About Us
MD.MUKSADUR BISWAS - (Mymensingh)
প্রকাশ ০১/০৪/২০২১ ০৩:৫৬পি এম

বৃষ্টিমহল ৩- ওয়াসিকা নুযহাত

বৃষ্টিমহল ৩- ওয়াসিকা নুযহাত Ad Banner

বই_রিভিউ

"বৃষ্টিমহল ৩"

লেখক: ওয়াসিকা নুযহাত

প্রকাশক: বর্ষাদুপুর

প্রকাশকাল: একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১

রিভিউ লেখক: Samanta Azadi 


"সে মানুষ চেয়ে চেয়ে ফিরিতেছি পাগল হয়ে

মরমে জ্বলছে আগুন আর নেভে না

আমায় বলে বলুক লোকে মন্দ

বিরহে তার প্রাণ বাঁচে না

দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা..."


৫১২ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের প্রায় শেষের দিকে উল্লিখিত এই গানটির মাঝে যেন ছিল হঠাৎ করেই বুকের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করে দেওয়ার এক আশ্চর্য জাদুকাঠি। 


প্রথমেই বলে নিই, "বৃষ্টিমহল" সিরিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, লেখক এখানে কোন ১/২টি চরিত্রকে প্রধান চরিত্রের স্থান দেননি। বরং ৬ বন্ধুদের সকলকেই তাদের নিজেদের জায়গায় প্রধান চরিত্র হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যা, ১ম ও ২য় খণ্ডেই পাঠক টের পেয়েছেন। সামি, হৃদি, রুদ্র, বিভা, আকাশ ও অমৃতা। যাদের কাছে বন্ধুত্ব হল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা মাইলফলক। ক্লান্ত আবসাদগ্ৰস্ত ধূলিমাখা ধূসর পৃথিবীতে ৬ বন্ধু স্বপ্ন দেখে একটা কাঁচ দেওয়ালের, যার নাম "বৃষ্টিমহল"। 


"ভালোবাসা"- যা কখনো হাজিরা দিয়ে আসে না। মানে না কোন সামাজিক নিয়ম, জাত বা ধর্মের গণ্ডি। ভালোবাসার নেই কোন বয়স বা নির্দিষ্ট সীমারেখা। তবে  বাঁধা আছে ঢের। এই সমাজ সংসার, প্রকৃতি ও বাস্তবতার যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হয় প্রেম। বুকের গভীরে অপ্রকাশিত থেকে যায় ভালোবাসা। তবে শুনেছি, যেখানে যতো বেশি বাঁধা, সেখানে ততো বেশি ভালোবাসার বিস্তার। আর এই কথাটি প্রমাণ করে দিয়েছে "অমৃতা চৌধুরী" নামক চরিত্রটি। শুধু এই বইয়েই নয়, পুরো বৃষ্টিমহল সিরিজে যদি আমার সবচেয়ে প্রিয় কোন চরিত্র থাকে, তাহলে আমি সবার প্রথমে এই নামটিই নিব, -- "অমৃতা"। প্রকৃত অর্থেই অসাধারণ একটা চরিত্র। কারণ কেউ চাইলেই অমৃতা হতে পারবে না। আর আমি চাইও না কারো ভাগ্য অমৃতার মতো হোক। কারণ, যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে এই মেয়েটিকে প্রতিনিয়ত জ্বলে পুড়ে ছারখার হতে হয়েছে, আশা করি কারো ঘোর শত্রুরও যেন এমনটা কখনো না হয়।


পুরো উপন্যাসে মনে গেঁথে যাওয়ার মতো অনেক লাইন ছিল। বাংলা ভাষারই অনেক বিচিত্র শব্দের সমাহারে সিক্ত এই "বৃষ্টিমহল ৩"। কিন্তু, আটকে গিয়েছিলাম এই প্যারায় এসে, যা কি না পরিস্থিতির সাথে মিশে গিয়ে খুব গভীর ভাবে পাঠকমনকে নাড়িয়ে দিয়েছে.... 


"এ পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ কিছু দেখতে না পেলেও তাকিয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকা নিয়ম বলে। সত্যটা জানার পরেও মিথ্যে বলে, সত্য লুকানো নিয়ম বলে। ভালো না বাসলেও ঘর করে, ঘর করা নিয়ম বলে। কেউ নিয়ম ভাঙলে ধিক্কার দিতে আসে, ধিক্কার দেওয়া নিয়ম বলে। আহা! বড়ই নিয়মসর্বস্ব মানুষের জীবন!"


সত্যিই তো, এতো এতো নিয়মের মাঝে থেকে হঠাৎই যদি মন একটু বেপোরোয়া হয়ে ওঠে, তাহলে তাকে কি প্রশ্রয় দেওয়া যায়? সমাজ- সংসার কি তা কখনো মেনে নেবে? বেপোরোয়া, বিদ্রোহী মনের এই ভাব প্রকাশ করার সাহসিকতা কি সবার মধ্যে থাকে? নাকি কেউ সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে সমাজের চোখে নিয়মহীন,উদ্যত সেই সত্যকে প্রকাশ করতে পারে? তাকে যে সবাই তিরস্কার করবে, ভর্ৎসনা করবে। কিন্তু হ্যাঁ, একজন পেরেছিল। সমাজের এই সকল নিয়ম নীতির পরোয়া না করা, সৎ, সাহসী, নির্ভীক , কর্মঠ, চটপটে ও একচ্ছত্র ব্যাক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী "অমৃতা"। 


"রাশেদ" চরিত্রটিকেও আমার বেশ ভালো লেগেছে। অল্প বয়স থেকেই সততা, নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা, একাগ্ৰচিত্ততা, ন্যায়বোধ আর সাহসিকতার সংমিশ্রণে লোকের কাছে, সমাজের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন একজন দেবতুল্য মানুষ হিসেবে। জগৎ সংসারের সকল ঝড়-ঝাপটা, জোয়ার- ভাটা তিনি একা হাতেই সামলে গিয়েছেন। সামন্ত রক্তের তেজ তার শিরা উপশিরায় আজও বহমান। দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করতে করতে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের অনেকগুলো বসন্ত, হয়ে উঠেছেন একজন আদর্শ দেশপ্রেমিক ও তুখোড় রাজনীতিবিদ। বাস্তববুদ্ধি ও ব্যাক্তিত্বের জোড়ে সর্বত্রই আজ তার প্রভাব প্রতিপত্তি। তবুও নিজ সত্তার কাছে একটা অসহায় বোধ যেন থেকেই গেল। দিনশেষে সেও জানতে পারল, সুখী হওয়ার জন্য আসলে সবচেয়ে বেশি দরকার মানসিক শান্তি। প্রশান্তির এই ঘটটা যেন ফাঁকা... হয়তো তা পূরণ হতে পারত। 

প্রথম থেকে শেষ অবধি তাঁর সততায় আমি মুগ্ধ। বিশেষ করে, নিজ পুত্রের সামনে দাঁড়িয়ে অকপটে তিনি যে নির্ভেজাল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, তাতে চূড়ান্ত পর্যায়ে অবাক না হয়ে থাকতে পারিনি। 


এছাড়াও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য চরিত্রগুলোও খুব সুন্দর ভাবে উপন্যাসটির কাহিনী ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র এবং সংলাপ বইটিতে প্রাণের সঞ্চার করেছে। প্রতি অধ্যায়ে ছোটখাটো সাসপেন্স তৈরি করার ফলে বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরানোর কোন সুযোগই দেন নি লেখক। উপন্যাসটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠককে এক পৃষ্ঠা থেকে অন্য পৃষ্ঠায় খুব অনায়াসেই টেনে নিয়ে যাবে লেখকের মেধাশক্তির সুনিপূণ সৃজনশীলতা। 


বইটির উপসংহতি ঘটেছে বন্ধু হতে প্রাপ্ত একটা হৃদয়গ্ৰাহী ই-মেইল বার্তা দ্বারা। যা পাঠককে একইসঙ্গে করবে ইমোশনাল ও মন্ত্রমুগ্ধ। একদিকে বাস্তবতা অন্যদিকে নিখাদ ভালোবাসা, আরেকদিকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি প্রিয় বন্ধুর ভেঙে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত মন এবং পিতার সাথে পুত্রের এক আশ্চর্য মনোস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া! সবাই যার যার অবস্থানে সঠিক। কিন্তু পাঠক কাকে ছেড়ে কাকে বেছে নেবেন? কাকে ঘৃণা করবেন? আর কাকেই বা ভালোবাসা দেবেন? লেখকের যৌক্তিকতা যে সর্বত্রই শক্তিশালী। তবে, যাকেই মূল্যায়ন করুক না কেন পাঠক এড়িয়ে যেতে পারবেন না ওয়াসিকা নুযহাতের লেখনীর ধারালো যৌক্তিকতাকে।


নশ্বর এ পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এক জীবনে কেউই নিজের রপ্ত করা জ্ঞানটুকু পৃথিবীতে প্রজন্মর পর প্রজন্মতে ছড়িয়ে দিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু "বৃষ্টিমহল ৩" থেকে যাবে, যে কিনা যুগের পর যুগ নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে যাবে লেখকের শ্বাশত বাণী, "পারফেকশন বলে কিছু নেই পৃথিবীতে। সব কিছুর মধ্যেই ভালো মন্দ দুটি দিক থাকে। যে লোকটা আজকে সাধু সন্ন্যাসী হয়েছে খোঁজ নিয়ে দেখো সেই সন্ন্যাসীর জীবনেরও একটি কালো অতীত আছে। আবার যে লোকটা ভয়ঙ্কর অপরাধী, তারও সফেদ একটি অতীত বা ভবিষ্যত আছে।" 

এছাড়াও, এককেন্দ্রিক ধরনের মানুষদের বুঝিয়ে দেবে যে, 

 "প্রত্যেকটা সম্পর্কেরই পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। ভালো লাগা গুলো শেয়ার করতে হয়। মনের কথা সরাসরি বলতে হয়।"

কিংবা, টাকার পেছনে অনবরত ছুটে চলা মানুষটিকে উপলব্ধি করাবে যে, 

"জীবনে আসলে সত্যিকারের পাওয়ার মতো করে কিছুই পায় না মানুষ। টাকাপয়সা, মানসম্মান, খ্যাতি এর কোনো কিছুই মনের সাথে লেগে থাকে না। মনের সাথে লেগে থাকে শুধু স্মৃতি। তাই মানুষের উচিত বেশি বেশি করে স্মৃতি কুড়িয়ে নেওয়া।"

রোজকার ব্যাস্ততায় ঘেরা দিনের ফাঁকে, বৃষ্টিমহলের নির্যাস যেন পাঠককে তার যৌবনে বন্ধুদের সাথে কাটানো গোধূলি লগ্নের সোনালী বিকেলগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিছু সময়ের জন্য হলেও সুন্দর স্মৃতিচারণে আকন্ঠ ডুবিয়ে রাখে ভালোবাসার "বৃষ্টিমহল"




শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ