জাহাঙ্গীর আলম কবীর - (Satkhira)
প্রকাশ ২২/০২/২০২১ ০৭:২৬পি এম

ছোট গল্প: রেবার পরের বাঁকে

ছোট গল্প: রেবার পরের বাঁকে Ad Banner

শীত বিকেলের সোনালি আভা। মৌ মৌ আমেজ। পাপিয়া ভাবী ঘরের টেবিলটায় এক প্লেট ঝাল-মুড়ি দিয়ে বলে, খাও কবীর।  তারপর পাপিয়া ভাবি আবার বলে, এক গ্লাস পানি নিয়ে আয় তো রেবা। আমি মুড়ি খাচ্ছিলাম আর কথা বলছিলাম, পাপিয়া ভাবির সাথে।

প্রসঙ্গ, আমি আর ফাংশনে গান-টান গাচ্ছি না কেন, লেখালেখি কেমন চলছে, পড়াশুনার খবর কী, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি দু’এক কথায় জবাব দিচ্ছিলাম। এমন সময় রেবা এক গøাস পানি নিয়ে ঢুকলো। পাপিয়া ভাবি রেবার উদ্দেশ্যে বলে, তোকে বলেছিলাম না রেবা, এই সেই কবীর। আমার ছোট দেবরের বন্ধু।

বাড়ি ভৈরব নদীর ওপারে, বারভাগ গ্রামে। রেবা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আসসালামু আলাইকুম। আমিও যথারীতি সালামের জবাব দিলাম। পাপিয়া ভাবি বলল, বুঝেছো কবীর, এ আমার বোন রেবা। গান-বাজনা ওর খব পছন্দ। কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের কথা শুনলে ওর মাথা ঘুরে যায়।

বলে ওরা না খুব সুন্দর মানুষ। তাই নাকি! ও কি করে বুঝলো সুন্দর হয়? কি করে বুঝলো ওকেই জিজ্ঞেস করো না। পরে জিজ্ঞেস করা যাবে।

এখন বলো, জরুরী খবর দিয়েছিলে কেন তুমি? রেবা তোমাকে দেখবে বলে। আমি হো-হো করে হেসে ফেললাম। বললাম, মানুষকে দেখার কি আছে? রেবা এবার মুখ খোলে, আমি ভেবে ছিলাম মানুষ না অন্য কিছু। - মুচকি হাসে ও। তার মানে তুমি আমাকে জন্তু-জানোয়ার ভেবেছিলে- এই তো? অতদূর নয়, তবে অন্য একটা কিছু।

আমি কথা না বাড়িয়ে পাপিয়া ভাবিকে বলি, অন্য একদিন আসবো ভাবি, এখন চলি। রেবা বলে, কাল একবার আসবেন কিন্তু। আমি ‘হ্যাঁ’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। মিস্ রেবা। র্ঝঝরে, তক্তকে। পাঞ্জাবের বুকে প্রবাহমান রেবা নদীর মতোই। চোখ দু’টোতে মোহমদির অঞ্জন।

চুলের বিন্যাস যেন শ্রাবণের বারিধারা। বয়স পনের ষোল হবে। মাগুরার বরিশাটের মেয়ে। উপজেলা শ্রীপুর। কয়েক দিনের মধ্যেই রেবার সাথে আমার বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়ে গেল। একদিন আমি বললাম, তোমার আর পাপিয়া ভাবির মধ্যে কোনও মিল নেই। তা আপনি ঠিকই বলেছেন। পাপিয়া আপা বড় মুটিয়ে গেছে।

দুলাভাই আর আমি খুব বেশী হালকা-পাতলা। আচ্ছা, হালকা-পাতলা মানুষ আপনার ভাল লাগে না? কেন লাগবে না? আমিও তো হালকা-পাতলা। এই যাকে বলে লিকলিকে। আমারও। আপনার লম্বা লম্বা চুলগুলো বেশ ভাল লাগে। আরও ভাল লাগে যখন গান গেতে থাকেন। ও তাই নাকি! তাই বলো।

কথাটা তির্যক ভাবেই বলি। রেবার মুখটা লাল হয়ে এলো। বুঝলাম ও লজ্জা পেয়েছে। তাই প্রসঙ্গান্তরে যাবার জন্য বলি, তোমরা কবে আসছো আমাদের বাড়িতে? দুলাভাই যেতে দিতে চায় না। বলে ‘ব্যাপার কি’? তাই নাকি! আমার তো মনে হয়, ভাই ঠিকই বলেছে।

তুমি কি বলো? আমার উৎসুক দৃষ্টি। আপনি না একটা যাচ্ছেতাই। প্রতিদিন চমৎকার অবসর মুহূর্তগুলো কেটে যাচ্ছিল বসুন্দিয়ায় পাপিয়া বাভিদের বাড়িতে। প্রত্যেকটি বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আড্ডা জমাই রেবা আর পাপিয়া ভাবির সাথে। রেবা গান গায়, নাচে।

আমি কবিতা শোনাই, কখনও বা গান গাই, নজরুল সঙ্গীত না হয় আধুনিক গান। পাপিয়া ভাবি আমাদের একনিষ্ঠ শ্রোতা। কিন্তু রেবা আর আমার ভাললাগার সীমানা পেরিয়ে প্রেমকে ঘেঁষতে দেইনি কখনও। তবু মনের রঙ বৃষ্টিতে ভিজে স্বপ্নিল আবেশে মুগ্ধ ছিলাম আমরা।

একদিন রেবাকে শুনিয়ে পাপিয়া ভাবিকে বলি, তোমার বোনটা তো বেশ এগিয়েছে। বিয়ে-টিয়ে করবে নাকি? তুমি আমার বোনকে নেবে? যদি নেই? দু’টোতে মানাবে বেশ। কিন্তু তোমার ভাই কি রাজি হবে? কেন হবে না? আমি কি খারাপ পাত্র? যদি কিছু বলে? কিন্তু কিছুই বলেনি রেবার দুলাভাই।

শুধু ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, কবীরকে তোর পছন্দ হয়? রেবা লাজে বলেছিল, জানিনে। তা, না জানলেই ভাল। আর কথা বাড়ায়নি দুলাভাই। পাপিয়া ভাবিও আশ্বস্ত হয়। হাতে লেখালেখির বেশ কাজ থাকায় তিন চার দিন পাপিয়া ভাবিদের বাড়ির মুখো হয়নি আমি।

সন্ধ্যার দিকে হারমোনিয়ামটা নিয়ে বাড়িতে বসে অশান্ত মনটা শান্ত করার চেষ্টা করছি। শীতের আমেজ নিয়ে কি যেন একটা গান গাচ্ছিলাম একাকী। সাথে কোনও তবলা-খোলের সঙ্গত নেই। এমন সময় বাড়ির আঙিনায় কাদের যেন গলার আওয়াজ পেলাম, ওই দেখ কবীর ভাই গান গাচ্ছেন।

সুন্দর গায়, তাই না টুলু? হারমোনিয়ামটা ছেড়ে পায় পায় এগিয়ে গেলাম দরজার কাছে। ততক্ষণে দু’টো যুবতী মূর্তি আমার মুখোমুখি হলো। দেখলাম আর কেউ নয়, সেই রেবা আর তার ছোট বোন টুলু। ইকটা কঠিন শঙ্কায় আমার বুকটা আড়ষ্ট হয়ে যায়। নিজেকে এক মুহূর্তে ফ্রি করে নিয়ে বলি, কি ব্যবাপার রেবা, এতদিন পরে বাড়িটা চিনতে পেরেছো তবে? চিনে ফেলেছি।

আপনার একটা খবর আছে। এসো, এসো, ভেতরে এসো। আমাদের বাড়ির সবার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেই। আম্মাকে নাস্তা তৈরী করতে বলে ওদেরকে নিয়ে হারমোনিয়ামটার পাশে বসি। রেবা বলে, আমার আম্মা এসেছেন। আপনাকে এখুনি যেতে হবে। তিনি আপনাকে দেখতে চান।

আচ্ছা, যাওয়া যাবে। নাস্তা সেরে গান শোনালাম। তারপর রাত আটটা-ন’টার দিকে ভৈরব নদী পার হয়ে পাপিয়া ভাবিদের বাড়িতে পৌছুলাম। দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকি। দেখা হয়ে গেল মাঝ বয়সি এক মহিলার সাথে। বুঝে নিলাম রেবা আর পাপিয়া ভাবির আম্মা, যিনি আমার প্রতীক্ষায় উদগ্রিব।

নাম মিসেস হালিমা। ভাল আছেন তো? আমি জিজ্ঞেস করি। হ্যাঁ আছি কোনও মতে। মিসেস হালিমা বললেন, আমি আজ দু’দিন এসেছি। তোমার কথা শুনেছি পাপিয়া আর রেবার কাছে। কিন্তু এ দু’দিন এলে না যে? তাই তো ওদের পাঠালাম। একটা জরুরী কাজে ব্যস্ত ছিলাম কয়েকদিন।

রেবা বলে, জরুরী না ছাই। গিয়ে দেখি হারমোনিয়াম নিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করছেন। বললাম, জরুরী কাজ থাকে দিনে। রাতের বেলায় গান গাওয়ার সাথে এর কোনও সম্পর্ক আছে নাকি। থাক, খুব হয়েছে। মিসেস হালিমাকে বলি, দেখুন তো খালা আম্মা, খামাকা ঝগড়া বাধাচ্ছে না রেবা?

তিনি বলেন, তুই থাম তো রেবা, আমরা একটু আলাপ করি। তুই বরং নাস্তা নিয়ে আয়। পাপিয়াকে বলগে একটু তাড়াতাড়ি দিতে। আমরা আলাপচারিতায় মেতে উঠলাম। টুলু পাশে বসে শুধু শুনে যাচ্ছে। এর মধ্যে পাপিয়া ভাবি আর রেবা নাস্তা নিয়ে ফিরে এলো।

পাপিয়া ভাবি বলে, এ কয়দিন কোথায় ছিলে ডুমুরের ফুল? খোঁজ খবর নেই যে সাহেবের! কাজ ছিল। নাও, নাস্তা খাও। রেবা টিপ্পনি কাটে, থাক আপা, তোমাকে আর যতœ করে খাওয়াতে হবে না। গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি আর গল্প করে রাত অনেক হয়ে যায়। বাইরে শীতও পড়েছে কন্কনে।

পৃথিবী নিঝুম। বড় শ্রান্ত। সবার কলকন্ঠে আমার হৃদয় তখন এক অপূর্ব মোহনীয় আবেশে পরিপূর্ণ। মিসেস হালিমা বলেন, আমরা কাল ফিরে যাচ্ছি কবীর। তুমি সকালে একবার এসো। আসছো তো? আমি ‘আসবো’ বলে বাইরে বেরিয়ে পড়ি। রেবা আর পাপিয়া ভাবি কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে গেল।

আরও কিছু দূর এগিয়ে গেলাম আমি। ঝরঝরে চাঁদের আলোয় দেখলাম, আমার ফেলে আসা পথের দিকে চেয়ে রেবা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। সকালে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরছে ওরা। অল্প সময় হলেও আমরা যেন পরস্পর অনেকদিনের চেনা। অনেক কাছের মানুষ।

বেরুবার আগে মিসেস হালিমা আমার হাতে একটা ঠিকানা লেখা কাগজ দিয়ে বললেন, চিঠি লিখবে কিন্তু। নইলে ভীষণ রাগ করবো। রেবার চোখ-মুখ মলিন। ধরা গলায় ভারাক্রান্ত মনে বলল, আপনি বেড়াতে যাবেন কিন্তু। মাঝে মাঝে চিঠি লিখবেন।

আর আমাদের বাড়ি বরিশাট গেলে খুব মজা করা যাবে। বলুন, যাবেন তো? ওর সকরুণ আবেদন আমাকে ব্যথিত করে। অস্ফুট স্বরে বলি, যাবো। তুমিও লিখবে কিন্তু। ওদের বিদায় দিয়ে ফিরে এলাম বাড়ি। বুকে তখনও এক অনন্ত শূন্যতা। বিদগ্ধ হচ্ছিলাম একটা সুদূরের টানে।

একটা প্রলয়ঙ্করী অদৃশ্য ঘূর্ণিঝড় আমার হৃদয়টাকে যেন ভেঙে-চুরে খান খান করে দিচ্ছে। দিন পনের পরে চিঠি পেলাম। শুরু হলো চিঠি লেখালেখি। এভাবে রেবা আর মিসেস হালিমার সাথে আমার কাগজের পাতায় চললো ভাব আর ভাষা বিনিময়।

একদিন মিসেস হালিমা লিখলেন, তিনি আমার মা হতে চান। খালাটা কেটে দিতে হবে। ইঙ্গিতটা বুঝতে আমার কষ্ট হয়নি। খুশি হই। অল্লাহকে স্মরণ করি অসংখ্যবার। তবু দুষ্টামি করে লিখলাম, পৃথিবীতে আম্মা তো একজনই হয়। এর বেশী হলে সে হয় সৎমা।

আপনি মা হতে চান কোন সূত্রে তা আমি বুঝতে পারলাম না। তবে কি আপনি আমার সৎমা হতে চান? এর পরের ঘটনাগুলো দ্রæত আর আকস্মিক ঘটে যেতে লাগলো। বিয়ের প্রস্তাব এলো। পাপিয়া ভাবির ফুফাতো দেবর, আমার বন্ধু আজাদ জিজ্ঞেস করে, আমার আব্বা-আম্মা বিষয়টা জানে কিনা।

রেবাকে তাদের পছন্দ কিনা। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই কি না। ইত্যাদি। আমি শুধু জানিয়ে দেই এভরি থিং ওকে। এরপর আজাদের সাথে এ বিষয়ে আমার আর কোনও কথা হয়নি। দিন দশেক পরে পাপিয়া ভাবি খবর দিলো আমাকে।

আমি যেন তার সাথে জরুরী দেখা করি। খবরটা আমার মনের সমুদ্রে অশান্ত ঢেউ তোলে। আমি সাহসী নাবিকের মতো সমুদ্র বিজয়ের প্রস্তুতি নিলাম। চৈত্রের ঠাঁ-ঠাঁ রোদ্দুর। পাপিয়া বাবির বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। ভৈরব নদীটা পার হলাম নিজেই নৌকার হাল ধরে।

প্রচন্ড তাপে কোথাও কাউকে দেখা গেলো না। আমি পথ হাঁটছি একাকী। পাপিয়া ভাবিদের বাড়িতে হাজির হলাম রীতিমতো ঘামে ভিজে। ঝড়ো কাকের মতো ঢুকে পড়ি ঘরের মধ্যে। ঢুকেই মুখোমুখি হলাম মিসেস হালিমার। আশ্চর্য হই। আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই।

আমার পূর্ব প্রস্তৃতি ভেঙে খান খান হয়ে গেলো। মিসেস হালিমা কোনও রকম কুশলাদি জিজ্ঞেস না করেই বললেন, তুমি বরিশাট গেলে না তো কবীর? কষ্ট নেবেন না খালা আম্মা। সময় সুযোগ করে উঠতে পারিনি কিনা, তাই--- তাহলে মেয়ের বাড়িতে যাবার সময় হয় না তোমার।

তুমি কেমন আব্বা? আমি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিয়ে বলি, কবে এলেন? গতকাল। আর কে এসেছে? রেবা, ফেরদৌসী আর সাবিহা। তারপর রেবার উদ্দেশ্যে মিসেস হালিমা বলেন, একটা পাখা নিয়ে আয় তো মা রেবা। সাবিহা রেবার আপন বোন, আর ফেরদৌসী চাচাতো বোন। ফেরদৌসী রেবার বয়সের বড়।

আমি দুষ্টামী করে বলি, আপনারা চলে যাওয়ার পর পাপিয়া ভাবি একবারও আমার খোঁজ খবর নেয়নি। ও ওরকমই। পাশের রান্না ঘর থেকে আওয়াজ এলো, তুমি ক’বার খোঁজ খবর রাখ ভাবির? তারপর একটা থালায় ঝাল-মুড়ি, চানাচুর ভাজা, বিস্কুট এবং গোটা কয়েক মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকলো পাপিয়া ভাবি।

সাথে রেবা, ফেরদৌসী আর সাবিহা। ভাবি বলে, নাও খাও। খুব তো নালিশ হচ্ছে। এবার ঝাল মুখ না মিষ্টি মুখ করবে- যা ভালো লাগে তাই করো। মিসেস হালিমা বলে, নাও, খাও বাবা। রেবা বলে, খুব তো দরদ বাপের ওপর। বাপ থাকলে দরদ হয় বৈকি। এভাবেই একটা উচ্ছল আনন্দ নিয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে।

দু’দনি পর শুনলাম রেবার বিয়ে হয়ে গেছে। আমার বন্ধু, ঘটক আজাদের সাথে। বিয়ের সপ্তাহ খানিক পর দেখা হয়ে গেলো রেবার সাথে। রাস্তার ওপরে। দেখলাম হাতে মেহেদির রঙ। তখনও মুছে যায়নি। হাতে লাল সূতো বাঁধা। আমি কোনও কথাই বলতে পারলাম না ওর সাথে। একটা অদ্ভুত সংকোচ-বোধ যেন আমার কন্ঠনালীটা চেপে ধরেছে।

ওর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় বলে ওঠে, আস্ত বেঈমান। আমি শুধু কয়েকবার রেবার চোখে চোখ রেখে হাঁটতে শুরু করি। ওর কথার কোনও অর্থই খুঁজে পেলাম না। সে উনিশ শ’ একাশি সালের কথা। তারপর আট বছর পেরিয়ে গেছে। আমার বুকের ক্ষতটা পূরণ হয়ে গেছে অনেকখানি।

শুধু যাওয়া-আসার পথে পাপিয়া ভাবি আর আজাদের বাড়ি দু’টো দেখলে মনে পড়ে যায় সেই রেবার কথা। ইচ্ছে হলেও দেখা করার আগ্রহ জন্মায়নি কখনও। বছর ছয়েক হলো আমিও বারভাগ ছেড়ে চলে এসেছি নওয়াপাড়াতে। সেদিন বিকেলে বিকেলে আজাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখা হয়ে গেলো রেবা ওরফে মিসেস রেবার সাথে।

দু’সন্তানের জননী এখন মিসেস রেবা। পাঞ্জাবের সেই প্রবাহমান রেবা নদী যেন চুপসে গেছে। যেন এখনই মরুভ‚মিতে হারিয়ে যাবে। আগের মতো আর রূপের জৌলুস নেই। শরীরের ত্বকে লাবণ্যের ছোঁয়া অনেকখানি মলিন হয়েছে। আমাকে দেখেই ও বলে, কেমন আছেন কবীর ভাই? মা এখনও আপনার কথা বলে।

একবার বরিশাট গেলেই পারেন। ভাল, আছি কোনও মতে। আমার বুকে প্রচ্ছন্ন একটা ব্যাথা চিড়িক মেরে ওঠে।

আপনি আমাকে ঠকিয়েছেন। খুব ঠকিয়েছেন। সে কথা থাক। বিয়ে করেছেন? ভাবি কেমন আছেন? - এক সাথে অনেক প্রশ্ন করে ওর বাড়িতে যাবার অনুরোধ করে। আমি মনের অজান্তে ওর বাড়ির বারান্দায় উঠে যাই। একটা চেয়ারে বসে বলি, তোমার কথার অর্থ বুঝলাম না।

এক গøাস পানি দেবে রেবা? এই তো আনছি, আপনি বসেন। মিসেস রেবা এক প্লাস পানি আর খৈ এনে দিল আমার সামনে। খাবার ইচ্ছে হলো না। তবু ভদ্রতার খাতিরে দু’চার গাল খৈ মুখে দিয়ে পানি খেলাম। রেবা বলে, আমি আপনার ঘরনী হতে চেয়েছিলাম কবীর ভাই।

সে কথা মনে পড়ে? সে কথা তখন একবারও বলোনি তো রেবা। তাছাড়া তুমি তো এখন অনেক সুখেই আছ। ও কথা বলতে নেই, উচ্চারণ করতে নেই। ওর মুখটা মলিন হয়ে গেলো। বললাম, আমার একটা জরুরী কাজ আছে রেবা। আমাকে এখন উঠতে হবে।

তাছাড়া তোমার আজাদ কী ভাববে! মনের অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মরুভ‚মির জৌলুসহীন রেবা আমাকে আজ আরও একবার অতৃপ্ত করে তোলে। রেবার সশ্রদ্ধ অনুরোধ, আজ রাতটা আমার ছেলেদের এখানে থাকা যায় না কবীর ভাই? ওর কথার কোনও জবাব দিতে পারলাম না।

আমি নিশ্চল, নিশ্চুপ। ও আবার বলে, আপনি ঘর বেঁধেছেন? ছেলে-মেয়ে কটা বললেন না তো? এখন রেবার অনেক কাছাকাছি। তবু আট বছর আগের মতো সহজ হতে পারলাম না ওর কাছে।

আমি শুধু বললাম, তোমার যা আছে, আমার তা নেই মিসেস রেবা।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ