাখা এবং এর যথোপযুক্ত প্রয়োগ কতটা জরুরি। মর্নিং সিকনেস প্রতিরোধে থ্যালিডোমাইডের কার্যকারিতা রয়েছে এবং ওষুধ গ্রহণের পর গর্ভবতী মায়েদেরও কোন বিশেষ পার্শপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। মূলত ক্ষতি হয়েছে গর্ভে বাড়তে থাকা ভ্রূনের।  আমরা জানি কার্বন পরমাণুর চারটি যোজনী রয়েছে। এই চারটি যোজনীতে যদি চারটি ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু বা মূলক থাকে তাহলে সে কার্বনকে আমরা কাইরাল কার্বন বলি। কাইরাল কার্বন গঠিত কোন যৌগের কয়েকটি বিশেষ ধর্মের মধ্যে রয়েছে, যৌগটি আলোক সক্রিয় হবে, আলোক সমানুগুলোর কনফিগারেশন বা ত্রিমাত্রিক গঠন পরস্পরের দর্পণ প্রতিবিম্ব হবে এবং এদের কনফিগারেশন পরস্পরের অসমাপতিত হবে। থ্যালিডোমাইড যৌগেও ঠিক একই রকম কাইরাল কার্বন রয়েছে এবং কাইরাল কার্বন সম্পর্কিত সকল বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। 

জৈব যৌগে এ ধরণের কাইরাল কার্বন সম্বলিত অনেক ধরণের আলোক সক্রিয় যৌগ রয়েছে। দুটি একই আনবিক ও গাঠনিক সংকেত বিশিষ্ট আলোক সক্রিয় যৌগকে পরস্পরের এনানশিওমার বলা হয়, যার মধ্যে একটি R-এনানশিওমার ও অন্যটি S-এনানশিওমার। এই R ও S এনানশিওমার দুটি ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক ধর্ম এবং ফার্মাকোলজিক্যাল গুণাগুণ প্রদর্শন করে থাকে।  থ্যালিডোমাইড যৌগটিতেও R এবং S এনানশিওমার রয়েছে।

এ দুটি এনানশিওমারের মধ্যে একটি এনানশিওমার থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডির প্রধান কারণ। গবেষণা থেকে জানা যায়, R-এনানশিওমার মর্নিং সিকনেস প্রতিরোধে খুব ভালো কাজ করে, অন্যদিকে S-এনানশিওমার গর্ভে অবস্থানরত ভ্রূনের বিকাশে প্রচন্ডভাবে বাধাগ্রস্ত করে।

১৯৫৬ সালে থ্যালিডোমাইড বাজারজাত করার পূর্বে স্টেরিওকেমিস্ট্রির জ্ঞান দ্বারা যাচাই-বাছাই, বায়োইকুইভ্যালেন্স স্টাডি, প্রেগ্ন্যান্সি স্টাডি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাজারজাত করা হলে সমগ্র বিশ্বকে থ্যালিডোমাইড ট্র‍্যাজেডির মত কলংকজনক অধ্যায়ের সাক্ষী হতে হতো না।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ