About Us
Rakib Monasib
প্রকাশ ০৩/০৪/২০২১ ০৪:২৬পি এম

খাদ্য নিরাপত্তায় ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯

খাদ্য নিরাপত্তায় ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ Ad Banner

বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। আর এ বছরে পূর্ণ হয়েছে স্বাধীনতার ৫০ বছর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের শতবর্ষও উদযাপিত হচ্ছে এ বছরেই মুজিব বর্ষ নামে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রা অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিশেষ করে খাদ্যের প্রয়োজনীয় জোগান তখন বড় সংকট হয়ে দেখা দেয়। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি। তখন আউশ মৌসুমে বোনা আউশ, আমন মৌসুমে রোপা আমন এবং বোরো মৌসুমে হাওর-বিল এলাকার নিচু জমিতে দেশী জাতের ধানের চাষ হতো। এসব ধানের উৎপাদনশীলতা ছিল খুবই কম। তখন খাদ্যাভাব ছিল মানুষের নিত্যসঙ্গী। বাংলার মানুষের এই অভাবের জ্বালা বুঝতে পেরেছিলেন একজনই, যার আহ্বানে বাংলার মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়, তিনি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিবিড় সম্পর্কের কথা কারো অজানা নয়। স্বাধীনতার পর শস্য উৎপাদনে সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি শুরুতেই কৃষি খাতে ধানের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন। এ তাড়না থেকেই জাতির পিতা ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেন এবং কৃষিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই রাগ করবেন না, দুনিয়াভরে চেষ্টা করেও আমি চাউল কিনতে পারছি না। চাউল পাওয়া যায় না। যদি চাউল খেতে হয়, আপনাদের চাউল পয়দা করে খেতে হবে।’ তার এ ঘোষণার ফলেই দেশে ধান গবেষণা কার্যক্রমে নতুন মোড় নেয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টার ফলে ১৯৭৩ সালেই অনুমোদন পায় বিআর ৩, যা ধান উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। ফলন ছিল হেক্টরপ্রতি চার টনের মতো। ব্প্লিব নামে পরিচিত জাতটি খাটো বলে বাজারে খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যা করা হলেও গবেষণা কার্যক্রম তার নির্দেশিত পথেই চলতে থাকে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বেশকিছু ভালো জাত উদ্ভাবিত হলেও বাজারে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি বলে দীর্ঘদিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি। তবে এসব জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় রোপা আমন কর্তনের পর যেসব জমি পতিত পড়ে থাকত, সেখানে বোরো মৌসুমে সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে দেশের খাদ্যাভাব দূর হতে থাকে। তাই দেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব বর্ষে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্রির অবদান নিয়ে আমার এ উপস্থাপনা।    মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার প্রথমটিই হলো খাদ্য, আর বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ লোকের প্রধান খাবার ভাত। তাই স্বাধীনতা-্পরবর্তী সময়ে উচ্চফলনশীল ধান উদ্ভাবন ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আজ ২০২১ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৭ কোটি হয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে আবাদি জমির পরিমাণ অনেক কমে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই স্বয়ংসম্পূর্ণতার মূলে রয়েছে ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত বোরো মৌসুমে চাষ উপযোগী ব্রি-ধান ২৮ এবং ব্রি-ধান ২৯ এ দুটি ধানের জাত। উদ্ভাবনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় সফলতা আসে ১৯৯৪ সালে এ দুটি জাত অবমুক্ত হওয়ার পর। বোরো মৌসুমে যেসব এলাকায় আগাম জাতের চাহিদা আছে অথবা বোরো ফসলের পর রোপা আউশ বা পাট চাষ করা হয়, সেসব এলাকার জন্য ব্রি-ধান ২৮ জাতটি বিশেষ উপযোগী। যেসব এলাকায় বোরো ফসলের পর রোপা আমন চাষ করা হয় বা একফসলি হিসেবে শুধু বোরো চাষ হয়, সেসব এলাকার জন্য ব্রি-ধান ২৯ জাতটি বিশেষ উপযোগী। ব্রি-ধান ২৮-এর জীবনকাল ১৩৫-১৪০ দিন, উচ্চতা ৮৫-৯০ সেন্টিমিটার এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ টন। চাল মাঝারি চিকন সাদা। ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু। ব্রি-ধান ২৯-এর জীবনকাল ১৫৫-১৬০ দিন, উচ্চতা ৯০-৯৫ সেন্টিমিটার এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৭-৮ টন। চাল ব্রি-ধান ২৮-এর মতো, তবে কিছুটা ছোট ও আরেটু চিকন। ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু।    স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল মোট ৯৮ লাখ টন। দেশে এখন প্রায় সোয়া চার কোটি টন দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু চালই উৎপাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। শস্য উৎপাদন খাতে এ প্রাচুর্যের পথপ্রদর্শক বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ব্রি-ধান ২৮ ও ২৯। দেশে চাল উৎপাদনে রীতিমতো বিপ্লব এনে দিয়েছে ব্রি উদ্ভাবিত জাত দুটি। এখনো দেশে দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনে এ দুই জাতের ধানই নেতৃস্থানীয় অবদান রেখে চলেছে। দেশে প্রধান খাদ্যশস্য চালের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই পূরণ করছে ব্রি-ধান ২৮ ও ২৯। মোট চালের উৎপাদনে বোরো ধানের অবদান বাড়তে থাকে মূলত নব্বইয়ের দশকেই। ১৯৯৯ সালে দেশে খাদ্যে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে, তার পেছনে ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ বড় ভূমিকা রেখেছে। এখন দেশের মোট ধানের অর্ধেকই জোগান দিচ্ছে বোরো মৌসুম। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ টন। সেখানে বোরো ধানের অবদান ছিল প্রায় ৫৪ শতাংশ। বর্তমানে বোরো মৌসুমে যে পরিমাণ ধান চাষ হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশই ব্রি-ধান ২৮ বা ২৯ জাতের। এর আগ পর্যন্ত দেশের মোট ধান উৎপাদনে প্রাধান্য ছিল বৃষ্টিনির্ভর আমন ধানের। কিন্তু এ জাত দুটি উদ্ভাবনের পর সেচ সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বোরো চাষের আবাদে বড় পরিবর্তন আসে। ধান উৎপাদনের জন্য এখন বোরো মৌসুমের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। জাত উদ্ভাবনের জন্য ব্রি-তে তখন মৌসুমের ওপর ভিত্তি করে প্রজেক্ট নেয়া হতো। বোরো মৌসুমে উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের জন্য ব্রির ব্রিডিং ডিভিশনের ইরিগেটেড রাইস প্রজেক্ট থেকে এ দুটি জাত উদ্ভাবিত হয়। এ প্রজেক্টের প্রজেক্ট লিডার ছিলাম আমি ডক্টর প্রণব কুমার সাহা রায় এবং আমার সঙ্গে ছিলেন ডক্টর তানভীর আহমেদ, ডক্টর খাজা গুলজার হোসেন এবং ডক্টর কামরুননাহার। জাত দুটির উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয় করার পেছনে তত্কালীন ব্রিডিং ডিভিশনের বিভাগীয় প্রধান ডক্টর নূর মোহাম্মদ মিঞার উপদেশ ও নির্দেশ অনস্বীকার্য।     ১৯৯৪ সালে অবমুক্ত হওয়ার পর থেকেই জাত দুটি বাংলাদেশের কৃষিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে আসছে। জাত দুটির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রদর্শনী করা হয়। এছাড়া বীজ উৎপাদনের জন্য বিএডিসিকে ব্রিডার্স সিড সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ডিএই জাত দুটির ব্যাপক প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা নেয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাত দুটি কৃষকের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। জাত দুটির উচ্চফলন, সুস্বাদু ভাত, মাঝারি উঁচু গাছ বলে কৃষকের খড়ের চাহিদা পূরণ ও মোটামুটি রোগবালাই প্রতিরোধী হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে সহজেই জনপ্রিয়তা পায়। ব্রি-ধান ২৯-এর উচ্চফলনের জন্য হাইব্রিড ধানের জাতও কৃষকের কাছে খুব একটা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। হাইব্রিড ধানের সঙ্গে একই ব্যবস্থাপনায় চাষ করে ব্রি-ধান ২৯-এর ফলন ১০ টন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৭ বছর ধরে বোরো মৌসুমে ধান আবাদের জন্য এ দুটি জাতই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প ভালো জাত না আসায় এ জাত দুটি মেগা ভ্যারাইটিতে রূপান্তরিত হয়েছে।    গত কয়েক দশকে চাল উৎপাদনে ধারাবাহিকতা থাকায় দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় স্বস্তি এসেছে, যার পেছনে বড় অবদান রয়েছে জাত দুটির। তবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা টেকসই রাখতে ব্রি শুধু এ দুটি জাতের ওপর নির্ভর না করে বেশকিছু বিকল্প জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেছে এবং করে যাচ্ছে। সেচ ও চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক উন্নতিকে কাজে লাগিয়ে এ দুটি জাত বাংলাদেশের ধান উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। একই সঙ্গে ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষুধামুক্তি ও টেকসই খাদ্যনিরাপত্তায় কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারায় মুজিব বর্ষ ও বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে নিজেকে একজন সফল ব্রিডার হিসেবে গৌরবান্বিত বোধ করছি।      ড. প্রণব কুমার সাহা রায়: সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Verified আই নিউজ বিডি ডেস্ক
প্রকাশ ১৯/০৪/২০২১ ০৩:০৭পি এম