About Us
Emon Chowdhury - (Pirojpur)
প্রকাশ ০২/০৪/২০২১ ০৮:১৪পি এম

ফুটপাতে বেড়ে ওঠা এক অবহেলিত পরিশ্রমী নারী পিরোজপুরের রুমা

ফুটপাতে বেড়ে ওঠা এক অবহেলিত পরিশ্রমী নারী পিরোজপুরের রুমা Ad Banner

আমার তো এই দুনিয়াতে ছেলে ছাড়া আর কেউ নাই। এই ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়েই তো বেচে আছি। আর না হলে কবে আত্মহত্যা করে মরে যেতাম। জীবনের এমন অনেক কথা বলছিলেন পিরোজপুর সদর উপজেলার ভ্যান চালক রুমা বেগম। তার জন্ম পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলায়। জন্মের পরেই মা বাবার বিচ্ছেদের কারনে আর তাদের নিজ ইচ্ছায় অন্যত্র বিয়ে করায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন রুমা। বয়স যখন ৭ বা ৮ বছর কে বা কারা তাকে পিরোজপুর জেলা শহরে নিয়ে এসে ফেলে রেখে যায় তা তার মনে নাই। সেই থেকে রাস্তার ফুটপাতে ঘুম আর ভিক্ষায় চলতো জীবন। এভাবেই দিন কাটতে থাকে তার। শৈশব আর কৈশর পেরিয়ে যখন যৌবনে আসেন তখন জীবনে একটু আশার আলো দেখেন। বিয়ে হয় তার। বিয়ের কয়েক বছর পরেই জীবনের সাথে যুক্ত হয় একটি ছেলে। নাম রাখলেন ইব্রাহিম। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও সহায় হলো না। ভালো থাকা হলো না রুমার সংসার জীবনে। শেষ পর্যায়ে তার স্বামীও অন্যত্র বিয়ে করে তাকে ছেড়ে চলে গেলেন চিরতরে। ভালো থাকা হয়ে উঠলো না তার। 

তিনি অনেকবার মরতে গিয়েও পারেননি শুধুমাত্র ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে। যখনই মরার কথা চিন্তা করতেন তখনই ভেসে ওঠে ছেলেটির নিষ্পাপ মুখটি। তার জীবন তো চালিয়ে নিতে হবে কোন একভাবে। নিজে মানুষের অবহেলা ও বাঞ্চনার পাত্রি হয়েই তার বেড়ে ওঠা। কিন্তু ছেলেটাকে তো এইভাবে মানুষ করা যাবে না। তবে তাকে সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছেন এক নারী নেত্রী।

এক পর্যায়ে বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে আর চলছিল না। তবুও বেচে তো থাকতে হবে। ছেলেটার জীবনের একটা গতি তো করতে হবে। এক পর্যায়ে চিন্তা করলেন ভ্যান চালাবেন। ছেড়ে দিলেন ভিক্ষা। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। কিনলেন একটা ভ্যান। এখন নিজেই শ্রমিক আবার নিজেই ভ্যানের চালক। ভ্যান চালিয়ে টাকা উপার্যিত হলেই জুটে এক বেলা খাবার। অনেক রাস্তায় ফুটপাতে বস্তা গায়ে দিয়ে ঘুমিয়েছেন। লোকে অনেক খারাপ কথা বলেছে। তাও সহ্য করেছেন। কিন্তু এই ছোট্ট ছেলেটাকে নিয়ে তো আর সম্ভব হচ্ছে না। শেষে চিন্তা করলেন বাড়ি ভাড়ায় নিয়ে থাকবেন। অন্তত মাথা গোজার ঠাই তো হবে কোথাও। না খেয়ে থাকলেও রাস্তায় তো ঘুমাতে হবে না। তার জীবিকা এখন চলে এই ভ্যান চালিয়ে। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কাজ করে চলে পিরোজপুরে রুমা বেগমের সংগ্রামী জীবন। 

সরেজমিনে গিয়ে রুমা বেগমের সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমার দুনিয়ায় কেউ নাই, আমার একটা ছেলে আছে আমার বাপ-মা দুনিয়ায় কিছু নাই। ঘর বাড়ি নাই ওই ফুটপাতে ভ্যান গাড়ি চালাই, রোজগাড় করি। এই দিয়েই খাই ও ঘর ভাড়া দেই। পিরোজপুরে যত মিল আছে ভাড়া পাইলে সেগুলো টানি। ভাড়া যেদিন না পাই সেদিন বইসসা থাকি। না পাইলে না খাইয়া থাকা লাগে। গত ৩-৪দিন আমার কোন কাজকর্ম নাই। ভাড়া ঘরে আমার ১২০০টাকা ঘর ভাড়া। আমার থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার নিজের ইনকাম দিয়ে আমার খাবারই জুটে না। ঘরভাড়া দিতে গেলে আমার না খেয়ে থাকা লাগে। সরকার যদি আমার দিকে চাইয়া আমারে একটা ঘর দিতো আমি আরো ভালো থাকতে পারতাম। আমর মায়ে অরেকখানে বিয়া বইছে বাপে আমাকে ফাইয়া দেছে।

আমি ফুটপাতে কইতে গেলে মানুষ হইছি। এই শহরের সবাই আমারে চিনে।  আমি একটি বিয়া বইছি পরে সে স্বামীও আমারে ফালাইয়া রাইখা অন্য জায়গায় যাইয়া বিয়া বইছে এবং আমার দেখাশোনা কিছুই করে না সে। স্কুল জীবন তো আমি করতে পারি নাই। ছোট বেলা থেকেই আমি লাথি পিছা খাইয়া মানুষ হইছি। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে খয়রাত করছি, পানি টানছি, ইট ভাঙছি। আমি জীবনে খুব কষ্ট করছি। ছালা গায়ে দিয়াও ঘুমাইছি এমন দিন গেছে আমার। ইট মাথায় দিয়েও ঘুমিয়েছি বাজারের মধ্যে। মানুষের কাছে ভাত চাইতে গেছি আইডা পানি ধইরা ফিক্কা মারছে।

নৌকায় ভাত চাইছি, ভাত পাই নাই ফ্যান খাইয়া মানুষ হইছি। আমার এই শরীরে অনেক মাইরের আঘাত আছে আমি এখন আর পারিনা। আমি এখন পঙ্গু খাতায়, আমি বসলে আর ঠেতে পারি না। গাড়ী চালাতে খুব কষ্ট হয়, যখন বোঝাই গাড়ী হয় আমার টানতে খুব কষ্ট হয়। আমর বাম পাশ এখন অবস। আমার এই বাচ্চাটা মানুষ করার জন্যই আমি খালি এই কষ্ট করি। আর না হইলে কিছু খাইয়া আত্মহত্যা করতাম। আমার বাচ্চাডারে দেখার মতো কেউ নাই। আমি এখনো মানুষের লাথি পিছা খাই। রাস্তায় কাম করি দেখে মানসে কয় নষ্টা। মহিলা হয়ে বাইরে থেকে কাজ করে খাই বলে মানুষ এমনটা বলে আজ পুরুষ হলে কেউ এমনটা বলতে পারতো না।   

এ ব্যাপারে জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সালমা রহমান হ্যাপি বলেছেন, আমরা আসলে মহিলা পরিষদ সারা বছরই অবহেলিত এবং নির্যাতিতা মহিলাদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা যখনই আমরা খোজ পাই তখনই সেখানে চলে যায় এবং তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। পিরোজপুর শহরে রুমা নামের একটি মেয়ে আছে যে ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। আমরা চিন্তাভাবনা করছি আমার ব্যাক্তিগত ও মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকেও কিছু সহযোগিতা করার জন্য এবং আমি বিভিন্ন জায়গায় ওর জন্য বলেছি। আমরা স্কুল কলেজ যারা পড়াশোনা করতে পারে না আবার খরচ চালাতে পারেনা মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা তাদের সহযোগিতা করে আসছি। আমরা নারী পুরুষ মিলে আমাদের দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলবো সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।




শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ