About Us
Rakib Monasib
প্রকাশ ০৯/০৩/২০২১ ০৪:১১পি এম

তিন ফসলি জমিকে অনাবাদি দেখিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প

তিন ফসলি জমিকে অনাবাদি দেখিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প Ad Banner

ফেনীর সোনাগাজীতে ২০৭ একর কৃষি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সোনাগাজী সোলার পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণ করে স্থাপন করা হচ্ছে এ বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর আগে ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হলেও ফসলি জমি বিবেচনায় সে সময় তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

নতুন করে ফসলি জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এরই মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ দেখা দিয়েছে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে প্রকল্প এলাকার জমিগুলোতে বছরে দুই থেকে তিন ফসল তোলা হয়। কিন্তু সম্প্রতি সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রভাবিত করে কৃষি জমিকে অ-কৃষি দেখিয়ে অধিগ্রহণের অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করেছে সোনাগাজী সোলার পাওয়ার। প্রকল্পটি ঠেকিয়ে ফসলি জমি রক্ষায় নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সোনাগাজীতে কমবে ফসলি জমি ও উৎপাদন। এছাড়াও অন্তত চার থেকে পাঁচ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

জানা গেছে, সোনাগাজীর সদর ইউনিয়নের থাক খোয়াজ লামছি এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি ৪৫৯ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

পরে মাঠ পর্যায়ে এসে অধিগ্রহণের আওতাভুক্ত ভূমি ফসলি হওয়ায় প্রকল্প স্থাপন না করে পিছু হটে পিডিবি। সম্প্রতি ওই ভূমির ২০৭ একরজুড়ে সোনাগাজী সোলার পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করেছে।

বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে ভূমি অধিগ্রহণে কোম্পানিটি অনাপত্তি সনদ আদায় করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প এলাকা চিহ্নিত করে পতাকা লাগানোর পর বিষয়টি স্থানীয় কৃষকদের নজরে আসে।

ভূমি মালিকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও স্থানীয় ভূমি অফিসের সহায়তায় তিন ফসলি জমিকে ‘পতিত জমি’ দেখিয়ে প্রকল্প স্থাপনের চেষ্টা করছে এটির উদ্যোক্তারা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ে বিপিডিবি প্রাইভেট সেক্টর পাওয়ার জেনারেশন পলিসি-১৯৯৬-এর আওতায় সোনাগাজীতে সোলার প্রকল্প স্থাপন করতে এরই মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ চলছে। কনসোর্টিয়াম অব আইবি ফট জিএমবিএইচ অ্যান্ড এজি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট ভিত্তিতে ২০ বছরের জন্য প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এর আগে ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের উপসচিব মো. মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় জেগে ওঠা চর কিংবা জেগে উঠতে পারে এমন জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেয়া যাবে না বলে নির্দেশ জারি করা হয়।

প্রকল্প এলাকার ফসলি ভূমি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন ও সদস্য সচিব মোশারফ হোসেন জানান, জমি রক্ষা করতে আমরা তিনবার শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন করেছি।

জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ পেতে স্মারকলিপি দিয়েছি। প্রয়োজনে আরো কঠোর আন্দোলনের দিকে যাব। কিন্তু ফসলি জমি নষ্ট হতে দেব না।

প্রকল্প এলাকায় কৃষি বিভাগ অনাপত্তি জানিয়ে গত বছরের ৬ আগস্ট একটি পত্র জারি করে।

ফেনীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তোফায়েল আহমদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই পত্রে ২০৭ একর জমিকে লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি রয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে পত্রে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ভূতাপেক্ষভাবে ওই সম্পত্তিগুলো কৃষিকাজে ব্যবহার হয় না বলে সোলার কোম্পানিকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। সোনাগাজী সোলার পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেয়া কৃষি বিভাগের এ প্রতিবেদনটি মিথ্যা ও অসত্য দাবি করে প্রতিবাদ করেন স্থানীয় কৃষিজীবীরা।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আবু মেহেদী তার কোম্পানির অনাপত্তি সনদের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবরে একটি আবেদন করেন।

আবেদন পেয়ে জেলা প্রশাসক সোনাগাজী উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিলে ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি বিস্তারিত একটি মতামত দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ২৮ জানুয়ারি জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে মতামত দিয়ে একটি চিঠি দেন।

জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান চিঠিতে জানান, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেসরকারি খাতে বিল্ড-ওন-অপারেট (বিওও) ভিত্তিতে সোনাগাজী সোলার পাওয়ার লিমিটেড প্রকল্পের জন্য সোনাগাজী উপজেলার ৬৯ নং থাক খোয়াজ লামছি মৌজার প্রস্তাবিত এলাকার ১৯১ দশমিক ৫২ একর ভূমির মধ্যে ৩২ দশমিক ৭৫ একর ভূমি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। বাকি ভূমি ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে রেকর্ড আছে। প্রস্তাবিত ভূমি নাল, লায়েক পতিত, গড় লায়েক পতিত ও পতিত অবস্থায় আছে।

প্রস্তাবিত ভূমিতে অধিগ্রহণ পরিপন্থী মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কবরস্থান বা ধর্মীয় স্থাপনা নেই।

চিঠিতে জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের একটি স্মারক উল্লেখ করে জানান, পরিপত্র অনুসারে অধিগ্রহণ প্রস্তাবে কৃষি জমি বিশেষভাবে দুই ফসলি বা তিন ফসলি জমি অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

সেক্ষেত্রে দুই ফসলি ও তিন ফসলি জমি বাদ দিয়ে বিধিবিধানের আলোকে অন্যান্য জমি অধিগ্রহণের শর্তে অনাপত্তি প্রদান করা হলো।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ১ নং খতিয়ানভুক্ত বিএস দাগ ১৮-এর শ্রেণী খাল, ৭০৪ নং খতিয়ানের বিএস দাগ ৫১৯-এর শ্রেণী ডোবা রয়েছে। এছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তরের সরেজমিন প্রতিবেদনে কৃষি জমির ওপর মৌসুমি ফসল উৎপাদন বিদ্যমান আছে মর্মে উঠে আসে।

সরকারি খাস জমির অনুমোদন, খাল ও ডোবা শ্রেণীর ভূমি এবং মালিকানাধীন জমির কাগজপত্র না থাকায় পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী প্রকল্পের অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। তাই উদ্যোক্তার আবেদনটি বাতিলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় মর্মে রেজল্যুশন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সোনাগাজী সদর ইউপি চেয়ারম্যান শাসছুল আরেফিন জানান, প্রকল্প এলাকায় প্রায় সব জমিই তিন ফসলি।

এসব এলাকায় কীভাবে প্রকল্প স্থাপনে অধিগ্রহণের অনুমোদন পায় সেটা আমার বুঝে আসে না। এখানে প্রকল্প স্থাপন হলে বর্গাচাষীসহ অন্তত পাঁচ হাজার কৃষক বেকার হয়ে পড়বেন।

এ বিষয়ে সোনাগাজী সোলার পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আবু মেহেদী জানান, প্রকল্প এলাকায় তিন ফসলি কোনো জমি নেই।

আমরা ২০০৯ সালের ভূমি অধিগ্রহণ আইনে এক ফসলি জমি অধিগ্রহণ করছি। প্রকল্প এলাকার কৃষকদের চার গুণ দাম দিয়ে জমি কেনা হচ্ছে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ