MD. Saad bin shafiq - (Khulna)
প্রকাশ ০৯/০৩/২০২১ ০৪:০০পি এম

ওষুধের ইতিহাস

ওষুধের  ইতিহাস Ad Banner

ওষুধ কী ? অসুখ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই । তিনি পরীক্ষানিরীক্ষা করে কিছু ওষুধের নাম লিখে দেন । আমরা সেই সব ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে যাই। তাই সাধারণভাবে বলা যায় যে, যা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা রোগমুক্ত হই তাই ওষুধ।

ওষুধটি কেমন হবে তা নির্ভর করে করে আমরা কন ধরণের ডাক্তারের কাছে যাই তার ওপর । এলোপ্যাথি ডাক্তার সাধারণত ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা সিরাপ খেতে দেন । অন্যদিকে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার দেন সাদা মিষ্টি পাউডারের পুরিয়া, ছোট ছোট সাদা দানার মতো বড়ি  বা কোন তরল যা ড্রপারে করে এক বা দুই ফোঁটা খেতে হয় ।

আবার কবিরাজ দেন বিদঘুটে স্বাদের লতাপাতার পাচন ।যে ধরণের ডাক্তারের কাছেই আমরা যাই না কেন, প্রত্যেকেই কিছু না কিছু ওষুধ দেন আরোগ্য লাভের জন্য । সুতরাং বলা যায় যে ওষুধের উদ্দেশ্য একটাই – রোগমুক্তি ।  চিকিৎসাশাস্ত্র ওষুধের সংজ্ঞা দেয় আরেকটু ব্যাপকভাবে ।

এই মতে, সুস্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণ, রোগ প্রতিরোধ এবং অসুস্থতা থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য আমরা যা যা করি তার সবই ওষুধের অন্তর্ভুক্ত ।

উধাহরণস্বরূপ একজন ডায়াবেটিস রোগীর কথা ধরা যাক । ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি মুখে ওষুধ খান, সকাল-বিকাল ১ ঘন্টা করে হাঁটেন, চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলেন, প্রতিবেলায় পরিমাণমত খাবার খান ইত্যাদি ।

আমরা জানি ডায়াবেটিস এমন একটি অসুখ যা কখনই সম্পূর্ণ ভাল হয় না । এই রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় মাত্র । অর্থাৎ, সুস্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই রোগীকে অবশ্যই অনেকগুলো কাজ করতে হবে বা বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে ।

এক্ষেত্রে নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি সবই ওষুধ হিসেবে গণ্য হবে । কারণ রোগ নিয়ন্ত্রণে এদের সবকটিরই সরাসরি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে ।  ওষুধের ইংরেজি পরিভাষা হিসেবে ড্রাগ (Drug) অথবা মেডিসিন (Medicine) দুটোকেই সাধারণত ব্যবহার করা হয় ।

চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী যে কোন বস্তু যা গ্রহনের পর শরীরে প্রতিক্রিয়া তৈরিতে সক্ষম তাকে ড্রাগ বলে । যেমন– সিগারেট বা তামাকের নিকোটিন, চা-কফির ক্যাফেইন প্রভৃতি । সাধারণত ড্রাগ ব্যাপক অর্থে ব্যাবহৃত হয় । অন্যদিকে যে সব ড্রাগ শুধুমাত্র রোগমুক্তি ও রোগ প্রতিরোধে ব্যাবহৃত হয় তাদেরকে মেডিসিন বলে । যেমন- এন্টিবায়োটিক ।

একজন দক্ষ ওষুধবিজ্ঞানী তার জ্ঞান ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ড্রাগকে ওষুধে পরিণত করেন । 

ড্রাগ সাধারণত দুটি উৎস হতে প্রাপ্ত : ১. প্রাকৃতিক উৎস : বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ, প্রানীদেহ এবং খনিজ হতে প্রাপ্ত । ২. কৃত্রিম উৎস : ল্যাব্রেটরিটে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয় ।

ওষুধের ইতিহাস প্রাচীনকালে মানুষ রোগমুক্তির জন্য যেসব ওষুধ ব্যাবহার করতো তার অধিকাংশই ছিল ভেষজ । ভেষজ ওষুধের ইতিহাস মানব সভ্যতার মতই পুরোনো । বিভিন্ন প্রাচিন নথি-পত্রে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খ্রিস্টযুগের বহু আগে থেকেই চিন, ভারত, মিশর, গ্রিস ইত্যাদি সভ্যতায় গাছ-গাছড়া, লতাপাতা থেকে তৈরি ওষুধ ব্যাবহার করা হতো ।

‘এবারস প্যাপিরাস’ (Ebers Papyrus) হল এমনই এক প্রমাণ যা খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ১৬০০ বছর আগে লিখিত । এটি একটি ৬০ ফুট লম্বা এবং ১ ফুট চওড়া কগজের স্ক্রল (Scroll) যা অনায়াসে গুটিয়ে রাখা যায় । এতে আছে  বিভিন্ন ধরণের ৭০০টি ওষুধের বর্ণনা এবং ৮০০টিরও বেশি ফর্মুলা (Formula) যা চিকিৎসায় ব্যাবহার করা হতো ।

এসব ওষুধের মধ্যে রয়েছে এমন সব বিভিন্ন ওষুধের বর্ণনা, যার অনেকগুলোই বর্তমান শতাব্দীতেও ব্যাবহার করা হয় ।  ইমহোটেপ ঐতিহাসিকরা ইমহোটেপ নামে খ্রিস্টপূর্বে প্রায় ৫,৭৩৬ বছর আগে জন্মগ্রহণকারী মিশরের একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের সন্ধান পেয়েছেন।

যিনি মৃতদেহে সংরক্ষণের জন্য মমি তৈরির কৌশল আবিষ্কার করেন । পিরামিডের ভেতরে যে মমি পাওয়া যায় তা তিনি তৈরি করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন । অসামান্য প্রতিভার ইমহোটেপ ছিলেন একজন মিশরীয় সম্রাট বা ফারাও ।

তিনি ইতিহাসে একাধারে প্রথম স্থাপিত, প্রথম প্রকৌশলী এবং প্রথম চিকিৎসক হিসেবে বিবেচিত । এবারস প্যাপিরাস অনুযায়ী তিনি অনেক গাছগাছড়া ওষুধ হিসেবে ব্যাবহার করেছেন যার মধ্যে এসফাটিডা, খেজুর, রসুন, ক্যাস্টর অয়েল ইত্যাদি রয়েছে।

তিনি যুদ্ধে আহত সৈন্যদের হাড় জোরা লাগানোর জন্য বিশেষ ব্যান্ডেজ লতাগুল্ম ব্যাবহার করতেন । আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে ইমহোটেপ কিভাবে এত জটিল চিকিৎসা করতেন তা ভাবতে বিস্ময় জাগে ।  শেন নাং চীনারা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫,০০০ বছর আগে থেকে ভেষজ ওষুধ ব্যাবহার করত ।

খ্রিস্টপূর্ব ২,০০০ সালে চীনের সম্রাট শেন নাং রচনা করেন ‘পেনটি’-সাও’ (Pen-ti-Sao) নামের এক ভেষজ গ্রন্থ । এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরনো চৈনিক ওষুধ বিষয়ক বই । তিনি নতুন ওষুধ নিজের শরীরেও প্রয়োগ করতেন।

তার গাছপালার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল । সেই সময় একবার চীনে শিকারের অভাবে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে শেন নাং তাঁর জনগণকে চাষাবাদে উৎসাহিত করেন এবং তাদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষাদান করেন । তাঁর এই অবদানের জন্য তাকে চীনের কৃষির জনক বলা হয় ।

কথিত আছে যে, শেন নাং প্রথম চা আবিষ্কার করেন । তিনি চা প্রস্তুত প্রণালী এবং এর ওষুধি গুণ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন । তিনি চিকিৎসা কাজে  ব্যবহৃত উদ্ভিদের শ্রেণি বিন্যাস ও মানদণ্ড তৈরি করেন । শেন নাং যেসব ওষুধের কথা উল্লেখ করেছেন তাঁর মধ্যে আজকের দিনেও ব্যবহৃত হয় এমন ওষুধ যেমন রুবার্ব, পডোফাইলাম, জিনসেং, ইফিড্রা ইত্যাদি রয়েছে ।

তাঁর এই কাজকে চৈনিক ফার্মাকোপিয়ার (Pharmacopoiea) ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় ।  চরক খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৮০০ সালে চরক তাঁর লিখিত ‘চরক সংহিতা’ বইতে এরকম ৫০টি শ্রেণী তৈরি করেন যার প্রতিটি ছিল ১০টি করে ওষুধ ।

তাঁর মতে এই ৫০ ধরণের ওষুধ ছিল একজন চিকিৎসকের মূল হাতিয়ার । চরক ছিলেন কাশির মহারাজার রাজবৈদ্য । তিনি তাঁর ওষুধগুলোকে ‘আসব’, ‘অরিষ্ট’, ‘বটিকা’, ‘চূর্ণ’, ‘তৈল’, ইত্যাদি উপস্থাপনায় বা ডোজেস ফর্মে তৈরি করতেন তাঁর চিন্তাধারা ও চিকিৎসা পদ্ধতির হাত ধরেই আজকের আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠা । তাঁর ‘চরক সংহিতা’ বইটিই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রথম বই । তিনি শারীরবিদ্যা, রোগতত্ত্ব এবং ভ্রুণ বিদ্যার সুপণ্ডিত ছিলেন তিনি ওষুধের উৎসগুলোকে উদ্ভিজ, প্রাণীজ ও খনিজ –এই তিনভাগে বিভক্ত করেন ।

তাঁর বই থেকে আমরা আজ থেকে প্রায় ২,৮০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে কি ধরণের অসুখ হতো, সেগুলোর চিকিৎসায় কি ওষুধ ব্যাবহার হতো, কিভাবে সেগুলো তৈরি হতো, কোন মাত্রায় (Dose) ব্যাবহার হতো, এমনকি রোগীর পথ্য কি হবে এসব বিষয়ে জানতে পারি।

ইউরোপের বিজ্ঞানীরা তাকে ‘ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক’ বলে অবিহিত করেন ।  শুশ্রুত একইভাবে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬০০ সালে সুশ্রুত তাঁর ‘শুশ্রুত সংহিতা’ বইতে ৭৬০ ধরণের ওষুধকে তাদের সাধারণ গুণ অনুযায়ী ৭টি গোষ্ঠীতে ভাগ করেন ।

প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় চিকিৎসার পাশাপাশি তিনিই প্রথম অস্ত্রোপচার পদ্ধতি প্রবর্তন করেন । ভারতীয় সভ্যতায় তিনি অস্ত্রোপচার বা শল্যবিদ্যায় অসামান্য অবদান রেখে গেছেন । তিনি অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত ১২০টি বিভিন্ন যন্ত্রপাতির নকশা লিপিবদ্ধ করেন যা আজও অনুসরণ করা হয় ।

চরক শুশ্রুত যে কাজ করে গেছেন সেগুলোই আজকের আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রের ভিত এবং মূল তত্ত্ব । হিপোক্রাটিস  ওষুধ বিজ্ঞানের ইতিহাসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে গ্রিস ও রোমের চিকিৎসকদের মধ্যে হিপোক্রাটিস, ডিওসকোরাইডিস, গ্যালেন প্রমুখ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ।

হিপোক্রাটিস এতোই বিখ্যাত যে তাকে ইউরোপ মহাদেশের বিজ্ঞানীরা ‘ফাদার অব মেডিসিন’ নামে অভিহিত করেন । তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪২৫ সালে গ্রিসে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর লিখিত বইয়ের নাম ‘ম্যাটেরিয়া মেডিকা’ যা তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর পর্যন্ত মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পড়ানো হতো।

তিনি চিকিৎসকদের নৈতিকতার ওপর খুব জোর দিতেন । যে কারণে নবীন চিকিৎসকদের পেশায় প্রবেশকালে নৈতিকতার শপথ নেয়ার জন্য ‘হিপোক্রাটিক ওথ’ রচনা করেন, যা আজো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুসরণ করা হয়।

ডিওসকোরাইডিস<ডিওসকোরাইডিস ৩০ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কে জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীতে রোমে চলে যান এবং কালক্রমে সেখানে বিখ্যাত সম্রাট নিরোর প্রধান চিকিৎসক হিসাবে নিযুক্ত হন । সম্রাট ও সেনাবাহিনীর সাথে তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন ।

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের চাইতে তিনি ভ্রমণরত সেই সব দেশের চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে তথ্য বিনিময়ে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন । এভাবে তিনি বিভিন্ন দেশের সহস্রাধিক গাছগাছড়ার ছবি এঁকে এগুলোর ওষুধি গুনাগুনের কথা লিপিবদ্ধ করে ‘দ্য মেটেরিয়া মেডিকা’ (De Materia Medica) নামে বই লিখে গেছেন ।

পরবর্তীকালে তাঁর এই বই ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে অনেকগুলো ভাষায় অনুবাদ করা হয় । তাঁর মৃত্যুর দেড় হাজার বছর পরেও এই বইটি মেডিক্যাল ছাত্রদের পাঠ্য ছিল । রোমের আরেকজন অত্যন্ত বিখ্যাত চিকিৎসক গ্যালেন ১৩০খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন ।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে তিনি ছিলেন প্রথম ফার্মাসিষ্ট । তিনি মলমকে উন্নত করেন, ইমালশান আবিস্কার করেন এবং তিনি সর্বপ্রথম কোল্ড ক্রীম তৈরি করেন । তাঁর লেখা, চিন্তাধারা ও চিকিৎসা পদ্ধতি প্রায় দুই হাজার বছর ধরে চিকিৎসা শাস্ত্রকে প্রভাবিত করছে ।

তিনি ছিলেন হিপোক্রাটিসের চিন্তাধারার সমর্থক । তিনি বানর ও শুকরের দেহ ব্যবচ্ছেদ করেন এবং ধারনা করেন যে এদের সাথে মানবদেহের অনেক মিল রয়েছে । গ্যালেন স্নায়ুতন্ত্রের উপর বহু পরীক্ষা করে তত্ত্ব প্রদান করেন যে, ‘মস্তিষ্ক সব মাংসপেশির কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে’।

আল রাজী অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় আরব চিকিৎসকদের ইতিহাস অত্যন্ত নবীন । মাত্র প্রায় ১০০০বছর পূর্বে এই চিকিৎসকরা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তাঁদের অসামান্য জ্ঞান-প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন । এঁদের মধ্যে আলি রাজী, ইবনে সিনা প্রমুখ ছিলেন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।

আল রাজী চিকিৎসার মূল ভিত্তি হিসেবে রসায়নকে গ্রহণ করেন । তখন রসায়নকে বলা হতো ‘আল কেমি’ । তিনি রসায়ন শাস্ত্রের অত্যন্ত বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ছিলেন ।

তিনিই প্রথম চিকিৎসা ক্ষেত্রে গাছগাছড়ার বদলে মূল উপাদান বা পিওর কেমিক্যাল ব্যাবহার শুরু করেন । ইউরোপের বিজ্ঞানীরা আল রাজীকে ‘র‍্যাজেস’ নামে ডাকেন ।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ