About Us
Abdul Latif Moral - (Khulna)
প্রকাশ ০২/০৪/২০২১ ০২:৪৩পি এম

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ,বিস্তার ও চিকিৎসা নিয়ে কিছু কথা

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ,বিস্তার ও চিকিৎসা নিয়ে কিছু কথা Ad Banner

ডাঃ তুহিন

মেডিকেল অফিসার

শেখ হাসিনা বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট 


গরমে ছড়াবে না - গরমে মারা যাবে - আমাদের দেশে আসবে না - উপরওয়ালাই আমাদের বাঁচাবে - তুলসী পাতা - থানকুনি - যক্ষার টিকা দেয়া থাকলে হবে না- ইত্যাদি তত্ব শেষ করে আমাদের দেশে করোনা এসেছে আর ছড়াচ্ছেও। কয়েকজন চিকিৎসক ও আক্রান্ত । 


    বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছি করোনা নিয়ে সহজ ভাষায় কিছু লিখি। কিন্তু ফেসবুক ইন্টারনেট এর কল্যানে সবাই করোনা নিয়ে এতো পন্ডিত হয়ে গেছে যে ভাবলাম একটু পড়াশুনা করে তবে লিখি। 


   কিন্তু এবার নিজের এলাকায় বেড়াতে যেয়ে দেখলাম অনেকেই অনেক কিছু জানে তবে এত বেশি  করোনা সম্পর্কিত তথ্য তারা ইন্টারনেট বা ফেসবুকে দেখছে যে কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যা তা বুঝতে পারছে না। 


    তাই যতটুকু জানি তাই ই লিখতে বসা - সময় নিয়ে একটু পড়ে দেখলে আমার রাত জেগে লেখা সার্থক - আর কেউ বেশি জানলে আমার কম জানা কে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হোক ...


             করোনা এক শ্রেণীর ভাইরাস !


    যা অনেকদিন ধরেই মানব শরীরে বাসা বেঁধে সর্দি কাশি জাতীয় রোগ তৈরি করছে (  flu like disease ) !! এমন সর্দি কাশি জ্বর জাতীয় রোগ  আরো কিছু ভাইরাস সৃষ্টি করতে পারে - যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ( সোয়াইন ফ্লু) ভাইরাস, সিনসাইটিয়াল ভাইরাস, মেটানিউমো ভাইরাস !! এরা ঋতু পরিবর্তনের সময় যে সর্দি কাশি হয় (সিজনের সর্দি) তার জন্য ও দায়ী। 


   তবে এবারের যে করোনা ভাইরাস তা আগের করোনা বা অন্য ভাইরাস যারা সর্দি কাশি ( ফ্লু like) তৈরি করে তাদের থেকে অনেক শক্তিশালী । কারণ তারা ধাপে ধাপে নিজেদের মধ্যে জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে এমন শক্তিশালী হয়েছে - নিজেদের এতটা পরিবর্তন করেছে যে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি এর সাথে আর পেরে উঠছে না।


   প্রতি একশো বছর পর পর এমন কিছু কিছু ভাইরাস নাকি এমন শক্তিশালী হয়ে মহামারী ঘটায়! তাই প্রথমে সর্দি কাশির মতো শুরু হলেও দ্রুতই ফুসফুস ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক অঙ্গ আক্রান্ত করে রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 


এটাই হলো নতুন করোনা ভাইরাস ( novel করোনা বা covid 19) এর আসল বিষয়। তারা দ্রুত ছড়ানোর শক্তি অর্জন করেছে সাথে নতুন জেনেটিক শক্তি পেয়েছে বলে মানব শরীর তাকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত না। আর তাই অন্যান্য ভাইরাস এর আক্রমণ যেখানে self limiting (সাত থেকে দশ দিনে সর্দি কাশি হয়ে ভালো হয়) সেখানে নতুন করোনা প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। 


  বিশেষ করে তাদের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি বা অন্য কোনো রোগ শরীরে আগে থেকেই বাসা বেঁধেছে ( ডায়াবেটিস, প্রেসার বা কিডনি রোগ )।


   সুতরাং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের জন্য এই নতুন করোনা সাংঘাতিক।


                       এর লক্ষণ কি !     


  এর শুরু সাধারণ সর্দি কাশি জ্বর দিয়ে তবে দ্রুতই শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা ( যেমন কিডনি ইত্যাদি এর সংক্রমণ ) নিয়ে দেখা দিতে পারে - বিশেষ করে তাদের ক্ষেত্রে যারা বয়স্ক বা অন্যান্য জটিল রোগে আগে থেকেই দুর্বল।


            কিভাবে দ্রুত রোগ ধরা যায় !!


  দ্রুত ধরার  উপায় হলো স্পেশাল করোনা ভাইরাস কিট যা বাংলাদেশে বর্তমানে IEDCR ( স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) এর মাধ্যমে দেশের নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হচ্ছে।


    ইন্টারনেট এ যেভাবে সবাই দেখছেন - ১০ সেকেন্ড দম বন্ধ করে দেখুন - কাশি না এলে করোনা নাই - এগুলো সবই ভুয়া! 


                     

                কি এর চিকিৎসা !!!


  মেডিক্যাল সাইন্স এর উন্নতি হচ্ছে। আমরা জীবাণু কে জয় করেছি এন্টিবায়োটিক দিয়ে। কিন্তু ভাইরাস কে জয় করতে গিয়ে আমরা কি একটু পিছিয়ে যাচ্ছি !! আমার কথা মিলিয়ে দেখেন - বর্তমানের বিপদজনক রোগ যেমন হেপাটাইটিস B ও C , এইডস, ডেঙ্গু - এরা সবাই কিন্তু ভাইরাস ঘটিত রোগ। করোনা একদমই নতুন আর শক্তিশালী তাও আবার ভাইরাস ঘটিত রোগ তাই বলা হচ্ছে সঠিক চিকিৎসা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।


     

   এক কথায় চিকিৎসা হলো লক্ষণ ভিত্তিক - জ্বর হলে জ্বরের, সর্দি হলে সর্দির, শ্বাসকষ্ট হলে শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা। 


     আশার কথা হলো করোনাতে আক্রান্ত শতকরা আশি জন রোগী সামান্য চিকিৎসাতেই ভালো হয়ে যাচ্ছেন ( সূত্র WHO). আর ছোট বাচ্চাদের সংক্রামণের ঝুঁকি কম।


   তবে চীন নাকি একটা আন্টি ভাইরাল ওষুধ (জাপানে তৈরি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী ওষুধ) ব্যাবহার করে খুব আশাতীত সাফল্য পেয়েছে। আবার hydroxychloroquine (ম্যালেরিয়ার ঔষধ) ও আন্টিবায়োটিক এর একত্রিত ব্যাবহার নাকি দ্রুত কাজ করে করোনা সারাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইট করেছেন azithromycin আর hydroxychloroquine নাকি খুব কার্যকরী। 

 

                   কিভাবে ছড়ায় !


বাদুড় থেকে মানুষে ছড়িয়েছে মনে করা হলেও এটি মহামারী ( pandemic) আকারে ছড়াচ্ছে শুধু মানুষ থেকে মানুষে । একটু বেশি খেয়াল করলেই দেখবেন এটি মূলত দুটি ভাবে মানুষ হতে মানুষ ছড়াচ্ছে

     

    আক্রান্ত মানুষের লালারস তার স্পর্শ বা হাঁচি কাশি থেকে বিভিন্ন স্থানে লেগে থাকছে আর সুস্থ মানুষ এর সংস্পর্শে এসে বিশেষ করে তার হাতের মাধ্যমে তার মুখ, নাক বা চোখ এমনকি কান এ এই জীবাণুর স্পর্শ পেয়ে আক্রান্ত হচ্ছে


   আবার droplet আকারে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশির অতি ক্ষুদ্র উপাদান বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে আর ২ মিটার বা ৬ ফুটের মধ্যে থাকা সুস্থ ব্যাক্তি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে আক্রান্ত হচ্ছে।


          প্রতিরোধ কিভাবে করবো !!!!


  যেহেতু চিকিৎসা এখনো অপ্রতুল ও লক্ষনভিত্তিক । তাই প্রতিরোধ ই হলো আসল চিকিৎসা। প্রতিরোধ নিয়ে অনেক কথার মধ্যে দুটো কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ 


      # সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা

      # বার বার হাত ধোয়া


     একটা বিষয় খুব নজর দেয়ার মতো তা হলো এটি শুধু মানুষ থেকে মানুষ এ ছড়াচ্ছে আর যেহেতু যেকোনো ভাইরাস জীবন্ত প্রাণীর তথা মানুষের শরীরের বাইরে বেশিক্ষন টিকে থাকতে বা বাঁচতে পারে না। তাই আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকাই হলো আসল প্রতিরোধ। 


 কিন্তু আমরা জানি না কে কে আক্রান্ত - কারণ আপাত দৃষ্টিতে সুস্থ কোনো লক্ষণ নাই এমন আক্রান্ত ব্যাক্তি নাকি  অনেক আছেন আমাদের মধ্যে (আক্রান্তদের অর্ধেক ই এমন কোনো লক্ষণ নাই - খালি জীবাণু ছড়ায়) । 


   তাই সামাজিক দূরত্ব ( social distanting) অর্থাৎ মানুষের সাথে মানুষের মেলামেশার দূরত্ব হতে পারে এর আসল প্রতিরোধ।


  চীন কিন্তু এভাবেই মহামারী করোনা ঠেকিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা ইতালি পারেনি তাই আজ এই অবস্থা।


   যেহেতু মূলত হাতের স্পর্শে আসা জীবাণু মুখ নাক চোখ এর সংস্পর্শে এসে আমাদের আক্রান্ত করছে তাই বারবার বলা হচ্ছে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে( ২০ থেকে ৪০ সেকেন্ড ধরে)। 


  ভাইরাসের বাইরের আবরণ নাকি ফ্যাট (লিপিড) এর তৈরি তাই  সাবান দিয়ে একটু বেশি সময় ধরে ঘষে ঘষে ধুয়ে ফেললে তার আবরণ নষ্ট হয়ে সাথে সাথে মারা যায়।


   গবেষণায় দেখা গেছে আমরা দিনে তেইশ বার এর বেশি হাত দিয়ে মুখ নাক চুলকাই। 


    মুখে হাত দেয়া যেহেতু বন্ধ করা সম্ভব না তাই এক্ষেত্রে হাতের উল্টাপিঠ বা কব্জির পিছনের অংশ ব্যবহার করা যেতে পারে। 

   

   সরাসরি মুখে নাকে চোখে হাত দেয়ার আগে অবশ্যই যেন ভালো করে হাত ধুয়ে নেয়া হয়।

 


      মাস্ক পরে কি করোনা ঠেকানো যাবে !


   রাস্তায় বেরুলে আমরা সবাই মাস্ক পরছি ভাবছি আক্রান্ত কেউ কাশি দিলেও মাস্ক ঠেকিয়ে দেবে। মাস্ক ছাড়া বেরুলে পুলিশ করছে জরিমানা। পার্শবর্তী দেশে দেশে তো মাস্ক না পরলে মাইর থেরাপি চলছে। 

   

  মাস্ক কয়েক ধরনের - সবচেয়ে কার্যকরী হলো N 95 মাস্ক যা ৯৫% সুরক্ষা দেয় বাতাসে ওড়া জীবাণু হতে( অর্থাৎ 100% না) । দাম ৯০০ টাকা অরিজিনালটা। তাও নাকি একবার ব্যবহারে আর কার্যকারিতা থাকে না। 


বাজারে চলা মাস্ক গুলো শুধু ধুলোই প্রতিরোধ করে করোনা নয়। 


সার্জিক্যাল মাস্ক ই একমাত্র যেটা আমাদের জন্য কার্যকরী ভাবে ব্যাবহার হতে পারে - দামেও কম। তবে এটা একবার ই ব্যাবহার করা যায় - এমনকি ব্যাবহার করতে করতে একবার নাকের নিচে নামলেই এর কার্যকরিতা শেষ। 


 মাস্কের ক্ষেত্রে তাই বলা হচ্ছে সর্দি কাশি আছে এমন ব্যক্তি অবশ্যই মাস্ক ব্যাবহার করবেন আর তা হলো সার্জিক্যাল মাস্ক ( ওষুধের দোকানে পাওয়া যায় ফুটপাতে নয়)। জরুরি কেনাকাটার সময়েও এই সার্জিক্যাল মাস্ক ই ভরসা ( লোকজনের সংস্পর্শই আসল ভয় - জীবাণুর  droplet গুলো ৬ ফুটের মধ্যে উড়ে উড়ে বেড়ায়)


করোনা কিভাবে ছড়াচ্ছে, কি করা উচিত আমরা কতটা রেহাই পেতে পারি এমন কিছু লিংক নীচে দিলাম


 

সবশেষে মূলধারার সংবাদপত্র বা টিভি দেখে সংবাদ বিশ্বাস করবেন ফেসবুক বা ইউটিউব এর দায়িত্বহীন গুজব নয়। কথায় বলে না !!....

       

        সাপের কামড়ে মানুষ মরে না  !

                                        মরে ভয়ে !!


আবার ও বলি

  

            সময় থাকতে সাবধান হই !

            আলু আর ডাল ই খাই !!

            তাও বাইরে না যাই !!!


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ