About Us
MD Alim Uddin
প্রকাশ ২৬/০৪/২০২১ ১০:৫৬এ এম

ইসলামিক গল্প- দ্বীনদার মেয়ের বিয়ে

ইসলামিক গল্প- দ্বীনদার মেয়ের বিয়ে Ad Banner


আজ তাহা কে পাত্রপক্ষের লোক দেখতে এসেছে। তাহাকে তার মা একটা নতুন বোরখা হিজাব দিয়ে পড়ে নিতে বললো। তাহা মায়ের কথা মতো বোরখা পড়ে নিল। 

পাত্রপক্ষের লোকের সাথে তাহার বাবা, চাচা এবং ভাইয়েরা কুশল বিনিময় করছে। পাত্রের সাথে তার বাবা, মা এবং বোন এসেছে। মা এবং বোনকে মেয়েদের সাথে বসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

ছেলে এ বছরই পড়ালেখা শেষ করে বাবার ব্যবসায় লেগেছে। ছেলের নাম সাজিদ। সাজিদ যথেষ্ট ধার্মিক মাইন্ডেড এবং নিজের জীবনে আল্লাহ এবং তার রছুলের নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করে। আজ তাই তারা পাত্রী দেখতে এসেছে। 

তাহা খুবই নার্ভাস ফিল করছে এবং মনের ভেতর কিছু ভয়ও কাজ করছে। একটু পর তাহার বাবা সাজিদ, তার মা এবং বোনকে তাহার রুমে নিয়ে আসলো।

তাহা উনাদের দেখেই মৃদু স্বরে সালাম দিল-- 

আছছালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লহি ওয়া বারকাতুহ। 

সবাই সালামের জবাব দিল। তাহার প্রচুর ভয় কাজ করছে মনে, তাই সে মাথা উঠাতে পারছে না। সাজিদ এক পলক তাহাকে দেখে নিয়ে মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো।

সাজিদের মা বললো, মেয়ে তো দেখতে মাশা আল্লাহ। আমাদের তো খুবই পছন্দ হয়েছে মেয়েকে। কি রে বাবা সাজিদ, তোর কি কোনো দ্বিমত আছে?


সাজিদঃ সাহস্যে বললো আমার কোনো দ্বিমত নেই মা আলহামদুলিল্লাহ। 

এবার তাহা এক পলক আড় চোখে সাজিদ কে দেখেই চোখ নামিয়ে নিলো আর মনে মনে বললো আলহামদুলিল্লাহ। 

সাজিদ জানে রসূল সঃ পাত্রী দেখার সময় ৪ টি জিনিস দেখতে বলেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আত্মিক ও ঈমানের সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন।


তিনি বলেন, ‘নারীদের চারটি গুণ দেখে বিয়ে করো : তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। তবে তুমি দ্বীনদারীকে প্রাধান্য দেবে। নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৯০)


সাজিদ তার রসূলের দিক নির্দেশনা মেনেই তাহাকে তার বিয়ের জন্য নির্বাচন করেছে।

বর্তমানে পাত্রী দেখতে গেলে তার দ্বীনদারিতা দেখা হয় না দেখা হয় তার সৌন্দর্য। আর মেয়ের পরিবারও ছেলের দ্বীনদারিতা দেখে না দেখে তার স্ট্যাটাস, আয় ইনকাম ইত্যাদি। 

শুধু সৌন্দর্য আর সম্পদ দেখে গলে গেলে স্রেফ জ্বলে যাবে।

তাহার পরিবার ধার্মিক এবং তাহাও তার ব্যক্তিগত জীবনে দ্বীন পালনের চেষ্টা করে। তাই, সাজিদরা তাহাকে সব দিক দিয়েই পছন্দ করেছে।

অবশেষে সবার মতকে প্রাধান্য দিয়ে আগামী শুক্রবার তাদের বিয়ের দিন ঠিক করা হলো।

বর্তমানে পাত্রী দেখতে পাত্র পক্ষের বাবা, চাচা, খালু, ফুপা দুলাভাই সবাই একে একে মেয়ে দেখে। যেন মেয়ে কুরবানির গরু। আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার যে, বিয়ের আগে মেয়েকে শুধুমাত্র পাত্রই দেখতে পাবে, অন্য কেউ নয়। 

আর এজন্যই সাজিদ রা চেষ্টা করেছে কম মানুষ নিয়ে যাওয়ার এবং তাহাকে যাতে নন মাহরাম কারো সামনে পড়তে নাহয় সেটাও খেয়াল রেখেছে।


আজ শুক্রবার। তাহার বিয়ে। চারদিকের পরিবেশ আনন্দমুখর তবে এখনকার যুগের মতো বিয়েতে গান, বাজনা বা পশ্চিমা সংস্কৃতি নেই।

এখনকার বিয়ে মানেই ধুমধাম পার্টি, ছেলে মেয়ে বেহায়াপনা আর গান নাচ ছাড়া তো এখনকার বিয়েই হয় না। আল্লাহ মাফ করুন। 

তাহা মনে মনে ভাবছে, বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন, ভালোবাসার বন্ধন। বিয়ে দুটি মানুষের মনের মিল, কিছু রঙিন অধ্যায়, বৈচিত্র্যময় পরীক্ষা এবং আখিরাতের পাথেয় অর্জনের এক অন্যতম উপায় আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আজকাল বিয়েতে মানুষ এতো আল্লাহর নাফরমানি করে যে, বিয়েগুলো আর পবিত্র হয়ে উঠে না।

যে বিয়ের শুরুই হয় আল্লাহর নাফরমানি দিয়ে সেই বিয়েতে রহমত, নিয়ামত, বরকত আমরা কীভাবে আশা করতে পারি!! 

রবের প্রতি অসংখ্য শুকরিয়া জানাচ্ছে তাহা, যে তার বিয়েতে এমন বিজাতীয় কালচার নেই। আল্লাহ তায়ালা যাতে সবাইকে হিদায়াত দান করে তারও দুয়া চেয়ে নিচ্ছে।

তাহার পাশে তার বোনেরা বসে আছে এবং তাকে সাজাচ্ছে। 

তাহাঃ বনুরা আমাকে অল্প সাজই দিও। আমি বেশি আটা ময়দা মাখতে চাই না প্লিজ।

খালাতো বোনঃ কেন, বিয়ে তো একদিন ই করবি সাজবি না। নাকি বিয়ে জীবনে বারবার আসবে?!!

আর এসব কি তাহা, তুই বিয়ের দিনও বোরখা হিজাব পড়বি

তাহাঃ তাহা মুচকি হেসে বোনকে বলল, আপু তুমি ঠিকই বলেছ, বিয়ে জীবনে একবারই করবো। কিন্তু এতো বেশি আমাকে সাজিয়ে ফেল না যে আমার আসল রূপ ঢাকা পড়ে। তাহলে এটা আল্লাহর প্রকৃতির বাইরে হবে। 

আর বোরখা পড়ার কথা! 

অবশ্যই আপু আমি বিয়ের দিনও বোরখা হিজাব পড়ব। পর্দা আমাদের জন্য সবসময় এর জন্যই ফরজ বিধান। নাকি বিয়ের জন্য পর্দা না করার ছাড় দেওয়া হয়েছে আপু?

খালাতো বোনঃ কিছুটা থতমত খেয়ে, না।

তাহাঃ তাহলে আমি কীভাবে আমার রব্বের ফরজ বিধানকে অমান্য করি বলো, আর আজকে যদি আমার মৃত্যু হয়, আল্লাহ না করুন তখন তো পর্দা না করলে আমার বেপর্দা অবস্থায় মৃত্যু হবে, আল্লাহুম্মাগফিরলি। আর একদিনের জন্য আমি আমার রব্বে কারিম এর হুকুম কীভাবে অমান্য করি বলো, যিনি আমাকে এতোটা নিয়ামাত না চাইতে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। 

খালাতো বোনঃ হয়েছে রে পুচকি বুড়ি। বুঝেছি আমরা। তোকে আর লেকচার দিতে হবে না। 

তাহাঃ আপু তুমিও পর্দা শুরু করো প্লিজ। কারণ দুনিয়ার জীবন কিছুই নয়। আমাদের সবাইকে একদিন আখিরাতের জীবনে পাড়ি জমাতে হবে। তখন আমরা আমাদের রবের সামনে কি জবাব দিব বলো, কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো তাহা।

আপুঃ হুমম তুই ঠিকই বলেছিস রে বোন। আমাদের এভাবে চলা একদম ই উচিত হয়নি। বেপর্দায় চলে অনেক ছেলের টিজও শুনতে হয়। আমি বুঝতে পেরেছি রে বোন। তুই আমাকে আরও কিছু নসিহা করিস কিন্তু এখন নয়। নাহলে তোর বর বেচারা আজকে বিয়ে না করেই ফিরে যেতে হবে, বলে খিলখিল করে হাসতে লাগলো। 

এ কথাই তাহা বেশ লজ্জা পেল।

তাহা উঠে গিয়ে তার বইয়ের তাক থেকে কিছু বই তার আপুর হাতে দিলো এবং সেগুলো পড়ে নিজের জীবনে আমল করতে বললো।


অবশেষে সব বোনেরা মিলে তাহাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করালো। তাহা নিজেকে দেখে বিস্মিত হয়ে গেল। সত্যি তাকে খুব মিষ্টি লাগছে। 

হালকা সাজ, চোখে কিছুটা গাড়ো কাজল, ঠোঁটে ন্যাচারাল কালার লিপস্টিক, কিছু গয়না এতেই অসাধারণ লাগছে তাহাকে। তবে এই সাজ শুধু মাত্র তার প্রিয়তম স্বামীর জন্য। সব সাজা ঢাকা পড়লো তার জিলবাবের নিচে।

পাশ থেকে বোনেরা বলল, তাহা তোর বর আজ তোকে দেখে আর চোখই সড়াতে পারবে না। 

তাহা এ কথাই ভীষণ লজ্জা পেয়ে মুখ নিঁচু করলো।

বরপক্ষ থেকে লোকজন এসেছে মোট ১০ জন। কারণ বরপক্ষে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে যাওয়া ইসলাম অনুমোদন দেয় না। ওয়ালিমার দায়িত্ব ছেলে পক্ষের। মেয়ের পরিবারকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

যে পরিবার টা তার কলিজার টুকরো মেয়ে টাকে সেই ছোট থেকে বড় করে এখন অন্য কারো সংসারে দিয়ে দিচ্ছে তার কতটা কষ্ট হয় সেটা কি কেউ অনুধাবন করতে পারে। 

এখন তো জামানা পুরোই উল্টো, বিয়ের সময় বরপক্ষ থেকে মানুষ যায় হাজার হাজার। আবার কোনো খুঁত ধরা পড়লেই হলো আজীবন মেয়েকে খোঁটা দিবে। যা ইসলামের কোনো আওতায়ই পড়ে না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন আমিন।


অবশেষে এলো ইজাব-কবুলের সময়। এসময় পর্দার অন্তরালে থেকে তাহা বিয়ের জন্য কবুল বললো। 

আমাদের সমাজে মেয়ের কাছে কবুল গ্রহণের সময় দলবেঁধে মাহরাম নন মাহরাম সবাই মেয়ের কাছে ছুটে যায়। কিন্তু ইসলাম এটা অনুমোদন দেই না। মেয়ের ইজাব কবুল নিতে যাবে মেয়ের মাহরাম পুরুষ। এবং মেয়ের ওয়াকিল/উকিল হবে তার বাবা বেঁচে থাকলে তার বাবা আর নাহলে তার মাহরাম অন্য কেউ। যেমনঃ ভাই, চাচা। ওয়াকিল কোনো মতেই মেয়ের নন মাহরাম পুরুষ হতে পারবে না। 

আমাদের সমাজে একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে, উকিল বাবা, উকিল মা বানানো। সমাজের উচু বর্গীয় মানুষদের উকিল বাবা/মা বানানো হচ্ছে। নাউজুবিল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এগুলো পরিহার করার তাওফিক দান করুন। 

অপর পাশে সাজিদও কবুল বললে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।

সাজিদ বিয়ের জন্য নির্ধারিত মোহরানা বিয়ের সময়ই দিয়ে দিল।

কারণ সে জানে,আল্লাহ তায়ালা বলেন,


وَ اٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا ﴿۴﴾


আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর। -আন-নিসা, আয়াতঃ ৪

মোহর হচ্ছে নারীর প্রাপ্য অধিকার। মোহর আদায় ছাড়া বিয়ে হয় না। বিয়ের জন্য অবশ্যই শর্ত মোহর। রসূল সঃ বলেন,

মোহরানা পরিশোধ না করলে সেটা বিয়ে হিসেবে গৃহীত হয় না। সেটা হয় ব্যভিচার। 

আমাদের সমাজে মানুষ মোহরানা নিয়ে অনেক ভুল করেন। মোহর কে তারা সামাজিক স্ট্যাটাস হিসেবে ধরে নিয়েছে। যত বেশি মোহর ধরা যায় তত বেশি তাদের স্ট্যাটাস বৃদ্ধি পায়। এখন ছেলে সেই মোহর আদায় করতে পারলো কি না সেটা ভাববার বিষয় না। তারা মোহর ১০ লাখ ২০ লাখ। কিন্তু এটা ঠিক না। মোহর ধরতে হবে ছেলের সাধ্য অনুযায়ী। যেটা সে ছেলে তার স্ত্রীকে দিতে পারে। কিন্তু সেটা না করে তারা লাখ লাখ টাকা মোহর ধরে। যা ছেলের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না।


তাদের ধারণা, মোহর যদি বেশি ধরা হয় তাহলে স্বামী তালাকের কথা চিন্তাই করতে পারবে না। আল্লাহুম্মাগফিরলি। বিয়ের মতোন এত পবিত্র একটা জিনিসই নিয়ে কীভাবে মানুষ এমন টা ভাবতে পারে!! আল্লাহ তায়ালা সবাইকে বুঝার তাওফিক দান করুন আমিন। 

আর মোহর আদায় না করে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া খুবই ন্যক্কারজনক এবং হীনমন্যতার কাজ। এটা কখনোই মাফ হয় না।


এবার তাহার বিদায়ের পালা এলো।

তাহা সেই তখন থেকে কেঁদেই চলেছে, তার চোখের পানি যেন বাঁধ মানছে না। কোনোদিন বাবা মাকে ছাড়া সে একা থাকেনি। সেখানে কীভাবে সে জীবনভর থাকবে। আব্বুকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলো তাহা, তার আব্বুকে সে খুবই ভালোবাসে। আব্বু তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। 

সবার থেকে বিদায় নেওয়ার পর তাহার বাবা সাজিদের হাত ধরে বললো, বাবা আমার তাহা মাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। আমার মেয়েটা বড্ড সহজ, সরল। দুনিয়ার কাঠিন্য তাকে এখনো স্পর্শ করেনি। তুমি তাকে দেখে রেখ বাবা, বলে অঝোরে কাঁদতে লাগলো।


সাজিদ তাহার বাবাকে আস্বস্ত করে বললো, বাবা আপনি মোটেও চিন্তা করবেন না। আমি তাহাকে আমার সাধ্য অনুযায়ী ভালো রেখার চেষ্টা করব ইং শা আল্লহ। আপনারা সবাই দুয়া করবেন আমাদের জন্য।


অবশেষে বিদায় বেলা পার করে সবাইকে কাঁদিয়ে তাহা পাড়ি জমালো অজানা এক গন্তব্যে। পূর্ণ হলো তার অনেক দিনের সাজানো স্বপ্ন অর্ধেক দ্বীন 




শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ