About Us
Abdullah Al hosain
প্রকাশ ০২/০৪/২০২১ ০৯:৪৫পি এম

দাম্পত্য জীবন; অজ্ঞতা ও পরিণাম

দাম্পত্য জীবন; অজ্ঞতা ও পরিণাম Ad Banner

কিছুদিন আগে আমার এক প্রিয় তালিবে ইলম দেখা করতে এসে বলল- হুজুর আগামী পরশু আমার বিবাহ।চমকে উঠে তাকালাম । বড় বেচারা মনে হল। কারণ আমিও একদিন বড় অপ্রস্তুত অবস্থায় জেনেছিলাম আগামীকাল আমার বিবাহ ৷ ভিতর থেকে হামদর্দি উথলে উঠল ৷ ইচ্ছে হলো তাকে কিছু বলি ৷ জিন্দেগীর এই নতুন রাস্তায় চলার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পাথেয়, আল্লাহর তৌফিকে তাকে দান করি ৷ আল্লাহর তৌফিক ছাড়া আমরা কেই বা কি করতে পারি?!

তো তাকে জিজ্ঞাসা করলাম বিবাহের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো? বড় ভোলাভালা নওজোয়ান, সরলভাবে বলল- আমার কিছু করতে হয়নি, সব প্রস্তুতি আব্বা-আম্মাই নিয়েছেন । কেনাকাটা প্রায় হয়ে গেছে, শুধু বিয়ের শাড়ি টা বাকি।

 অবাক হলাম না, তবে দুঃখিত হলাম । আমার এই প্রিয় তালিবে ইলম এখন একজন জিম্মাদার আলিমে দ্বীন । দীর্ঘ কয়েক বছর আমাদের সোহবাতে ছিল। তার কাছে বিবাহের প্রস্তুতি মানে হল, জিনিসপত্র এবং বিয়ের শাড়ি । তাহলে অন্যদের অবস্থা কি?

বড্ড মায়া লাগলো । বললাম দেখো মানুষ যে কোন কাজ করতে চায়, প্রথমে সে ঐ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করে । কাজটির হাকিকত ও উদ্দেশ্য কি? কাজটি আঞ্জাম দেয়ার সঠিক পন্থা কি? শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কি কি সমস্যা হতে পারে? সেগুলোর সমাধান কি? এগুলো জেনে নেয়।  এজন্য দস্তরমত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার আয়োজন আছে, এমনকি বাস্তব প্রশিক্ষণের ও ব্যবস্থা আছে।

অথচ জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও জটিল অধ্যায়ে মানুষ প্রবেশ করে, বরং বলতে পারো ঝাঁপ দেয়, কিছু না শিখে, না জেনে এবং না বুঝে, একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় । ফল কি হতে, পারে কি হয়? অন্যদের কথা থাক । চোখের সামনে আমার কয়েকজন ছাত্রের ঘর ভেঙে গেল, একজনের তো এমনকি দুজন সন্তানসহ । কিংবা ঘর হয়তো ঠিকই আছে, কিন্তু শান্তি নেই, স্বাভাবিক শান্তি ।

আগামী পরশু তোমার বিবাহ । তারমানে আজ তুমি নিছক একটি যুবক ছেলে, অথচ আগামী পরশু হয়ে যাচ্ছ একজন দায়িত্ববান স্বামী । কত বিরাট পার্থক্য তোমার আজকের এবং আগামী পরশুর জীবনের মধ্যে !! বিষয়টি তোমাকে বুঝতে হবে , কেন তুমি বিবাহ করছো ? বিবাহের উদ্দেশ্য কি? দেখো আমাদের দেশে পারিবারিক পর্যায়ে একটা নিন্দনীয় মানসিকতা হল- সংসারের প্রয়োজনে আরও খোলামেলা যদি বলি কাজের মানুষের প্রয়োজনে ছেলেকে বিয়া করানো হয়। সবাই যে এমন করে তা নয় । তবে এটা প্রবলভাবে ছিল, এখনো কিছু আছে। আমি নিজে সাক্ষী আমার একজন মুহতারাম তার মেয়েকে বিয়ে দিলেন । বিয়ে হওয়া মাত্র ছেলের বাবা স্বমূর্তি ধারণ করে বলতে লাগলেন,, আর দেরি করা যাবে না ! তাড়াতাড়ি মেয়ে বিদায় করেন! মেয়ের মা ও বাবা তো হতবাক!

মেয়ে বিদায় হলো, শ্বশুরবাড়িতে রাত পোহালো । আর পুত্রবধূর সামনে কাপড়ের স্তুপ নিক্ষেপ করে শাশুড়ি আদেশ করলেন-কাপড়ে সাবান লাগাও ! দেখি মায়ের বাড়ি থেকে কেমন কাজ শিখে এসেছ !! আমার এক ছাত্রের কথা । বিয়ের প্রয়োজন, কেন? কারন মা বাবার খেদমত করার কেউ নেই ।

এটা কিন্তু বিবাহের উদ্দেশ্য বা মাকসাদ হতে পারে না। বাবা মায়ের খেদমত মূলত তোমার দায়িত্ব । এখন সে যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তোমার সাথে এতে শরিক হয়, তবে সেটা তোমাদের উভয়ের জন্য সৌভাগ্যের কারণ। দেখো আল্লাহ চাহে তো অচিরেই আমাদের ঘরেও পুত্রবধূ আসবে । আমরা আমাদের না দেখা সেই ছোট্ট মেয়েটির প্রতীক্ষায় আছি । কিন্তু আমি আমার পুত্রকে অবশ্যই বলব- বিবাহের উদ্দেশ্য মা-বাবার খেদমত করা হতে পারে না।

আমি দোয়া করি তোমার মা বাবা তোমার যেমন, তেমনি তোমার স্ত্রীর ও যেন মেহেরবান মা-বাবা হতে পারেন । আমার দুই মেয়ের শ্বশুর দুজনই এখন জান্নাতবাসি (ইনশাআল্লাহ ) । আল্লাহর কাছে আমার সাক্ষ্য এই যে, সত্যি সত্যি তারা আমার মেয়ে দুটির বাবা ছিলেন । আমার ছোট মেয়ের শ্বশুর বড় আলেম ছিলেন । তাকে আমার একটি বই হাদিয়া দিয়েছিলাম এভাবে- সাফফানার  আব্বুর পক্ষ হতে সাফফানার আব্বাকে । তিনি খুশি হয়ে অনেক দোয়া করেছিলেন, আর বলেছিলেন - আপনি তো এই ছোট্ট একটি বাক্যে সম্পর্কের মহামূল্যবান এক দর্শন তুলে ধরেছেন!

আমার বড় মেয়ের অবস্থা হল- মায়ের বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় সে কাঁদে না কাঁদে আম্মার বাড়ি থেকে আসার সময়।

দোয়া করি আমার দেশের প্রতিটি মেয়ে যেন, মা বাবার ঘর থেকে এমন মা-বাবার ঘরে প্রবেশ করতে পারে । আর তুমি দোয়া করো - আমরা দুজন যেন আমাদের অনাগত মেয়েটির জন্য তেমন মা-বাবাই হতে পারি।

তো বলছিলাম বিবাহের উদ্দেশ্যের কথা । বৈধ উপায়ে স্ত্রী পরিচয়ে কাউকে ভোগ করা, এটাও বিবাহের উদ্দেশ্য বা মাকসাদ হতে পারে না।

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে বলা হয় শরীকে হায়াত জীবনসঙ্গী এবং জীবনসঙ্গিনী । বাস্তুত এই শব্দটির মধ্যেই দাম্পত্য জীবনের সুমহান উদ্দেশ্যটি নিহিত রয়েছে । আর যদি কোরআনের ভাষায় বলি তাহলে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো,

هنا لباس لكم وانتم لباس لهن

(তারা তোমাদের পোশাক ,আর তোমরা তাদের পোশাক)

তুমি তো কোরআন বোঝো! ভেবে দেখো দাম্পত্য সম্পর্কের কি গভীর তাৎপর্য এখানে নিহিত!

পেয়ারা হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- বিবাহ হচ্ছে আমার সুন্নত । আর বলেছেন যে আমার সুন্নতের প্রতি বিমুখ হবে সে আমার উম্মত ভুক্ত নয়।

 বিবাহ নবীর সুন্নত । সুতরাং সহজেই বোঝা যায় বিরাট ও মহান কোন মাকসাদ রয়েছে এর পিছনে।

বিবাহের আসল মাকসাদ উদ্দেশ্য হলো স্বামী ও স্ত্রী এই পরিচয়ে একটি নতুন পরিবার গঠন করা । এবং মা ও বাবা এই পরিচয়ে সন্তান লাভ করা । তারপর উত্তম লালন পালন এবং আদর্শ শিক্ষা দীক্ষা ও তারবিয়াতের মাধ্যমে নেক সন্তান রূপে গড়ে তুলে, দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করা । যাতে নাসলে ইনসানী বা মানব বংশ কেয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর পছন্দমত আগে বাড়তে থাকে।

এটাই হলো বিবাহের আসল উদ্দেশ্য । অন্য যা কিছু আছে তা সব পার্শ্ব উদ্দেশ্য । তো এখনই তুমি নিয়ত ঠিক করে নাও যে, কেন কি উদ্দেশ্যে বিবাহ করবে? উদ্দেশ্য যদি ঠিক হয়ে যায়, তাহলে দেখবে আল্লাহ চাহে তো এখনই তোমার ভিতরে কত সুন্দর পরিবর্তন আসছে । কী আশ্চর্য এক পরিপূর্ণতা নিজের মধ্যে অনুভূত হচ্ছে । আগামী জীবনের সকল দায়িত্ব পালন করার জন্য গায়েব থেকে তুমি আত্মিক শক্তি লাভ করছো । আল্লাহ তাওফীক দান করেন।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ