About Us
Ashadul Islam - (Dhaka)
প্রকাশ ০৯/০৩/২০২১ ০৫:২২পি এম

বগালেক এবং কেওক্রাডং ভ্রমণ

বগালেক এবং কেওক্রাডং ভ্রমণ Ad Banner

আল্লাহ তলোয়ার নাম নিয়ে আমরা ৭ জন বেড়িয়ে গেলাম। ৭ দিন আগেই আমরা শ্যামলী বাসের টিকেট কেটেছিলাম।আমাদের বাস ছিলো রাত ১০.৩০ মিনিটে।যাইহোক সবার কাছে একটা রিকুয়েষ্ট, কেউ বান্দরবান শ্যামলী তে যাবেন নাহ,অনেক ফালতু সার্ভিস।

তার উপর কুমিল্লায় যেখানে ব্রেক দেয়,সেখানে খাবারের দাম অনেক বেশি।আমাদের মত বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য জামেলা,সর্বনিম্ন খাবার ২৬০ টাকা।তাহলে গল্প শুরু করা যাক,আমার রিভিউ গুলা অনেক বড় হয় কারন আমি খুটিনাটি সব তুলে ধরি আর আমার রিভিউ পড়লে তার আর কারো হেল্প দরকার হবে নাহ।

সকাল ৭ টার দিকে আমাদের নামালো বান্দরবানের হোটেল হিল ভিউর সামনে।নেমেই আমরা ফ্রেস হয়ে একটা নরমাল হোটেলে নাস্তা করলাম।আর আমরা আসার আগেই আমাদের আগেই বুকিং দেওয়া চান্দের গাড়ি ঐখানে ছিলো। ড্রাইভারের নাম ছিলো মিন্টু, নাস্তা করে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম আমাদের যাএায়। ১.৩০ ঘন্টা পর পৌছে গেলাম Y-জাংশন।এখান থেকে একটা রাস্তা গেছে থানচি & আরেকটা রোমা।সো আর্মি ক্যাম্পে সবার NiD দেখিয়ে আবার রওনা দিলাম।

আমরা দুপুর ১২ টার দিকে রুমা বাজার।দেখা হয়ে গেলো আমাদের গাইড রঞ্জন দাদার সাথে।দাদা সব পেপার ম্যানেজ করলো,সবার নাম,ঠিকানা,নাম্বার লিখে ফরম নিয়ে চলে গেলার আর্মি ক্যাম্পে। এখান থেকেই মুলত আমাদের বগালেক আর কেওক্রাডং পারমিট নিতে হবে।সো খুব সহজেই কাজ শেষ হয়ে গেলো।তারপর আমরা রুমা বাজার থেকে ট্রেকিং জুতা কিনলাম।আর রাতে BBQ করবো,তার জন্য মুরগী & মশলা যা যা লাগে কিনলাম।আর শুকনা খাবার লাগবে ট্রেকিং এর সময়,তাও কিনে নিলাম।মনে রাখবেন এটাই শেষ বাজার,যা লাগে এখান থেকেই নিবেন।এরপরে আর কোনো বাজার নাই।

সব কাজ শেষ করে আমরা রঞ্জন দাদাকে নিয়ে চান্দের গাড়িতে উঠলাম বগালেকের উদ্দেশ্য। ১০ মিনিট পরেই মিলনছড়িতে আরেকটা চেকপোস্ট। আপনাকে চেকপোস্টর জন্য সবসময় এলার্ট থাকতে হবে।আর মাদক,ড্রোন,ফানুস,আতশবাজি এগুলা নিষিদ্ধ, ধরা পড়লে বিপদ।

সো বগালেক যাওয়ার রাস্তাটা জোস ছিলো।তাই আমরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। যখন মিন্টুদা জোরে টান দেয়, আমরা একসাথে সবাই চিল্লাই।সকালে আসার সময় অনেক শীত ছিলো,সবাই জিম ধরে বসে ছিলাম,তাই মজা করতে পারি নাই।তাই রোমা থেকে বগালেক যাওয়ার ১৭ কিঃমিঃ রাস্তা অনেক মজা করলাম।

২.৩০ সময় আমরা বগালেক পৌছালাম।আর্মি ক্যাম্পের ফরমালিটিস শেষ করে বগালেক নামলাম।আমরা আগেই সিয়াম দিদির কটেজ বুকিং ছিলো।আমরা  ৪ নাম্বার কটেজে ছিলাম।এই কটেজে নরমালি থাকে ১২ জন কিন্তু আমরা আগেই বুকিং করায় আমরা ৭ জন ছিলাম।

কটেজ থেকে ওয়াশরুম একটু দূরে।তাতে কি,বগালেকের কোলগেসে বানানো কটেজে তো থাকতেই হবে।তারপর আমরা ব্যাগ রেখে,কটেজের বড় বারান্দায় কিছুক্ষণ বসে রেস্ট নিলাম।তারপর সবাই লেকের ঘাটে গেলাম।কেউ গোসল করছে আবার কেউ হাত-মুখ ধুয়েছে।

আমার বাইরের পানি শুট করে নাই,তাই ফ্রেস হইলাম লেকের পানি দিয়ে।কটেজে আসার সময় সিয়াম দিদির অনেক গুলা তেতুল গাছ।প্রচুর ধরেছে।আমাদের দিলো অনেকগুলা।কটেজে গিয়ে বসে বসে লবন দিয়ে খেলাম।তারপর গিয়ে দেখি সিয়াম দিদি আমাদের জন্য খাবার রেডি করে রাখছে।ভাত,ডিম,আলু ভর্তা,লাউ সবজি,ডাল আর সালাদ।১৫০ টাকা প্যাকেজ। আর মুরগী খেলে ১৭০ টাকা।যাইহোক ক্ষুধা ছিলো সবার,পেটপুরে খেলাম।খাওয়া শেষে আবার কটেজে গেলাম।সবাই যার যার মত রেস্ট নিলো।তারপর বিকেল ৫ টার দিকে বের হলাম সবাই।পুরো বগালেক এই মাথা থেকে ঐ মাথা চক্কর দিলাম।ছবি তুললাম,চা খেলাম,আদিবাসীদের সাথে কথা বললাম।২ দিন পর তাদের ক্রিসমাস, তাই তারা সবাই ঘর,হোটেল,দোকান সাজাচ্ছে।

৭.০০ টার  সময় দাদা ফোন দিয়ে বললো,দাদা সব রেডি।গিয়ে দেখি দাদা আমাদের কটেজের সামনে কাঠ দিয়ে আগুন জালিয়েছে।১০০ টাকার কাঠ কিনতে হইছে আর BBQ করার জন্য দাদাকে ২০০ টাকা দিতে হবে।সবাই গোল করে বসলাম আগুনের চারপাশে।দাদা মাংস পুরাচ্ছে।আমরা গান-বাজনা করছি।ছবি তুলছি।সিয়াম দিদিকে আমরা লুচির অর্ডার দিয়ে আসছি।BBQ হয়ে গেলো,তারপর আমরা রুমে গিয়ে সবাই জম্পেশ একটা খাওয়া দিলাম।

দাদা অসাধারণ BBQ করছে।তারপর আমরা বাইরে গেলাম ব্যাম্বু টি খেতে।চা খেয়ে কিছুক্ষণ বাইরে সময় কাটিয়ে কটেজে আসলাম।তারপর আসি মজার কাহিনিতে,রাতে ঘুমানোর আগে সবাই পেট হালকা করবে কিন্তু বাথরুম হচ্ছে মাএ ৩ টা।সো আমরা সিরিয়াল ধরে গেলাম।

এটাও একটা মজা ছিলো,কে আগে যাবে, কে পরে যাবে।তাই আমরা লটারি দিলাম,যার যেমন সিরিয়াল আসছে সে সেভাবেই গেছে রাত ১১.৩০ দিকে আমরা সবাই শুয়ে পড়লাম।ওহহ ভালো কথা,এখানে ১০ টার পর আর্মি টহল দেয়,সো ১০ টার পর বের হওয়া যায় নাই।কাল কেওক্রাডং এর যাএা, তাই সকালে উঠতে হবে,তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম একেক জন ৪-৫ টা কম্বল আর ২ টা বালিশ নিয়ে, শুভ রাএী।

সকাল ৬.৩০.সবাই ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসে ব্রাশ করলাম।তারপর সকাল ৭ টার দিকে সিয়াম দিদির দোকানের সামনে গেলাম।রাতেই খাবার অর্ডার দেওয়া ছিলো সকালের নাস্তার।এখানে খাবার আগে অর্ডার দেওয়া লাগে।সকালে খাবার ছিলো আমাদের খিচুড়ি,ডিম,বেগুন ভাজি,আলু ভর্তা,সালাদ।

প্যাকেজ ১২০ টাকা।খিচুড়ি আনলিমিটেড।অনেক ভালো সকালের নাস্তা হলো।তারপর ক্রিসমাস উপলক্ষে দিদি গেস্টদের  সবাইকে ফ্রি চা খাওয়াচ্ছে।চা খেয়ে দিদির কাছে সবাই ব্যাগের অর্ধেক জিনিস দিয়ে ব্যাগ হালকা করে নিলাম।কারন এখন থেকে ট্রেকিং শুরু,সো ব্যাগ যত হালকা হবে ততই কষ্ট কম হবে।আল্লাহর নাম নিয়ে হাটা শুরু করলাম।প্রথম ১ ঘন্টা সবাই মজা করতে করতে হাটলো,প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখলো,ছবি তুললো।১ ঘন্টা পর আসলো চিংড়ি ঝর্না। সেখানে আমরা কিছু সময় ছিলাম।তারপর আবার হাটা শুরু করলাম।আর ১৫-২০ মিনিট পর পর ছোট টং দোকান পাবেন,যেখানে কলা,পেপে,কমলা,জাম্বুরা,সরবত বিক্রি করে।আমরা সব দোকানে রেস্ট নিছি।কারন আমার এটা ৫ম ট্রেকিং কিন্তু আমার গ্রুপের সবাই ১ম ট্রেকিং করছে। তাই একটানা না হেটে, রেস্ট দিছি বেশি।কলা আর পেপে বেশি বেশি খাইছি।

আমরা দার্জিলিং পাড়া আসার একটু আগে একটা দোকানে জাম্বুরা ভর্তা খেয়েছি।বুঝাতে পারবো নাহ,কত মজা ছিলো।৩ ঘন্টা ধরে হাটতেছি,প্রচুর টায়ার্ড,আর অনেক রোদ,সো বুঝতেই পারছেন কেন এত মজা পাইছি।যাইহোক, আর একটু হেটেই পৌছে গেলাম বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর & পরিস্কার গ্রাম দার্জিলিং পাড়া।চোখে নাহ দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন নাহ,একটা পাহাড়ের গ্রাম,এত সুন্দর করে পরিস্কার পরিছন্ন করে রাখছে।সত্যি অসাধারণ। দয়া করে কেউ ওখানে গিয়ে ময়লা রাস্তায় ফেলবেন নাহ,সুন্দর করে ডাস্টবিন বানানো আছে সেখানে ফেলবেন।দার্জিলিং পাড়া থেকে কেওক্রাডং এর চূড়া দেখা যায়।দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম,দাদা বললো এইতো এসে গেছি আর ২০ মিনিট।

আমরা শুধু উপরের দিকেই উঠছি কিন্তু দাদার ২০ মিনিট শেষ হয় নাহ।আর পুরো ট্রেকিং করে যা কষ্ট হবে,এই লাস্টের দার্জিলিং পাড়া থেকে চূড়ায় উঠা তার সমান কষ্ট। কারন এইটুকুর কোনো সমতল নেই,খালি উপরের দিকেই উঠতে হবে।পা আর উঠতে চায় নাহ,মনে হবে পা ধরে ধরে উপরে উঠাচ্ছি।আমার গ্রুপের কয়েকজন তো হাপিয়ে শেষ,তাদের সান্তনা দিছি আমাদের পিছনের গ্রুপে ৪-৫ জন মেয়ে ছিলো,সবাই অনেক মোটা ছিলো।সো আমার ফ্রেন্ডদের বললাম,তারা পারলে তুই পারবি নাহ কেন,এটা বলার পর, আমার গ্রুপের সবাই হাটা শুরু করলো।আর একটা ইনফরমেশন, কেওক্রাডং উঠার আগে লাস্টে ২ টা রাস্তা উঠার।একটা গাড়ির রাস্তা আর একটা হাটার।

সো ভুলেও কেউ গাড়ির রাস্তা দিয়ে উঠবেন নাহ।জীবন বের হয়ে যাবে।ফাইনালি ৫ ঘন্টা হাটার পর স্বপ্নের কেওক্রাডং পৌছালাম।আর্মি ক্যাম্পে না গিয়ে আগে সামিট পয়েন্টে গিয়ে কেওক্রাডং সামিট করলাম।তারপর আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে নাম লিখে এন্ট্রি নিলাম।আমাদের ঠিক করা জুমঘর কটেজে আমরা উঠলাম।উঠে সবাই ফ্রেস হয়ে খেতে আসলাম নিচে।মনে রাখবেন,কেওক্রাডং এর খাবার, টয়লেট অনেক খারাপ বগালেক থেকে।

আর ভুলেও কেওক্রাডং এর পানি খাবেন নাহ ,কিনা পানি খাবেন দয়া করে।গিয়ে সেই ডিমের প্যাকেজ খেলাম ১৫০ করে।খাওয়া শেষে আমাদের কটেজে আসলাম,সবাই রেস্ট নিলাম।৫ টায় আর্মিদের ব্রিফিং আছে,সেখানে সবার উপস্থিত থাকতে হবে বাধ্যতামূলক। তাই আমরা একটু বিশ্রাম করে ৪ টায় হেলিপ্যাড চলে গেলাম।গিয়ে তো অবাক।দাড়ানোর জায়গা নাই।অনেক ভিড়।তারমধ্যেই ঠেলে-ঠুলে সবাই ছবি তুললাম।তারপর আর্মি আসলো,ব্রিফিং এ সব নিয়ম কানুন বললো।

তারপর সন্ধ্যা পযন্ত হেলিপ্যাডে থেকে নিচে নেমে আসলাম।খাবারের ওখানে সবাই বসে আড্ডা দিলাম।চা খেলাম।কেউ ফোন চার্জ দিলো।Btw ফোন চার্জ=৩০ টাকা & পাওয়ার ব্যাংক=৫০ টাকা।তাও আবার নিজ দায়িত্বে বসে চার্জ দিবেন।বাইরে থাকার উপায় নাই,প্রচন্ড ঠান্ডা।বগালেকের চেয়ে ডাবল ঠান্ডা।তাই ভিতরেই বসে আড্ডা দিচ্ছি।রাত ৮ টার দিকে খাবার আসলো সেইম খাবার।শুধু পেট ভরার জন্য খাওয়া আরকি। খেয়ে ডিরেক্ট কটেজে চলে গেলাম।আমরা রুমে বসে অনেকক্ষন আড্ডা দিলাম, তারপর ঘুমিয়ে গেলাম।

সকাল ৮ টা।উঠে ফ্রেস হয়ে আমরা বেড়িয়ে গেলাম।আজকে সকালে নাস্তা করবো দার্জিলিং পাড়ায় আইরিন দিদির হোটেলে।নাম শুনেছি অনেক,ব্যাম্বু চিকেন নাকি খুব ভালো।নামার সময় ভালোই লাগে,দৌড়ায় নেমে গেলাম ৩০ মিনিটে দার্জিলিং পাড়ায়।খাবার রেডি ছিলো।ভাত,ব্যাম্বু চিকেন,আলু ভর্তা,লাউ সবজি,সালাদ & ডাল।আসোলেই ভালো ছিলো। প্যাকেজ ২৫০ করে।দাম একটু বেশি কিন্তু পয়সা উসুল।কিন্তু আমাদের লাক ভালো ছিলো নাহ,তাই আইরিন দিদিকে পাই নাই।

যাইহোক খাওয়া শেষ করে,আইরিন দিদির জামাই,দাদার সাথে সবাই গ্রুপ ছবি তুলে বিদায় নিলাম।নামার সময় কষ্ট কম।৩ ঘন্টায় চলে আসছি বগালেক।সিয়াম দিদির থেকে সবার কাপড়চোপড় ফেরত নিয়ে, যে যার মত ফ্রেস হয়েই আমরা রুমার জন্য গাড়িতে উঠলাম। রুমা নেমে আর্মি ক্যাম্পে এক্সিট সিল মারলাম।যাওয়ার সময় যেখানে যেখানে এন্ট্রি করে গেছি,ব্যাক করার সময় সবখানে এক্সিট মারতে হবে।রুমায় রঞ্জন দাকে বিদায় দিয়ে মিন্টু দাকে নিয়ে বান্দরবান চলে আসলাম।এসে ইউনিকের টিকেট কাটলাম।রাতে খেয়ে বাসে উঠলাম।আল্লাহর রহমতে সবাই সুস্থ ভাবে ঢাকা পৌছালাম।

টোটাল খরচঃ ৩৫১৪০(৭ জন)

৩৫১৪০÷৭=৫০২০ জনপ্রতি

যদি এখানে ১০-১২ জন মেম্বার হয়,তাহলে খরচ টা ৪৩০০ মধ্যে চলে আসবে

বড় খরচঃ 

চান্দের গাড়িঃ ১১০০০ 

গাইডঃ(২৬০০+১৪০০)=৪০০০

কটেজঃ বগালেকঃ২০০ কেওক্রাডংঃ ৩০০

খাবারঃ ডিমঃ১৫০

মুরগীঃ১৭০ (ব্রয়লার)

মুরগীঃ২২০ (সোনালী


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ